মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাসস্থান। নিরাপদ ও আরামদায়ক বাসস্থান সবারই কাম্য। কিন্তু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-সমন্বিত সু-উচ্চ আবাসিক ভবনসমুহ ও প্রতিটি ফ্ল্যাট মনে হয় আধুনিক জেলখানার প্রকোষ্ঠ। নাই খোলামেলা পরিবেশ, উন্মুক্ত আলো-বাতাস। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য এবং ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকায় বর্তমানে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পরিবার সবাই কমবেশি ‘এয়ারকুলার/ এয়ারকন্ডিশনার’-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত অগ্নি দুর্ঘটনা, লিফট দুর্ঘটনা, বৈদ্যুতিক বিভ্রাটের সঙ্গে সঙ্গে অতি সাম্প্রতিককালে নতুন করে সংযোজন হয়েছে এয়ারকুলার/ এয়ারকন্ডিশনের দুর্ঘটনা। এসি থেকে অগ্নিকাণ্ড অথবা কমপ্রেসার ব্লাস্ট হয়ে হতাহত হওয়ার ঘটনায় বসবাসকারীরা অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত। বাংলাদেশে এ ঘটনা নতুন শোনা গেলেও বিশ্বে নতুন নয়। ‘National Fire Protection Association (NFPA)-এর এক প্রতিবেদন মতে ২০১০ সালে শুধু আমেরিকায় প্রায় ৭ হাজার ৪০০ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে, শুধু ত্রুটিযুক্ত এয়ারকন্ডিশনার থেকে, যাতে ২৯ জন মৃত্যুবরণ করেছে এবং শতাধিক আহত হয়েছে। আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটেছে জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের মধ্যে। দৈনন্দিন জীবনে প্রচণ্ড দাবদাহে এয়ারকুলার ব্যবহারের বিকল্প নেই। এতে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কভাবে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে দুর্ঘটনা শতভাগ রোধ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, ‘Prevention is better than cure’ এয়ারকুলার/এয়ারকন্ডিশনারের দুর্ঘটনা মূলত প্রধান তিনটি কারণে হচ্ছে—(১) দাহ্য পদার্থ যন্ত্রের নিকটবর্তী স্থানে সংরক্ষণকরণ। বিভিন্ন কারণে এয়ারকুলার উত্তপ্ত হয়ে নিকটবর্তী দাহ্য পদার্থ যেমন কাগজ, তেল এবং অন্যান্য পদার্থ থেকে অগ্নিকাণ্ড ব্যাপকতা লাভ করে। এক্ষেত্রে দাহ্য পদার্থ অন্ততপক্ষে তিন ফুট দূরত্বে রাখা বাঞ্ছনীয়। (২) নিয়মিত ও যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায়, ময়লা-ধুলাবালি যন্ত্রের এয়ারভেন্ট, কয়েল, ফিন্স, ফিল্টার প্রভৃতি বায়ু চলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলশ্রুতিতে, প্রথমে যন্ত্রটিতে বিভ্রাট পরিলক্ষিত হয়, পরবর্তীতে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এমনকি যখন কম্প্রেসারের তাপমাত্রা অনেকটা বৃদ্ধি পায়, তখন অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রায় চাপ বৃদ্ধি পেয়ে ব্লাস্ট (Blast/Explode)-এর মতো ঘটনা ঘটে থাকে। বছরে অন্ততপক্ষে এক-দুবার স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান বা অভিজ্ঞ পেশাজীবী দ্বারা যন্ত্রটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাতাসের গুণগত মান বিবেচনায় নিয়মিত সার্ভিসিং ও ক্লিনিং করা অপরিহার্য। (৩) নিম্নমানের এয়ারকুলার—বর্তমানে স্থানীয় বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের নিম্নমানের এয়ারকুলার সহজলভ্য হওয়ায় অন্যান্য বিষয় বিবেচনা ব্যতিরেকে একমাত্র শীতল বাতাস ও নিম্ন দর বিবেচনায় অনেকে ক্রয় করছেন। এগুলো নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে থাকে। এসির পাখা প্রথমে কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। পরবর্তীতে বন্ধ, অতঃপর অগ্নিকাণ্ড। নিম্নমানের রেফ্রিজারেন্ট, সেনসর, কমপ্রেসার, কনডেন্সিং পাইপ প্রভৃতি নিম্নমানের হওয়ায় দুর্ঘটনার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। প্রথমে অধিক সাশ্রয় মনে হলেও সবচেয়ে অধিক ক্ষতিগ্রস্তই হচ্ছেন ক্রেতারা। সে কারণে জন্য ভালো মানের এসি ক্রয় করাই উত্তম। স্থানীয় বাজারে নকল মান অনেক সহজলভ্য। মনে রাখতে হবে, নকল মানের চেয়ে নিম্ন ব্র্যান্ডের যন্ত্র অনেক ভালো। কারণ ব্র্যান্ডের মালামালের জন্য জবাবদিহি রয়েছে। নকল যন্ত্র ক্রয় করে নিজের বিপদ টেনে আনবেন না। (৪) নকল বা নিম্নমানের রেফ্রিজারেন্ট: অতি সাম্প্রতিককালে নিম্নমানের নকল গ্যাস স্থানীয় বাজার বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বাজারে সহজলভ্য হওয়ায় উপরন্তু কারিগরদের গ্যাস পরীক্ষার সুযোগ না থাকায়, প্রচুর পরিমাণে নকল গ্যাস কম্প্রেসারে ব্যবহ্নত হওয়ায় প্রথম পর্যায়ে কার্যক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং পরবর্তীতে কম্প্রেসার ব্লাস্ট ও অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয়ে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নামিদামি প্রতিষ্ঠান থেকে কার্যত ভাউচারের মাধ্যমে রেফ্রিজারেন্ট (গ্যাস) ক্রয় করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশাসনিক পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ করাও অপরিহার্য। (৫) যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ:এয়ারকুলার ব্যবহারের অন্যতম শর্ত হচ্ছে আবদ্ধ স্থান (Confined space), কিন্তু দরজা-জানালা খোলা অবস্থায় একটানা দীর্ঘ সময় এয়ারকুলার চালু রাখলে প্রথমে বিঘ্ন হতে পারে এবং পরবর্তীতে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। (৬) অন্যান্য কারণ:(ক) কম পরিমাণের রিফ্রাজারেন্ট ও নিম্নমানের থাকায় যন্ত্রটি উত্তপ্ত হতে থাকে। (খ) দীর্ঘদিন এয়ারফিল্টার পরিবর্তন না করায় ফ্যানের ব্লেড, কনডেনসারের পাইপ পরিষ্কার না করার কারণে বিভ্রাটসহ উত্তপ্ত হতে থাকে, যা সংযোগকৃত পিভিসি তারের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়ে থাকে। (গ) নিম্নমান বা নিম্ন আকৃতির তার, ভোল্টেজ ওঠানামা প্রভৃতি কারণে উত্তপ্ত হয়ে থাকে। (ঘ) সর্বোপরি আয়ুষ্কাল (Expire)-এর পরে পরিবর্তন অপরিহার্য।
একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দৈনিক ২ লাখ লিটার বাতাস গ্রহণ করে থাকে। এক্ষেত্রে দূষিত শীতল বাতাস স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পরিলক্ষিত হয় যে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের বাতাস বইরের বায়ুর চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি দূষিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ বেশি দূষিত। সে জন্য প্রয়োজন শীতল বায়ুর সঙ্গে যথার্থ ভেন্টিলেশন, ফিল্টারেশন, আদ্রতা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর গতিবেগ প্রভৃতি; অর্থাত্ গুণগত মানসম্পন্ন বায়ু (Good indoor air quality/ যার জন্য এসি নির্বাচনের আগে বড়ো প্রকল্পসমুহে দক্ষ পেশাজীবীদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
পরিশেষে বলতে হয়, ভালো মানের এয়ারকুলার ক্রয়, দক্ষ পেশাজীবী দ্বারা স্থাপন এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সার্ভিসিং ও ক্লিনিংয়ের মাধ্যমে এয়ারকুলারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যবহার করে শান্তিতে বসবাস করা সবারই কাম্য।
n লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম সার্কেল, চট্টগ্রাম
