কলকাতা-হাওড়ার আকাশে ভয়াবহ বায়ুদূষণ

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪০

এবার ঢাকা থেকে কলকাতায় আসতে হলে মুখে মাস্ক পরে আসতে হবে। কলকাতাসহ ভারতের পরিবেশবিদরা তো আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন শহরের দূষণমাত্রা নিয়ে। এবার আন্তর্জাতিক স্তরেও সতর্ক করে বলা হলো দূষণের মাত্রায় খুব শীঘ্রই রাজধানী দিল্লিকে ছাপিয়ে যাবে কলকাতা।

দু’বছর আগেকার নির্দেশের অধিকাংশই পালন করেনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এই নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে কলকাতা ও হাওড়ার বায়ুদূষণ রোধে নিষ্ক্রিয়তার জন্য রাজ্য সরকারকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করলো জাতীয় পরিবেশ আদালত। শুধু তাই নয়, এই গাফিলতির জন্য মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট আমলাদের জেলে পাঠানো উচিত বলেও গত ক’দিন আগে মন্তব্য করেছে ডিভিশন বেঞ্চ।

বিচারপতি এস পি ওয়াংদি এবং বিশেষজ্ঞ সদস্য নাগিন নন্দার ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, দু’ সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কাছে জরিমানার টাকা জমা দিতে হবে রাজ্যকে। অন্যথায় প্রতি মাসে বাড়তি এক কোটি টাকা দিতে হবে। এই নির্দেশ কতটা পালিত হলো, সে বিষয়ে আগামী ৮ জানুয়ারির মধ্যে মুখ্য সচিবকে বিস্তারিত রিপোর্ট দাখিল করতে বলেছে আদালত।

কলকাতা ও হাওড়ার আকাশে যে মারাত্মক দূষণ তা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন পরিবেশবিদরা। আদালত নিযুক্ত কমিটির রিপোর্টেও তা উঠে এসেছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সেই কমিটির সুপারিশ মেনেই দু’বছর আগে কিছু নির্দেশ দিয়েছিল পরিবেশ আদালত। সেই নির্দেশের বেশির ভাগই পালন করা হয়নি। এই বিষয়ে আদালত পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাইলেও তা জমা দেওয়া হয়নি। মামলায় আবেদনকারী সুভাষ দত্ত জানিয়েছেন মামলার শুনানিতে আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছে, সাত মাস আগে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেওয়া সত্ত্বেও কোনো কাজ হয়নি। তারপরেই মুখ্য সচিববহ সংশ্লিষ্ট আমলাদের জেলে পাঠানো উচিত বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি। বায়ুদূষণ নিয়ে দেশের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে উদ্বিগ্ন, সেখানে রাজ্যের এমন মনোভাবে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছে পরিবেশ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ।

কলকাতা-হাওড়ার ভয়াবহ দূষণের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গাড়ির ধোঁয়া, কংক্রিটের গুঁড়ো। প্রায় এক দশক আগে থেকেই কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, ১৫ বছরের পুরনো বাণিজ্যিক গাড়ি বাতিল করতে হবে। কিন্তু পরিবেশ কর্মীদের অভিযোগ, সেই নির্দেশিকা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না। পরিবেশ আদালত এ ব্যাপারে রাজ্যের কাছে কিছু রিপোর্ট চেয়েছিল। কিন্তু তাদের রিপোর্ট সন্তোষজনক না হওয়ায় ন্যাশনাল ইনফর্মেশন সেন্টার থেকে রিপোর্ট তলব করে আদালত। সুভাষ বাবু জানান, সেই রিপোর্ট অনুযায়ী কলকাতায় বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত মিলিয়ে প্রায় ৪৪ লাখ ২২ হাজার গাড়ি চলে। তার মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ ২৪ হাজার গাড়ির বয়স ১৫ বছর বা তার বেশি। কলকাতা যেন পুরনো গাড়ির বৃদ্ধাশ্রম হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের শহরগুলোর মধ্যে দূষণের শিরোপা রাজধানী দিল্লির দখলে। কিন্তু দিল্লিকেও এবার টেক্কা দিচ্ছে কলকাতা। অন্তত নভেম্বর মাসে তো সেটাই ধরা পড়েছে দূষণের সূচকে। রবিবার ২৫ নভেম্বর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছাপিয়ে গেছে ৪০০’র সূচক। রবিবার এই সূচক ছিল ৪০৯। ৪০০ পেরিয়ে যাওয়া মানেই এই পরিবেশ প্রচণ্ড উদ্বেগজনক বলেই মনে করেছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনিটরিং স্টেশনে ধরা পড়েছে এই সূচক। ৪০০ অতিক্রম করা মানেই তা ‘সিভিয়ার’ ক্যাটেগরিতে পড়ে, জানিয়েছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। শুধু এ দিনই নয় ৯ থেকে ২৫ নভেম্বরের মধ্যে সাত দিন কলকাতার দূষণের পরিমাণ ছাপিয়ে গেছে রাজধানী।

