মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজেরা অভুক্ত থেকে সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ে তেজদীপ্ত রাখতে দু’বেলা খাবার তুলে দেওয়া সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার গোপিনাথপুরের অসহায় সনাতন নারীদের এখন আর দুর্দশা কাটছে না। ভয়-ডর উপেক্ষা করে আশ্রিত গোপন ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী বিধবা বৃদ্ধা লক্ষ্মী রানি, সবিতা ও শতবর্ষী খুকিবালাদের পরিবারে অভাবের কারণে এখন নিজেদেরই আহার জুটছে না। জীবনের শেষ বেলায় বাসস্থান, ভাঙা-চুরা ঝুপড়ি ঘরে। মেঝে ঘুমানো এই নারীদের শীত নিবারণের জন্য নেই একটুখানি গরম কাপড়। তাদের দুরবস্থার কথা জেনে সহায়তা পাওয়া সেই মুক্তিযোদ্ধারাও ব্যথিত।
’৭১-এ স্বাধীনতা জয়ে আন্দোলনে জুলুমবাজ পাকিস্তানিদের পরাস্তে সারাদেশের ন্যায় সিরাজগঞ্জের মানুষের অবদানও ছিল স্মরণ করার মত। পুরুষের পাশাপাশি শহরের শিক্ষিত নারীরাও অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। তখন যুদ্ধে নির্যাতিত হয়েছিল হাজার-হাজার নারী। অগণিত শহীদের রক্তে লাল হয়েছিল বেলকুচির সগুনার হুরাসাগর নদীসহ সমগ্র জেলার খাল-বিল ও নদী-নালা। এ মহান যুদ্ধ চলাকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও বসে থাকেনি। দেশ-মাতৃকার টানে তারাও লাঙল ফেলে স্টেনগান হাতে নিয়েছিল। সিরাজগঞ্জের দামাল সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা নানা কৌশল অবলম্বন করে পাকহানাদারদের পরাস্ত করতে ঐক্যবদ্ধ ছিল। যমুনা বিধৌত চৌহালী উপজেলার মালিপাড়া ক্যাম্প করে পাকহানাদাররা। এছাড়া বেলকুচি এবং শাহজাদপুরে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চোরা-গুপ্তা হামলা চালাতে গোপন একটি ক্যাম্প করা হয় গোপিনাথপুর গ্রামের তত্কালীন ধর্মদাস সরকারের বাড়িতে। এ টিমের সঙ্গে সম্পৃক্ত তেবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা গঙ্গাধরের বোন জামাই বলরাম সরকারের বাড়ির পাশে হওয়ায় নিকট আত্মীয় ধর্মদাস সরকারের বাড়িকেই তারা বেছে নেয়। সুবিশাল বাড়িটির চারদিকে পানিমগ্ন ও জঙ্গল ঘেরা থাকায় বিমানবাহিনী থেকে আসা টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম ইকবাল ও মুক্তিযোদ্ধা রগুনাথ সরকারের নেতৃত্বে প্রায় ৪০/৫০ জনের এই টিমটি ’৭১-এর মে মাসের শেষের দিকে এসে জুলাই মাসের মাঝামাঝি অবস্থান করে। তখন গ্রামে প্রায় শ’খানেক হিন্দু পরিবার ছিল। তারাই এ গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করতো। আর একমাত্র হাজী রশিদের পরিবারটিই ছিল গ্রামের মুসলমান। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে শুধু গ্রামের মানুষগুলোই অবহিত ছিল। আর তারাই অবস্থানকালীন সময় খাওয়া-পরাসহ সামগ্রিক সহযোগিতা করেছে ঐক্যবদ্ধভাবে। কৃষিজীবী পরিবারের এই মানুষগুলো স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সকল ভয়-ডর উপক্ষো করে আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য প্রদানে ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাদের ভরণ পোষণে গ্রামের প্রধান ধর্মদাস সরকার, প্রাণবন্ধু সরকার, বাবুরাম সরকার, কলেজ ছাত্র সুধীর সরকার, রামপদ সরকার, স্কুলছাত্র রবীন্দ্রনাথ।
