দেশে প্রসবজনিত কারণে ফিস্টুলা রোগী ২০ হাজার

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৯, ২১:৩৫

দেশে ফিস্টুলায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কারণ এখনো দেশে অধিকসংখ্যক নারীর প্রসব হয় অদক্ষ বা অপ্রশিক্ষিত দাইয়ের হাতে। আর প্রসবকালীন জটিলতার কারণেই ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছে নারী। সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে এ রোগে আক্রান্ত নারীরা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন না। আর হলেও খুব কমসংখ্যক নারী এই রোগের চিকিত্সা নিতে আসেন। সাম্প্রতিক এক জরিপে জানা গেছে, প্রসবজনিত কারণে দেশে প্রায় ২০ হাজার ফিস্টুলা রোগী রয়েছে। প্রতিবছর নতুন করে যোগ হয় আরো ১ হাজার রোগী।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে প্রসবজনিত সেবা না পাওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা আক্রান্ত হচ্ছেন ফিস্টুলায়। প্রসবজনিত জটিলতা, চিকিত্সক ও সেবার অপ্রতুলতা, কোথায় গেলে সঠিক সেবা পেতে পারে সে বিষয়ে সঠিক তথ্য না জানা এবং সার্জিক্যাল বা আঘাতজনিত কারণে বা ভুল চিকিত্সার শিকার হয়ে দেশের অনেক নারী ফিস্টুলায় ভুগছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জরায়ু অপসারণজনিত অস্ত্রোপচারে ফিস্টুলায় আক্রান্তের হার বাড়ছে। ফিস্টুলা নিরাময়যোগ্য রোগ হলেও অবহেলা এবং রোগ গোপন করার কারণে রোগীরা সঠিক চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ সঠিকভাবে অপারেশন করালে ৮০ শতাংশ ফিস্টুলা ভালো হওয়া সম্ভব।

দেশে এখনো মাত্র ৪০ শতাংশ প্রসব হয় দক্ষ হাতে। আর বাকি ৬০ ভাগ নারী অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত দাইয়ের হাতে প্রসব করাতে গিয়ে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন। সাধারণত বাল্যবিয়ে, অপুষ্টিতে ভোগা, কম বয়সে গর্ভধারণ, অপ্রশিক্ষিত দাইয়ের হাতে বাড়িতে প্রসব, স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব, সুস্থ নারীর স্বাস্থ্য গড়ে না ওঠার কারণে ফিস্টুলা হয়ে থাকে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের ৯৫ শতাংশ নিম্নবিত্ত বা প্রত্যন্ত এলাকার। তারা অনেকে আক্রান্ত হওয়ার পর ঠিক সময়ে চিকিত্সা নিতে আসেন না।

আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ফিস্টুলা ফ্রি’ দেশ হিসেবে ঘোষণা করার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য কারণে ফিস্টুলা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ২০ লাখ নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত। শতকরা ৫ ভাগ প্রসব বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ লাখ নারী এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

মামস ইনস্টিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড ওমেন্স হেলেথর প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ডা. সায়েবা আকতার বলেন, ফিস্টুলা প্রতিরোধ করতে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বাড়িতে প্রসব কমাতে হবে। প্রসব বেদনা ওঠার পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে সন্তান প্রসব না হলে গর্ভবতী নারীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিতে হবে। তিনি বলেন, অনেক সময় অপারেশনের পরে ফিস্টুলা হয়, সে ক্ষেত্রেও রোগীরা অনেক দেরিতে চিকিত্সকের কাছে আসে, এটাও একটা কারণ। এছাড়া যেসব চিকিত্সক ফিস্টুলার অপারেশন করান, তাদেরও দক্ষ হয়েই সেই অপারেশন করানো উচিত।

এনজেন্ডারহেলথ্ বাংলাদেশের ফিস্টুলা কেয়ার প্লাস প্রকল্পের দেশীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডা. এস কে নাজমুল হুদা বলেন, দেশে প্রায় ৭০ হাজার নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত বলে অনুমান করা হয়। প্রতি বছর অন্তত ২ হাজার নারী ফিস্টুলায় নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতি হাজার বিবাহিত নারীর মধ্যে ১ দশমিক ৭ জন ফিস্টুলায় আক্রান্ত। ফিস্টুলায় আক্রান্তদের ৭৬ শতাংশই প্রসবজনিত, বাকি ২৪ শতাংশ সার্জিক্যাল বা আঘাতজনিত কারণে আক্রান্ত। প্রসবকালীন ফিস্টুলায় নারীদের যোনিপথ, মূত্রনালি ও পায়ুপথের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি হয়। এতে করে প্রসবের রাস্তা দিয়ে অনবরত প্রস্রাব বা পায়খানা কিংবা উভয়ই ঝরতে থাকে। দেশের সরকারি ১০টি ও বেসরকারি ৮টি হাসপাতাল ও সেবাকেন্দ্রে বিনা মূল্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্তদের চিকিত্সাসেবা দেওয়া হচ্ছে।