এবছর ২০১৮ সালের কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে পোল্যান্ডে। সেখানে কপ-২১ এর প্যারিস সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা জানি এই সম্মেলনে অনেকগুলো কমিটমেন্টের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানো, তাপমাত্রা কমানো এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করে সঠিকপথে পরিচালিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের সকল দেশ বিশেষ করে উন্নত দেশসমূহ তা এখনো প্রতিপালনে রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মোট ৪০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। কিন্তু তারা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ ধীরগতিতে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে বলে গতকাল নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
দৈব দানবের মতো তেড়ে আসছে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা। এমন একটি সময় ছিল যখন পরিবেশ বিষয়টিকেই বুঝতে চাইত না উন্নত বিশ্ব। তারা মনে করতো তাদের উন্নয়নটাই বড় কথা। কে মরল, কে বাঁচল সেটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে পরিবেশের বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা বিবেচনায় নিতে শুরু করেছে তখনই, যখন দেখতে পেল এর দুর্বিপাক থেকে তারাও রেহাই পাচ্ছেন না। গবেষণায় এমনও রিপোর্ট বেরিয়েছে যে, এখন থেকে পঞ্চাশ বছর পরে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউজও ছয় ইঞ্চি পানির নিচে চলে যাবে। তারপরে মূলত তাদের টনক নড়তে শুরু করে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ বলেছে এর ফলে খাদ্য ঘাটতি, বন্যা, দাবানলসহ বিভিন্ন সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করবে।
১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হয় কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ)। এরপর ১৯৯৭ সাল থেকেই জলবায়ু সংক্রান্ত একটি চুক্তি করার তোড়জোড় শুরু হয়। ২০০৯ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে দেড় ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করেন। সেভাবেই প্যারিস সম্মেলনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আলোর মুখ এখনো দেখেনি।
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের ওবামা প্রশাসনের কয়েকটি নীতিনির্ধারণী বিষয় সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেন। তারমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য স্বাক্ষরিত চুক্তির বাধ্যবাধকতা নিয়ে ট্রাম্প আগে থেকেই নেতিবাচক ও বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণ করেন। এবার যদিও জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস একে কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তবে বাস্তবতা হলো- এরইমধ্যে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে তাদের যে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার কথা ছিল তা কার্যত এখনও দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। অপরদিকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নিজের উদ্যোগেই প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ফান্ড সৃষ্টি করে সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় করছেন। তাছাড়া আগামী ২০২০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তিটি যেন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়, সেজন্য তিনি দরিদ্র, স্বল্পোন্নত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত তহবিল সময়মত অনুদান হিসেবে ছাড় করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বক্তব্য রাখছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং এ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু বিষয়টিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সে অনুযায়ী বার্ষিক, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এই বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। শুধু তাই নয় জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য আগামী একশ বছরের অর্থাত্ ডেল্টাপ্লান ২১০০ প্রণয়ন করেছেন। এজন্য তার বক্তবের সপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন সম্মেলনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ। কাজেই সম্মেলনের শেষ দিনে পোল্যান্ড ঘোষণার মাধ্যমে হয়তো সকল ভয় ও শঙ্কাকে পিছনে ফেলে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত পাবো বলেই আমরা প্রত্যাশা করি।
n লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: [email protected]
