চিকিত্সা নিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের কোনো অভিযোগ নেই। রোগীরা সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই পাচ্ছেন সুচিকিত্সা। রাজধানীর পাঁচটি হাসপাতালে সরেজমিনে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিত্সক-নার্সরা তাদের বিরামহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালে সেবা নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় নগরবাসী রয়েছেন চরম অস্বস্তিতে। তাদের অভিযোগ, এখনো কার্যকর ওষুধ ছিটানো হয়নি। যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তাতে মশা মরছে না, বরং মশার আরো বংশ বিস্তার হচ্ছে।
গত প্রায় দুই মাস ধরে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ছড়াছড়ি। সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালে বেড খালি নেই। সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় অতিরিক্ত বেড ফেলে সেবা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও মুগদা হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ভিড়, চলছে সেবা। উপস্থিত ছিলেন চিকিত্সক, নার্সসহ অন্যান্য বিভাগের লোকজনও। চিকিত্সক ও নার্সদের তত্পরতায় সন্তুষ্ট এসব হাসপাতালের রোগীরা। হাসপাতালগুলোর চিকিত্সক ও নার্সরা বলেন, অতিরিক্ত কাজের চাপে এখন আমরা ক্লান্ত। শেষ কবে বিশ্রাম নিয়েছি মনে পড়ে না। অন্যদিকে রোগী ও তাদের স্বজনদের ভাষ্য, যথেষ্ট সেবা প্রদান করছেন চিকিত্সক ও নার্সরা।
ডেঙ্গুর মৌসুমে ঢামেক হাসপাতালে চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। হাসপাতালের মেঝেতেও জায়গা হচ্ছে না রোগীদের। মেডিসিন বিভাগের মেঝে ছাড়িয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে রোগীর বিছানা। তবে হাসিমুখে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর স্বজন জানান, এত রোগীর চাপেও চিকিত্সকরা যে সেবা দিচ্ছেন তাতে তারা খুশি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় ভর্তি মো. সোহেল বলেন, সরকারি হাসপাতাল হলেও ডেঙ্গু রোগীদের বেলায় এখানে সবাই খুব আন্তরিক। ছুটির দিনেও চিকিত্সক এসে খোঁজখবর নিয়ে গেছেন।
বিএসএমএমইউর ডেঙ্গু চিকিত্সা সেবা সেলে চিকিত্সাধীনরা হাসপাতালের চিকিত্সক ও নার্সদের সেবায় অনেক সন্তুষ্ট। মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। তার পরও এ হাসপাতালের চিকিত্সক-নার্সদের সেবায় রোগীরা খুশি। এদিকে অনেক চিকিত্সক-নার্স ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজনদের বাসায় রেখে কর্মস্থলে আসছেন রোগীদের সেবা দিতে। আবার কোনো কোনো চিকিত্সক-নার্স ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে এসে সেবা দিচ্ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বিশ্রাম নিতে বললেও তারা নিচ্ছেন না। বলছেন, রোগীদের সেবা দিয়ে তারা আত্মতৃপ্তি পান। বাসায় থাকতে তাদের ভালো লাগে না। বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগীদের সঠিক সেবা প্রদানে চিকিত্সকদের ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেছেন সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরাও। তারা বলেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের শেখার আছে। বাংলাদেশের চিকিত্সকরা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা প্রদানে নজির স্থাপন করেছেন। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরেও এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে ৯ জন মারা গেছে। এতে পুরো সিঙ্গাপুরে চিকিত্সা ব্যবস্থার টনক নড়ে যায়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা সুচিকিত্সা পাচ্ছেন। ২৪ ঘণ্টাই সারাদেশে চিকিত্সা সেবার মনিটরিং চলছে মন্ত্রণালয় থেকে। কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা। রোগী হাসপাতালে প্রবেশ করা মাত্রই চিকিত্সা শুরু হয়ে যায়। ২৪ ঘণ্টা ডেঙ্গু রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে রোগীদের চিকিত্সা সেবায় কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি বলে মন্ত্রী জানান।
প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিত্সা নিয়ে দেশে কোনো সমস্যা নেই। তবে ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে এডিস মশা নিধন করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে আমরা নিজেরাও অস্বস্তিতে আছি। এখনো মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, বারিধারা, খিলক্ষেত, হাতিরপুল. কাঠালবাগান, লালবাগ, আজিমপুর, পুরান ঢাকা, তেজগাঁওসহ রাজধানীর অনেক এলাকা থেকে ডেঙ্গু রোগীরা তার কাছে সেবা নিতে আসছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে মশা নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বলছে, তাদের ব্যবহূত ওষুধে মশা মরছে না। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকায় ব্যবহূত ওষুধে মশা না মরার প্রমাণ মিলেছে। এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসী আছে চরম অস্বস্তিতে। ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে সচেতন নগরবাসীরা জানান, জনস্বার্থে দ্রুত কার্যকর ওষুধ ছিটানোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত দুই সিটি করপোরেশনের। কেন বিলম্ব হচ্ছে? নগরবাসী আতঙ্কিত এটা কী তারা বুঝছে না?
এদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল আরো তিন জন মারা গেছেন। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল ডেঙ্গুতে জারিফ হোসেন নামে পাঁচ মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জারিফ ময়মনসিংহ শহরের শিকারিকান্দা এলাকার আরিফ হোসেনের ছেলে। পিরোজপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মমতাজ বেগম (৪৫) নামে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। শুক্রবার ঢাকায় নেওয়ার পথে রাত ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মমতাজ বেগম পিরোজপুর সদর উপজেলার তেজদাশকাঠী গ্রামের বাবুল হাওলাদারের স্ত্রী। গতকাল ঢাকার ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অজয় দাস (২৫) নামে এক তরুণ ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। তিনি চাঁদপুরের মতলব থানার সুজাতপুর গ্রামের গৌতম দাসের ছেলে।
এদিকে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ২১৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৯৩৮ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে চিকিত্সাধীন ৬ হাজার ২৭৯ জন রোগী। শুক্রবার এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৩৫ জন।
