বিলুপ্তির পথে পটুয়াখালীর জমিদার রাজেশ্বর রায়ের কাছারিবাড়ি

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ২১:২০

দীর্ঘ সংস্কারের অভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখন বিলুপ্তির পথে পটুয়াখালী শহরের নতুন বাজার এলাকায় অবস্থিত জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরীর কাছারিবাড়ি। একসময়ের পরাক্রমশালী জমিদারের স্মৃতিচিহ্ন এই ভবনটি অরক্ষিত থেকে ধসে পড়ছে। বেশ কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এই ভবনটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীতে তাদের আর কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। ইতিহাসের সাক্ষী জমিদারি আমলের এই কাছারিবাড়ি অবিলম্বে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া না হলে অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

শহরের একোয়ার স্টেট নামে পরিচিত এই কাছারিবাড়ি এলাকার একাংশ ক্রমান্বয়ে নানা কৌশলে বেহাত হয়ে গেছে। জমিদারদের স্থাপিত মন্দির পাষানময়ী কালীবাড়ি স্থানীয়দের দান-অনুদানে সংস্কার করে সেখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা চলে আসছে। মূল ভবনের পূর্বপাশে নির্মাণ করা হয়েছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সদর অফিসারের কার্যালয়। সেখানে থাকা পাইক-পেয়াদা, গোমস্তাসহ কর্মচারীদের টিনশেড ঘরগুলো ব্যবহূত হচ্ছে ভূমি অফিস ও তহসিল অফিস হিসেবে।

১৮১৭ সালে বরিশালকে পৃথক করে দেওয়ানী শাসন প্রসারের জন্য স্থাপন করা হয় চারটি মুন্সেফী চৌকি। বাউফল চৌকি স্থানান্তর করা হয় লাউকাঠীতে। ১৮৭১ সালে পটুয়াখালীকে উন্নীত করা হয় মহকুমায়। জমিদার হূদয় শংকরের পুত্র কালিকা প্রসাদ রায়ের নামানুসারে লাউকাঠীর দক্ষিণ পাড়ের গ্রামের নামকরণ করা হয় কালিকাপুর। এখানে গড়ে ওঠে পটুয়াখালী শহর। এ সময়কালে কলসকাঠীর জমিদার বরদাকান্ত রায় চৌধুরীর পুত্র বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী পটুয়াখালী মহকুমার অধীন কালিকাপুর কিসমতের বন্দ্যোপাধ্যায় মুদাফা তালুক খরিদ করেন বাংলা ১২৯৬ সনে। এই অঞ্চলের সর্বশেষ জমিদাররা ছিলেন বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরীর চার পুত্র রাজেশ্বর, রত্নেশ্বর, সিদ্ধেশ্বর, অমরেশ্বর ও ব্রজকান্ত রায় চৌধুরীর তিন পুত্র সুরেন্দ্র, নরেন্দ্র ও মনিন্দ্র। জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরী প্রবল প্রতাপের সঙ্গে পটুয়াখালীর শেষ জমিদারি পরিচালনা করেন। পটুয়াখালীতে নির্মাণ করা হয় কাছারি বাড়ি এবং পূজা-অর্চনার জন্য স্থাপন করেন পাষানময়ী কালীবাড়ি। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর তাদের অনেকে সম্পত্তি ফেলে রেখে যান ভারতে। তাদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি গণ্য করা হয় পরিত্যক্ত ও অনাবাসী সম্পত্তি হিসেবে। কিছু সম্পত্তি আবার ১ নম্বর সরকারি খাস খতিয়ানেও দেখানো হয়। পাকিস্তান আমলে জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরীর পরিত্যক্ত এই কাছারিবাড়িতে স্থাপিত হয় সদর তহশিল অফিস।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে সেটি ব্যবহূত হয় সদর উপজেলা ভূমি অফিস হিসেবে। সংস্কারের অভাবে সর্বশেষ জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরীর কাছারিবাড়ি ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে তা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। জরাজীর্ণ এই ভবনটি এরই মধ্যে ধসে পড়ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে জেলার জমিদারি আমলের আড়াই শতাব্দীকালের স্মৃতিচিহ্ন। প্রায় দেড় দশক আগে এই কাছারি বাড়ি ভবনের বারান্দার প্রধান দুটি পিলারের গায়ে লাল রঙে লেখা হয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। পিলারের আস্তর খসে পড়ায় সেই লেখা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। 

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কাছারি বাড়িকে ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়। এতসব সত্ত্বেও অদ্যাবধি এই কাছারি বাড়ি ভবনটি সংরক্ষণের আদৌ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পটুয়াখালী সদর সাবেকুন নাহার জানান, এই সম্পত্তিসহ আরো সম্পত্তি নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের রয়েছে। কলসকাঠীর জমিদার রাজেশ্বর রায় চৌধুরীর উত্তরসূরি প্রীতম মুখার্জী ওয়ারিশসূত্রে দাবিদার হিসেবে বাদী হয়ে এই রিট করেছেন। যার রিট পিটিশন নং- ৬১১/২০১৭।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, আমি সহকারী কমিশনার (ভূমি) সদর অফিস পরিদর্শনকালে জমিদারি আমলের এই কাছারি বাড়ির হাল-অবস্থা দেখেছি এবং এ সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। এই সম্পত্তির বিষয়ে উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের এখন কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।