এই বত্সর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করিয়াছেন। কেবল নভেম্বর মাসেই আত্মহত্যা করিয়াছেন তিনজন। এইসকল আত্মহত্যার কারণ হিসাবে উঠিয়া আসিয়াছে শিক্ষাজীবন লইয়া হতাশা, প্রেমঘটিত সম্পর্কের টানাপোড়েন, কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়া এবং দারিদ্র্য ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কাহারো মধ্যে যখন বিষণ্নতা প্রবলভাবে ক্রমশ চাপিয়া বসিতে থাকে তখন মানুষটি ওই অসহ্য-চাপ হইতে মুক্তি পাইতে চাহে। কিন্তু মুক্তি পাইতে গিয়া সহজ উপায় হিসাবে অনেকক্ষেত্রে তাহারা জীবনটাকেই ধ্বংস করিয়া ফেলে। তাহাদের তখন মনে হইতে পারে—আমি আর বাঁচিতে চাহি না, আমি এই জীবনকে ঘৃণা করি, বাঁচিয়া কী লাভ, আমি মরিয়া সবাইকে মুক্তি দিতে চাই, এই জীবনের কোনো মূল্য নাই—এমন অভিব্যক্তি প্রকাশকারী ব্যক্তিরাও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকেন। ইহা ছাড়া অমুক মরিয়া বাঁচিয়া গিয়াছে, আমি কেন বাঁচিয়া আছি, আমার বাঁচিয়া থাকিবার কোনো অধিকার নাই কিংবা আমি এই সমাজের যোগ্য নহি—এমন চিন্তাভাবনার মানুষও হঠাত্ কোনো বৈরী মুহূর্তে আত্মহত্যা করিয়া বসেন। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের (আইএএসপি) তথ্যমতে, সারা বিশ্বে ফি বত্সর আট লক্ষাধিক মানুষ আত্মহত্যা করে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ বা প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। অথচ এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রহিয়াছে ৩০০ জনেরও কম। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলিতেছে, বত্সরে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার এবং দিনে গড়ে ২৯ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করিতেছেন।
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নানা রকম প্রত্যাশা থাকে—যাহা পূরণ করিতে না পারিলে তাহাদের মধ্যে বিষণ্নতা, হতাশা চলিয়া আসে। আর যখন হতাশাগুলি প্রবলভাবে গ্রাস করে—তখনই অনেকে আত্মহত্যার পথ বাছিয়া লয়। আত্মহত্যাকারী অনেকক্ষেত্রে ইহা অনুধাবন করিতে ব্যর্থ হয় যে, ইহার মধ্য দিয়া সেই নিজেকে শেষ করিয়া ফেলিতেছে। প্রকৃতপক্ষে, মানসিক যন্ত্রণা এবং নিরন্তর বিষণ্নতা হইতে মুক্তি পাইবার অনেক উপায় রহিয়াছে। কিন্তু আত্মহত্যাকারী তাহার সন্ধান কখনো খুঁজিয়া পান না। এইজন্য অনেক মনস্তত্ত্ববিদ মনে করেন যে, আত্মহত্যার মানসিক পরিস্থিতির ভিতর দিয়া যাহারা চলিতেছেন তাহাদের রক্ষার জন্য একটি সহজ হেল্পলাইন থাকা প্রয়োজন। কারণ যখনই আত্মহত্যার মতো একটি চিন্তা মাথায় আসে, তখন অনেকেই একটি শেষ উপায় খোঁজেন। কোথাও ফোন করিয়া মনস্তত্ত্ববিদের কাউন্সিলিং পাইলে তাহা আত্মহত্যা নিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে পারে। তাহা ছাড়া মানসিক রোগীর জন্য চিকিত্সকদের চেম্বারের পরিবেশ হইতে শুরু করিয়া তাহাদের প্রতি আচরণ, মনোচিকিত্সকদের সংখ্যা—সকল দিকেই বাংলাদেশে এখনো ঘাটতি রহিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে—এই মানবজীবন অত্যন্ত মূল্যবান। সকল সমস্যা বা সংকটের কোনো না কোনো সমাধান রহিয়াছে, কিন্তু জীবন চলিয়া গেলে তাহা সকল সমাধানের ঊর্ধ্বে উঠিয়া যায়।