দিওয়ালির সময় দিল্লির অবস্থা ছিল সব থেকে সংকটজনক। দূষণের সূচক ছাপিয়ে গিয়েছিল ৫০০। তার ফলে বন্ধ রাখতে হয়েছিল স্কুল-কলেজ। লোকজনের বাড়ি থেকে বেরনো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে এই সমস্যা মোকাবিলা করা উচিত, তা বোঝা যাচ্ছিল না। বিশ্বের সব থেকে দূষিত শহর বেইজিং অবশ্য এর মধ্যেই বেশকিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। রাস্তা থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাইভেট গাড়ি তুলে নেওয়া হয়েছে। জনগণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের ব্যবস্থা করা গাড়িতেই গন্তব্যস্থলে যেতে হবে। এই পদ্ধতিতে দূষণের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে ফেলেছে চীনের রাজধানী। কলকাতার এই ক্রমাগত বাড়তে থাকা দূষণ চিন্তায় ফেলেছে বিশেষজ্ঞদের। তাদের বক্তব্য, এই দূষণের ফলে গত কয়েকদিনে শহরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগের পরিমাণ বেড়েছে। সব থেকে বেশি ক্ষতি হচ্ছে শিশুদের। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে নতুন প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগতে পারে বলে ধারণা চিকিত্সকদের।

এছাড়াও হূদরোগের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মেট্রোপলিটন শহর হওয়ায় কলকাতার দূষণ সূচক ৩০০-৩৯৯ এর মধ্যে ঘোরাফেরা করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যত তা ৪০০র দিকে এগোবে বা ৪০০ অতিক্রম করবে, তত অবস্থা খারাপ হবে। এখন থেকেই যদি এই সমস্যা দূর করার কোনও উপায় বের করা না যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের দূষণের রাজধানীর তকমাটা কলকাতার মাথাতেই উঠবে, সতর্কবার্তা আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের।

কল-কারখানার ধোঁয়া, শহরের ব্যাপকহারে নির্মাণ কাজ প্রভৃতির মাঝে দেওয়ালির লাগামছাড়া বাজি পোড়ানোর বায়ু দূষণ নিয়ে দেশের পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে প্রশাসন যখন চিন্তিত, তারই মাঝে ইউনাইটেড নেশন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনইপি) অন্য এক বিপদের বার্তা দিল। ঐ সংস্থার সদ্য প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতে গৃহস্থালির দূষণ এক মারাত্মক আকার নিতে বসেছে। ভারতে অঞ্চলভিত্তিক গৃহস্থালি থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে ২২ থেকে ৫২ শতাংশের মধ্যে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, গৃহস্থালি থেকে নির্গত দূষিত বায়ু ও ঘরের ভেতরের বাতাসের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ভারতকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। গৃহের বাতাসকে সাফসুতরো করে বাইরের দূষণকে নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে ভারতের রাজধানী দিল্লির বাতাস এক উদ্বেগজনক জায়গায় পৌঁছে গেছে।

রাষ্ট্রসংঘের ঐ সংস্থার রিপোর্টে শুধু দূষণ নিয়ে উদ্বেগ নয়, তার সমাধানের জন্য ২৫টি উপায়ের কথাও বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, শহর ও গ্রামাঞ্চলে স্বচ্ছ জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস, বায়োগ্যাস, এলপিজি বিদ্যুতের স্টোভ ইত্যাদির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুত্চালিত গাড়ির ব্যবহারের দিকে নজর দিতে হবে। নিজস্ব গাড়ির বদলে জন পরিবহনে মানুষকে উত্সাহিত করা দরকার। ইউএনইপি-র ঐ রিপোর্টে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

কয়েকমাস আগে পরিবেশ মন্ত্রকের একটি রিপোর্টেও ঘরের বাতাসের দূষণ সম্পর্কে উদ্বেগজনক মন্তব্য করা হয়েছিল। ঐ রিপোর্টে কলকাতার কয়েকটি অঞ্চলের বিষয়ে বলা হয়েছে, বাইরের বাতাসের চেয়ে ঘরের বাতাস অনেকটাই বেশি দূষিত বলে চিকিত্সকদের অভিমত। দূষিত বাতাসের মধ্যে বাস করে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা কমে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্য আমরা শুধু বাইরের বাতাসের দূষণ নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাইরের চেয়ে ঘরের ভেতরের বাতাস কম ক্ষতিকারক নয়। ঘরের এই দূষিত বাতাসের ফলে দেখা গেছে, অঙ্কের সমাধান করতে গিয়ে পড়ুয়ারা হোঁচট খাচ্ছে। শিশুদের পড়া মনে রাখার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এই বিষয়টি বিশেষভাবে দেখা গেছে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। দূষণ ও স্মরণ ক্ষমতা নিয়ে পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে সমীক্ষা চালিয়েছিল কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ। পর্ষদের রিপোর্টেই এমন এক চিত্র তুলে ধরা হয়। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিষাক্ত বাতাসের জন্য ভারতে ২০ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১ লক্ষ ১০ হাজারই হলো শিশু।

n লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক