এত অভিযানের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে মাদক সিন্ডিকেট

বৈধ বারে অভিযান নিয়ে বিতর্ক

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১১

রাজধানীর অভিজাত হোটেল, বার ও ক্লাবে একের পর এক অভিযান চালিয়ে মদ জব্দ ও মদ্যপানকারীদের আটকের ঘটনা ঘটছে। লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন, পারমিট ছাড়া মদ্যপান কিংবা অবৈধভাবে মদ মজুতের অভিযোগে এসব অভিযান পরিচালনা করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। কিন্তু বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, আইস ও হেরোইনের কারবারে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বড় অভিযানের সংখ্যা ও অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন নিবন্ধিত বার, ক্লাব ও পাঁচ তারকা হোটেলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪২টি অভিযান পরিচালনা করেছে ডিএনসি। এসব অভিযানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অংশ নিয়েছে। বনানীর হোটেল আমারি, গুলশানের জার্মান ক্লাব, মিডিয়া ক্লাব, আর-ক্যানভাস, তেজগাঁওয়ের ফুয়াং ক্লাবসহ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে অভিযান চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব অভিযানের বড় অংশের লক্ষ্য ছিল অ্যালকোহল বিক্রির লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন, অবৈধ মজুত কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম শনাক্ত করা। তবে নিষিদ্ধ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের তুলনায় বৈধ অ্যালকোহল বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান বেশি দৃশ্যমান হওয়ায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অগ্রাধিকার ও কার্যকারিতা নিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারগুলোর মালিকরা প্রশ্ন তুলেছেন।

গত ১৩ অক্টোবর রাতে রাজধানীর হোটেল আমারি, কিংফিশার ও ব্লিজ আর্ট বারে অভিযান চালায় ডিএনসি। হোটেল আমারিতে পারমিট ছাড়া মদ্যপানরত সাত জনকে পাওয়া যায়। কিংফিশার বারে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ১৪ লিটার কেরুর বিলাতি মদ পাওয়া যায়। ব্লিজ আর্ট বার বন্ধ থাকায় এর কার্যক্রম যাচাই করতে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে অধিদপ্তর।

এর দুই দিন পর ১৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে গুলশান-২-এর একটি রেস্টহাউজে অভিযান চালিয়ে ২৪৪ লিটার বিদেশি মদ ও বিয়ার জব্দ করে ডিএনসি। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপককে গ্রেফতার করা হয়। অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বার লাইসেন্স ছিল না। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি মদ মজুত করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হচ্ছিল।

তবে এসব অভিযানে বৈধ অ্যালকোহল বিক্রির প্রতিষ্ঠান ও অবৈধভাবে মদ মজুতের অভিযোগে পরিচালিত অভিযানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স থাকলেই সেখানে সব ধরনের মদ বিক্রি কিংবা সবার মদ্যপানের অনুমতি থাকে না। লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে পারমিট ছাড়া মদ্যপানের অভিযোগও আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।

প্রশ্ন উঠেছে, এসব অভিযানের পাশাপাশি ইয়াবা, আইস ও হেরোইনের বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর অভিযান চলছে। রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদক প্রবেশের তথ্য বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রকাশ করছে। মাদক চোরাচালানের রুট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা থাকার পরও মাদকের বিস্তার থামছে না। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু খুচরা পর্যায়ের অপরাধী কিংবা মদ্যপানকারীদের আটকের পরিবর্তে সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা ও সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের শনাক্ত করার দাবি উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, মাদক সিন্ডিকেটের বিস্তার সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের শিকড় ওপড়ে ফেলার পরিবর্তে দৃশ্যমান বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান বেশি প্রচার পেলে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের প্রকৃত লক্ষ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ হোটেল, রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, 'ইয়াবা, আইস ও হেরোইনের মতো নিষিদ্ধ মাদক এবং হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বার ও ক্লাবে অনুমোদিত অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অ্যালকোহল নিষিদ্ধ পণ্য নয়; দেশে এর উৎপাদন ও আমদানি রয়েছে। সরকারও এ খাত থেকে রাজস্ব পায়।’
তিনি বলেন, “বৈধভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে লাইসেন্সের শর্ত মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযথা হয়রানি করা উচিত নয়।'

জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, 'বৈধ বার ও হোটেলে অভিযান চালানোর পর অতিথিদের আটক, মামলা কিংবা লাইভ ভিডিও প্রচারের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে পর্যটনশিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।'

এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, 'লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার, হোটেল কিংবা বন্ডেড ওয়্যারহাউসে অভিযান পরিচালনা কোনো হয়রানিমূলক কার্যক্রম নয়। লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন, অবৈধ মজুত কিংবা শুল্কমুক্ত বিদেশি মদ বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা অধিদপ্তরের লক্ষ্য নয়।'

ইত্তেফাক/এনএন