বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দীর্ঘদিন ধরে তাকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছে। তবে আপন মহিমায় তিনি আমাদের মাঝে আছেন, থাকবেন। কিন্তু স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর জেলের ও নির্যাতনের দিনগুলোর কথা আমরা এখন স্মরণ করতে চাই না। কারণ আজকের বাস্তবতায় আর বঙ্গবন্ধু থাকেন না। বঙ্গবন্ধু যেই বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, সে সম্পর্কে অবগত হয়ে আমরা এগোব কি না; গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ—এই চার মূলনীতির ভিত্তিতে আমরা এগোতে পারব কি না। যদি না পারি, তাহলে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসে স্ট্যাচু হয়ে থাকবেন, জীবন্ত মানুষ হয়ে তিনি আমাদের হূদয়ে থাকবেন না। তার স্বপ্নের সোনার বাংলাও হবে না।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় পার্টি-জেপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির উদ্যোগে গতকাল শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-আইডিইবির মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত আলোচনা সভায় মেনন এসব কথা বলেন। ‘মহামানবের মৃত্যু নেই’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি।
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত হবে। এ উপলক্ষ্যে গঠিত জাতীয় কমিটির সভায় আমি প্রস্তাব দিয়ে বলেছি যে, মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে বঙ্গবন্ধুর যেসব বক্তব্য ও বাকশাল গঠনের সময়কালসহ বিভিন্ন সময়ে তার বক্তৃতাসমূহ সংকলন করে সেগুলোর ভিডিও দেখানো হোক, জনগণের সামনে প্রচার করা হোক। তাহলে সোনার বাংরা গড়তে কী কী করা দরকার, সেখান থেকেই জানা যাবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের পোস্ট করা একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, ‘সেখানে দেখলাম বঙ্গবন্ধু বলছেন—আমি তিন বছর ধরে অনুরোধ করছি, হুকুম দিচ্ছি তোমরা দুর্নীতি ও চোরাকারবারি কোরো না, গরিব মানুষের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলো না, যেই মানুষদের জন্য আমি আমার যৌবন বিসর্জন দিয়েছি, তোমরা যদি তাদের নির্যাতন করো, তাহলে কঠোর হওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় থাকবে না।’ মেনন বলেন, ‘দুর্নীতি আজ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছেন। কিন্তু তার আশপাশে তাকালে দেখবেন দুর্নীতির মহোত্সব কারা করছেন। আমরা বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির কথা বলি, কিন্তু এর চেয়ারম্যানের কথা বলি না। শেয়ারবাজার নিয়ে এত কথা হলো, অথচ বিএসইসির চেয়ারম্যানের চাকরির মেয়াদ তিন দফা বাড়ানো হয়েছে কী কারণে? বিদ্যুত্ নিয়ে আমরা মহাপরিকল্পনা করছি। কিন্তু চাহিদা না থাকার পরেও আমরা এলএনজির মার্কেট তৈরি করে দিচ্ছি! এগুলো বাদ দিতে না পারলে আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে এগোতে পারব না।’
বঙ্গবন্ধু ভাবে-আবেগে কিছু করেননি, সবকিছু করেছেন
সুচিন্তিতভাবে : মোজাফফর হোসেন পল্টু
আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, খুনিরা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে নয়, আসলে তারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সুফলকে হত্যার চক্রান্ত করেছিল। অনেকে অনেক কথা বলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অত্যন্ত সূক্ষ্ম চিন্তা-ভাবনা করে রাজনীতি করেছিলেন বলেই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। ভাবে-আবেগে বঙ্গবন্ধু কিছু করেননি, তিনি ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেননি, তিনি প্রতিটি কাজ করেছিলেন অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে। বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন, জনগণের ওপর তার প্রগাঢ় আস্থা ছিল। সে কারণেই জনগণকে তিনি স্বাধীকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন।
হতাশ হওয়ার কারণ নেই, স্বাধীনতার অর্জন
কম নয় : আনোয়ার হোসেন মঞ্জু
আলোচনা সভায় সভাপতিত্বকারী জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেন, হতাশ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের স্বাধীনতার অর্জনও কম নয়। স্বাধীনতার পর অবশ্যই অনেক অর্জন হয়েছে, তবে প্রয়োজনের তো শেষ নেই। তিনি বলেন, আমরা কী পাইনি? ’৭০ সালেও দেখতাম অনেকের পায়ে স্যান্ডেল ছিল না, অনেকেরই গায়ে গামছা ও পরনে লুঙ্গি থাকত। এখন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বিদেশি জামাকাপড় পরিধান করেন। আমরা যারা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ, তারা দেখেছি সেখানে হোগলাপাতার ঘর। পরে এসেছে টিনের ঘর, এখন সেখানে দালান হয়েছে। আমার এলাকা ভাণ্ডারিয়া, কাউখালী ও ইন্দুরকানীতে এখন কাজের লোক পাওয়া যায় না, সাতক্ষীরা থেকে লোক আনতে হয়।
জেপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, পরাশক্তি যতদিন থাকবে ততদিন বঞ্চনা, সংগ্রাম থাকবে যা ৩০, ৪০ ও ৬০-এর দশকেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন মহাপুরুষ। তিনি সংগঠন করতে জানতেন, কর্মীদের স্নেহ করতে ও ভালোবাসতে জানতেন। তুখোড় বক্তা হিসেবে তিনি মানুষকে উজ্জীবিত করতে পারতেন। সেজন্য এই বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধুর নাম থাকবে। বাংলাদেশের যদি কখনো অন্য নামও হয়ে যায় তখনো বঙ্গবন্ধু থাকবেন। কারণ তিনি বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন।
ফসলকাটা ১৬ হাজার ইঁদুর লুটেরার কাছে রাষ্ট্র
পরাজিত হতে পারে না : ইনু
আলোচনা সভায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ও তার নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশ, পতাকা, পাসপোর্ট, জাতীয় সংগীত, সংবিধান ও চার মূলনীতি পেয়েছি। বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালিত্বের পুনর্জাগরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাঙালি যে বীরের জাতি আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। বাঙালি জাতির ভেতরে যে শক্তি, তাদের মধ্যে লড়াই করার যে শক্তি—সেটি ৭১-এ বঙ্গবন্ধু নতুন করে দেখিয়েছেন। ৭৫-এ একজন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি। বাঙালি জাতি-আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানিপন্থায় ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে, চার মূলনীতি বিসর্জন দিয়ে সংবিধান কাটা-ছেঁড়া করা হয়েছে, রাজাকারদের আস্তাকুঁড়ে থেকে তুলে এনে মহিমান্বিত করা হয়েছে, এদেশে আবার সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৬ হাজার লুটেরা, দুর্নীতিবাজ ও ফসল কাটা ইঁদুরের কাছে রাষ্ট্র, সংবিধান, স্বাধীনতা পরাজিত হতে পারে না। তাদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনীতি মার খেতে পারে না। সোনার বাংলা গড়ার ক্ষেত্রে এই ১৬ হাজার লুটেরা বাধা হতে পারে না। এই ঘরকাটা ইঁদুরদের ধ্বংস করে দিতে হবে। জাসদ সভাপতি বলেন, ঐক্যের ঢাল ফেলে দেওয়ার সময় এখনো হয়নি। একলা চলার নীতি পরিহার করতে হবে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে যেমন ঘরের ভেতরের আপন লোক, তেমনি ফসল কাটা ১৬ হাজার ইঁদুর সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। নইলে আবার হোঁচট খেতে হবে। বাংলাদেশ আর রাজাকারের কাছে যাবে না, এদেশ আর সাম্প্রদায়িক শক্তির হবে না।
ইনু বলেন, ৭৫, ২১ আগস্ট ও মানুষ পুড়িয়ে মারার খুনি, জঙ্গি, রাজাকারদের ঠিকানা বিএনপি। বিএনপি এখনো রাজনীতিতে বিষফোঁড়া ও বিষবৃক্ষ হিসেবে টিকে রয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি কোণঠাসা হয়েছে। তবে তারা এখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তাই দেশের বিপদ এখনো কাটেনি। খালেদা জিয়া কারাগারে বা বাইরে যেখানেই থাকুন, বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমরা ১৫ আগস্টের জল্লাদদের দেখি, তবে পেছনের হুকুমদাতাদের দেখি না।
প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ
দলের রাজনীতি হতে পারে না : দিলীপ বড়ুয়া
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ দলের রাজনীতি হতে পারে না। আজকে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ২২ পরিবারের বদলে বাঙালি ২২২ পরিবার চায়নি। বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন।
লোভ-লালসা বঙ্গবন্ধুকে নীতি-আদর্শ থেকে বিচ্যুত
করতে পারেনি : শেখ শহীদ
জেপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, কোনো লোভ-লালসা ও মন্ত্রিত্ব বঙ্গবন্ধুকে নীতি-আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সকল স্তর থেকে দুর্নীতি দূর করতে হবে। সরকারি অফিস-আদালতে সেবা পেতে মানুষের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। মানুষে-মানুষে শোষণ ও বৈষম্য দূর করতে হবে।
আলোচনা সভায় ১৪ দল শরিক গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু এমন বাংলাদেশ চাননি। ধনবৈষম্যের ব্যবধান কমাতে হবে। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে দমন করতে হলে পক্ষের শক্তির ঐক্যের বিকল্প নেই। জেপির নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নইলে অপশক্তি আবার মাথাচাড়া দিতে পারে। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন জেপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন—জেপির ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ বাঙাল, যুবসংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির জাহাঙ্গীর আলম প্রধান প্রমুখ। সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এইচ সালাহউদ্দিন মাহমুদ, মফিজুল হক বেবু, আবু সাঈদ খান, ভাইস চেয়ারম্যান মীর হারুনুর রশীদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম সালাউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন—বাসদের আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান ও মওলানা ভাসানীর পুত্রবধূ পারভিন নাছের ভাসানী। সভার শুরুতে ন্যাপ সভাপতি প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
