মোবাইল ফোনে কলের সূত্র ধরে হত্যার অভিযোগে এক কিশোরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বলাত্কারের অভিযোগে ঐ কিশোর শফি সিকদার নামে ৫৫ বছর বয়সের এক ব্যক্তিকে শ্বাসরোধে হত্যার পর পালিয়ে যায়। ঘটনার পর নিহতের ব্যক্তিগত জীবন তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো ক্লু মিলেনি। পরে এক কিশোরের কাছ থেকে পুলিশ জানতে পারে শফি সিকদার শিশু-কিশোরদের বলাত্কার করতেন। এরপর শফি সিকদারের মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করে হত্যার রাতে এক কিশোরকে ফোন করার তথ্য পায় পুলিশ। ঐ ফোন নম্বরের সূত্র ধরে ১৭ বছরের ঐ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। ১৬ জুলাই ঐ কিশোরকে কুনিপাড়া থেকে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তখন সে অকপটে স্বীকার করে হত্যার কথা। পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
জানা গেছে, দক্ষিণ কুনিপাড়ার ৩২/২ নম্বর টিনশেড দোতলা বাসায় ভাড়া থাকতেন শফি সিকদার। তিনি ইস্টার্ন উড নামে একটি আসবাব তৈরির প্রতিষ্ঠানের কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। ঢাকায় তিনি একা থাকতেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী থাকেন নড়াইলে। গত ৯ জুলাই তার তালাবদ্ধ ঘর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকায় লোকজনের সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকে মেঝেতে তার লাশ পাওয়া যায়। লুঙ্গির ছেঁড়া টুকরো দিয়ে তার গলায় ফাঁস দেওয়া ছিল। নিহতের ঘরের টেলিভিশনের স্ক্রিনে রং দিয়ে লেখা ছিল, ‘শিশু ধর্ষণ বন্ধ কর।’ এ ঘটনায় নিহতের চাচাতো ভাই ইনামুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম গতকাল জানান, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ১৭ বছর বয়সি ঐ কিশোর জানিয়েছে, তেজগাঁও শিল্প এলাকার একটি মাদ্রাসায় সে পড়ালেখা করতো। তার বাবা শেওড়াপাড়া এলাকার একটি মেসে থেকে আরবি পড়ান। সে মাঝে মধ্যেই বাবার কাছে যেত। বাবার ছোট্ট সিঙ্গেল চৌকিতে দুই জনের জায়গা হতো না। তাই তাকে থাকতে দেওয়া হয় বাবার বন্ধু রিয়াজুলের সঙ্গে। প্রথম রাতেই রিয়াজুল তাকে বলাত্কার করেন। এরপর গত চার-পাঁচ বছরে আরো অনেকবার এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এতে বিরক্ত হয়ে সে বাবার কাছে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ছেড়ে দেয় লেখাপড়া। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রেলস্টেশনে থাকতে শুরু করে। সেখানেও তাকে একই ধরনের ঘটনার শিকার হতে হয়। তবে নিপীড়নকারীরা তাকে কিছু টাকাও দিত। ঐ টাকা দিয়ে সে খাবার কিনে খেত। এর মধ্যে একবার তার খুব জ্বর হয়। তার সন্দেহ হয়, বিভিন্ন জন যৌন নিপীড়ন করায় তার হয়তো এইডস হয়েছে। অল্প বয়সে মরে যেতে হবে ভেবে খুব কষ্ট হয় তার। এর প্রতিশোধ নিতে চায় সে। এক দিন সে তার এক বন্ধুর কাছে কাজ চায়। বন্ধুটি তাকে শফি সিকদারের কথা বলে জানায়, ঐ ব্যক্তি প্রায়ই হাতিরঝিলে বসে থাকেন। সে তার কাছে যায়। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তাকে কুনিপাড়ার বাসায় নিয়ে যান শফি। সেখানে রাতে তাকে বলাত্কার করেন। এরপর তিনি কিশোরকে তার পিঠ ম্যাসাজ করে দেওয়ার জন্য বলেন। ম্যাসাজের একপর্যায়ে শফি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে কিশোরটি পিঠের ওপর উঠে কাপড়ের ফিতা দিয়ে তার শ্বাসরোধ করে। শফির নিথর দেহ বিছানা থেকে ফেলে দিয়ে সে ওখানেই ঘুমায়। ভোরে উঠে চলে যাওয়ার আগে ঘরের টেলিভিশনের স্ক্রিনে সাদা রঙ দিয়ে লেখে ‘শিশু ধর্ষণ বন্ধ কর।’
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঐ কিশোর আরো বলেছে,‘ঐ লোক তো ধর্ষক, ওকে মেরে ফেললে কী হবে? যারা শিশুদের ধর্ষণ করে, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমি ঠিক কাজ করেছি। আমার যা হবার হবে। আমি যদি ধরা না পড়তাম, তাহলে এরপর রিয়াজুলকে হত্যা করতাম।’
