সময়টা ২০০১ সাল। দেশব্যাপী অস্থির সময় বইছে। শহরাঞ্চলের মানুষের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ কম থাকলেও গ্রামাঞ্চলের সংখ্যালঘু মানুষ দিন পার করছে আতঙ্কের মধ্যে। এই আতঙ্ক আরো বেশি মাত্রায় আক্রান্ত করল রমেশকে। এর মধ্যেই সবচেয়ে ভয়ানক খবর এলো একদিন। উত্তরপাড়ায় কুবেরের আট বছরের মেয়েটাকে দফায় দফায় ধর্ষণ করা হয়েছে। স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক দেশে আট বছরের মেয়ে ধর্ষিত, প্রশাসন বধিরর ভূমিকায় যথারীতি। লজ্জায়, ক্ষোভে, দুঃখে মেয়েটা আত্মহত্যা করে। একটা মাত্র মেয়ে ছিল কুবেরের।
বর্বর এই ঘটনা রমেশকে প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিল। সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটাল রমেশ। বারবার সে মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটার বয়স পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পড়ল। দেখতে ভীষণ মায়াবী। রমেশের তামাটে রং ফেলে মেয়েটা কাঁচা হলুদ রং পেয়েছে। চুলগুলো বড় বড়। চুল ছেড়ে যখন হাঁটে তখন মেয়েটাকে পরম স্নেহ নিয়ে দেখে রমেশ। চুলগুলো পিঠ পর্যন্ত এসেছে। গরমে একবার চুল কেটে ফেলার কথা ওর মা বললেও রমেশ মেয়ের চুল কাটতে দেয়নি। এই কালো চুল আর মায়াবী মুখ দেখেই দিন শুরু হয় রমেশের।
রমেশ আবার মেয়ের দিকে তাকায়। মেয়েটা চুল ছেড়ে উঠানে বসে মুড়ি আর গুড় খাচ্ছে। দেখেই রমেশের চোখ শান্ত হয়ে গেল। পরম সুখ অনুভব করল। পরক্ষণেই অন্ধকারের তীব্র মেঘ গর্জন ছেড়ে জানিয়ে দিল বর্তমান পরিস্থিতি। মেঘের গর্জনে ভীত রমেশ। ভীত রমেশের বিশ্বাস। ভীত মেয়ের ভবিষ্যত্। এমন ফুটফুটে একটা মেয়ের যদি কিছু হয় তবে রমেশ কী করবে? নিয়তির কাছে রমেশ কি হার মানবে? হঠাত্ই রমেশ একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। বিকেল হতেই রমেশের স্ত্রী চারুকে নির্দেশ দিল—দ্রুত ব্যাগ গোছাও।
এইরকম অমানুষিক চাপ সে আর নিতে পারছে না। নিয়তি রমেশকে হার মানানোর আগেই রমেশ নিয়তির বিপরীতে দাঁড়াবে। সবকিছু জলে যাক, মেয়েটাকে তো বাঁচাতেই হবে। সকল খোঁজ নেওয়া শেষ। রাতেই রমেশ পরিবার নিয়ে পার হবে। চারু প্রস্তুত, প্রস্তুত রমেশও। মেয়েটাকে চাদর দিয়ে মুড়িয়ে দিল যাতে তার চেহারা ভালো বোঝা না যায়। চাদরের ভিড়ে একটুখানি মুখটা বেরিয়ে আছে। তাতেই রমেশের বুক মোচড় দিয়ে উঠল। এমন মায়াময় চেহারার মেয়েটার ওপর যদি কোনো পাষাণ্ড হামলে পড়ে, কোনো ব্যাঘ্র চিতা থাবা দেয়, কোনো দুর্বিপাক তার প্রাণটা যদি কেড়ে নেয়—এই আশঙ্কায় রমেশ দ্রুত মেয়ের চাদরটা সরিয়ে নিল।
খচখচ শব্দে কাঁচিটা মেয়ের চুলগুলো খেয়ে নিল। শব্দের চেয়ে বোবা আর্তনাদ তীব্র। চুলের বিসর্জনে যদি নিষ্পাপ মেয়েটা রক্ষা পায়। প্রতিবার কাঁচি চালাচ্ছে আর রমেশের বুকের ওপর কেউ অনুভূতি কুঠারের আঘাতে জর্জরিত করছে। চোখ ফেটে রক্ত বের হওয়ার উপক্রম কিন্তু রমেশ নির্বিকার। নিজেকে শুধরাল, বোঝাল।
মেয়েটা বোকার মতো তার বাবার কর্মকাণ্ডের দিকে চেয়ে আছে। এমনভাবে চুলগুলো কাটল যে মেয়েটাকে দেখতে এখন কুিসত লাগছে। মাটিতে বড় বড় চুলগুলো তাকিয়ে আছে রমেশের দিকে।
