অরিত্রিদের চলে যাওয়া ও আমাদের ভাবনা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪১

সোমবার সন্ধ্যা থেকে ভিকারুন্নিসা স্কুলের ছাত্রী অরিত্রির মৃত্যুর খবরটি সব সংবাদমাধ্যম জুড়ে ঝড় তোলে। কোনো দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলেই আমাদের মধ্যে এমন ঝড় উঠে। তবে অরিত্রির দুর্ঘটনাটা বেশি আলোড়িত হয়েছে দুটি কারণকে ঘিরে। এক. ভিকারুন্নিসার মতো একটা স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষক সংশ্লিষ্টতায় ছাত্রী নির্যাতনের খবরের পুনরাবৃত্তি; যদিও এর আগের বিষয়গুলো ছিল ভিন্ন। দুই. শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভুলের কারণে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মহত্যার পুনরাবৃত্তি। গত ২৪ জুলাই রাজধানীর দুটি স্কুলে দশম শ্রেণির দুজন ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল। দুটি ঘটনাই পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে। এর মধ্যে শাহজাহানপুর শহীদ ফারুক ইকবাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী মালিহা তার সুইসাইড নোটে ফলাফলকে ঘিরে তার মৃত্যুর জন্য একজন ম্যাডামকে দায়ী করে যায়। অন্যদিকে উত্তরা রাজউক মডেল কলেজের ছাত্রী ইথিকা পরীক্ষার নম্বরপত্রে ৩৯ নম্বরের স্থলে ৬৯ করে রাখে। পরে তা শিক্ষকদের কাছে ধরা পড়লে তাকে টিসি দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। সহপাঠীদের মতে, তাকে চতুর্থতলায় প্রধান শিক্ষকের অফিসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলে সে অপমান অনুভব করে সিঁড়ি থেকে লাফ দেয়। জুলাই মাসের দুটি ঘটনার সঙ্গে অরিত্রির দুর্ঘটনার এত মিল থাকার কারণেই সারা দেশের মানুষ ফুঁসে উঠেছে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। যদিও এসএসসি ও এইচএসসি’র ফল বের হলে অভিভাবকদের সংশ্লিষ্টতায় আত্মহত্যার পুনরাবৃত্তি প্রতিবছরই দেখা যায়। এই ছেলেমেয়েদের সবাই উঠতি বয়সী তথা বয়ঃসন্ধিকাল পার করছিল এমন।

বিভিন্ন গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষদের ভিন্ন ভিন্ন কারণে আত্মহত্যার প্রমাণ মিলে। এরমধ্যে দারিদ্র্য ও অশিক্ষাসহ অন্যান্য কারণের পাশাপাশি অনুকরণ একটি কারণ। যেমন- স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কারণে পাশের বাড়ির কেউ হয়তো আত্মহত্যা করেছে আর তা মাথায় রেখে একই কারণের মুখোমুখি হয়ে আত্মহত্যা করে বসলেন অন্য এক মহিলা। সমাজ মনোবিজ্ঞানীরা আত্মহত্যার পিছনে যেসব কারণ বিশ্লেষণ করেছেন তন্মধ্যে অরিত্রির বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে আত্মসম্মানের অভাববোধ, অসহায়ত্ব, নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে ‘ওপেন জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্স’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত আচরণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে ১২-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের আত্মহত্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে মনোগবেষক ক্রেইটমেন ও তার সহযোগীগণ ‘প্যারাসুইসাইড’ ধারণাটি পরিচিত করান যার মানে হলো ‘আত্মহত্যাজনিত আচরণ’। আর যার মূল কথা হলো ‘আত্মহত্যাজনিত আচরণ’ কয়েকটি পর্যায়ক্রমিক কারণযোগে গঠিত হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা যদি অরিত্রির মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করি তবে যে পর্যায়ক্রমিক কারণগুলো দেখতে পাই তা হলো-১-ক্লাসরুমে শিক্ষক কর্তৃক অরিত্রির নকল করার সময় ধরা পড়া ও বন্ধুদের সামনে অপমানিত হওয়া; ২-কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এই মর্মে নির্দেশ করা যে অরিত্রিকে মা-বাবাসহ প্রিন্সিপালের কার্যালয়ে দেখা করতে হবে; ৩-মা-বাবাসহ অনেক শঙ্কা নিয়ে ভাইস প্রিন্সিপালের রুমে অরিত্রির প্রবেশ; ৪-ভাইস প্রিন্সিপাল কর্তৃক অরিত্রি ও মা-বাবা পরস্পরের মুখোমুখি অসম্মান, ৫-আবার শঙ্কা নিয়ে প্রিন্সিপালের রুমে প্রবেশ; ৬- প্রিন্সিপাল কর্তৃক অরিত্রি ও মা-বাবা পরস্পরের মুখোমুখি অসম্মান ও অরিত্রিকে ছাড়পত্র প্রদানের হুমকি; ৭-ছাড়পত্র পেলে এসএসসি’র অনিশ্চয়তাসহ আরও কী কী অসম্মান ও যন্ত্রণা অরিত্রিকে সইতে হবে তা একে একে ভাবতে থাকা; ৮-নিজেকে পৃথিবীতে অপ্রয়োজনীয় মনে করা; ৯-মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মা-বাবাকে রেখেই প্রিন্সিপালের রুম থেকে প্রস্থান; ১০-দ্রুত ঘরে এসে মরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যুবরণ। অর্থাত্ অরিত্রির মৃত্যুর পিছনে দশটি পর্যায়ক্রমিক কারণ যুক্ত হয়েছে যার পরিণতি তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে উঠতি বয়সীদেরকে আত্মহত্যা প্রবণ হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। যেমন যুক্তরাজ্যে আছে এনএইচএস, নাইস, এনএসপিসিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রে আছে এইচএইচএস, সিডিসি ও এএসিএপির মতো সংস্থাসমূহ। এসব সংস্থা উঠতি বয়সীদের মধ্য থেকে আত্মহত্যা প্রবণতা প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরাসরি জড়িত থেকে ভুক্তভোগীদেরকে সহায়তা করে যাচ্ছে।

আশা করি, আমাদের এখানেও গড়ে উঠবে এনএসপিসিসি ও সিডিসির মতো প্রভাবশীল সংস্থা ও সংগঠন।

n লেখক:জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক, প্রধান নির্বাহী-ফুল-পাখি-চাঁদ-নদী ফিল্মস

[email protected]