চলতি বছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৭১ শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যার মধ্যে ২ শিক্ষার্থী নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের সূত্রে এ তথ্য জানিয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের আর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১১ মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্তৃক বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতিত হয়েছে ৮৭ জন।
২০১১ সালে জনস্বার্থে করা এক মামলার সূত্র ধরে উচ্চ আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ নির্দেশনা মেনে চলার জন্য বলা হয়। তা সত্ত্বেও নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এ ধরনের শাস্তি প্রদানের ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি রাজধানী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারী (১৫) পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢোকার কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ও তার অভিভাবককে ডেকে অপমান করে। অপমান সইতে না পেরে অরিত্রি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করা ২৬৯টি সংগঠনের মোর্চা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। একই সঙ্গে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতীয় কন্যা শিশু এডভোকেসি ফোরাম ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। তারা এ ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘শিশুদের উপর শারীরিক ও মানসিকসহ সব ধরনের নির্যাতন নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকদের কেউ কেউ মনে করেন শাসন না করলে শিশুরা বোধ হয় ভাল হবে না। অথবা যে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম কড়া, সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশি ভাল থাকবে। এটি আসলে ভুল। সারা পৃথিবীতে দেখা গেছে, শাস্তি দিয়ে তাত্ক্ষণিক হয়তো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে তাদের মনে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বরং শিশুদের বুঝিয়ে মোটিভেট করে যদি শুধরানো যায় সেটার ফল ভালো হয়। স্কুলগুলোতে এখন পর্যন্ত শাস্তি দৃশ্যমান রয়েছে। এসব মনিটরিং-এর জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি শিক্ষা প্রশাসনের একটা নজরদারির প্রয়োজন আছে। কোন স্কুলগুলোতে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে তা চিহ্নিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের জন্য এক ধরনের নির্যাতনের কেন্দ্র হয়ে যাচ্ছে, যা অমানবিক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু যাচ্ছে তার প্রতিভা-মনন আরো বিকশিত করার জন্য। সেখানে যদি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে তার প্রতিভা বিকশিত হওয়ার বদলে সে ট্রমায় চলে যাবে। অনেক সময় তারা আত্মহননের ঘটনা ঘটাচ্ছে। ’
কন্যা শিশু এডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের পরিপত্র জারি হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের এ চিত্র ভয়াবহ, মর্মান্তিক এবং তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের মতো স্বনামধন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা মনে করি, অরিত্রির মৃত্যু কোন স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। তাই আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’ কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের পক্ষ থেকে তিনি মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য এখনো মানবিক নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, সেই সাথে প্রয়োজন একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ বলেন, ‘বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অপমাণিত হয়ে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ফোরাম তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের প্রতি এই রকম বিরূপ আচরণ কোনভাবেই কাম্য নয় এবং ফোরাম এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। ফোরাম মনে করে, এক্ষেত্রে কোনরূপ শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই। আর এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু বিচার না হলে তা দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। যা ভবিষ্যতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিবে।