সরকার ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা বাড়ি-বাড়ি থেকে চাল-ডাল তুলে তা দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে অন্তত দু’বেলা আহারের ব্যবস্থা করতো। কত দিন মুরগির ব্যবস্থাও হতো। এ কাজে নিষ্ঠার সঙ্গে রাঁধুনির দায়িত্ব ছিল অন্তত ১০/১২ জন সনাতন নারী। এর মধ্যে বেঁচে আছেন মৃত বেনী মাধব সরকারের স্ত্রী শতবর্ষী খুকী বালা সরকার (১০৫), মৃত কমল সরকারের স্ত্রী সবিতা রানি সরকার (৭৬) এবং মৃত সূর্যকান্ত সরকারের স্ত্রী লক্ষ্মী রানি সরকার (৬৬)। তারা জানান, আমাদের স্বামী ও গ্রাম প্রধানদের দেশাত্মবোধে আমরাও জাগ্রত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে তারা অংশ নিতে না পেরে হতাশা বোধ করতো। তাই গোপন ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা প্রাণপণে সহযোগিতা করেছি। তারা ওখানে থাকা অবস্থায় গ্রামের পুরুষরা খোঁজ-খবর রাখতো। আর আমরা ছিলাম রান্নার দায়িত্বে। প্রতিদিনই অন্তত ২০ কেজি চাল-ডাল বাড়ি-বাড়ি থেকে গুছিয়ে খিচুড়ি রান্না করে দিতাম ধর্মদাস সরকারের বাড়িতে (বর্তমানে মৃত হাজী ছদের ব্যাপারীর বাড়ি) আশ্রয় নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের। সেদিনের সেই অম্লান স্মৃতিচারণ করে তারা জানান, অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে রান্না করা খিচুড়ি নিতে গিয়ে শরীরে পড়ে গরম ছেঁকা খেতাম। প্রচণ্ড ব্যথা থাকতো কয়েকদিন। তারপরও রান্না চালিয়ে যেতাম প্রত্যেকদিন। তখন সবারই ছিল অভাব-অনটন। বেশ কয়েকদিন নিজেদের আহারের চাল-ডাল আমরা তাদের তুলে দিতাম। অথচ নিজেদের খাবার থাকতো না। আশপাশ থেকে শাক সিদ্ধ করে আহার মিটিয়েছি। বর্তমানে আমাদের এমন অবস্থা যে পরিবারের সবাই মিলে চলা মুশকিল। ছেলেরা তাঁত শ্রমিকের কাজ করে যে আয় হয় তা দিয়ে দু’বেলা পেট পুরে খাবার জোটে না। পাটকাঠির বেড়া ঘেরা ভাঙা-চুরা ঘরে মাটিতেই শুয়ে থাকতে হয়। এ শীতে নেই কোনো গরম কাপড়। স্বাধীন দেশে আমাদের এ অবস্থা হবে ভাবেনি। শেষ বয়সে একটু ভালো থাকলে মরেও শান্তি পেতাম।
চৌহালী উপজেলার সদিয়াচাঁদপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গাজী আব্দুস ছাত্তার খলিফা জানান, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম ইকবালের ঐ গুপ্ত টিম পাক মিলিটারীদের ছিল আতঙ্ক। তবে গ্রামের আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাদের পুরো গ্রামবাসী মিলে যেভাবে সহযোগিতা করেছে তা কখনো ভোলার নয়। খিচুড়ি রান্না করে দেয়া ঐসব নারীদের এখন চরম কষ্টে দিন কাটছে জেনে আমি ব্যথিত। আমরা ভাতা পাচ্ছি, তাদের জন্যও সরকার তথা বিত্তবানদের কিছু করা উচিত।
সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোক্তা হাসিবুর রহমান স্বপন জানান, আমরা ঐ গুপ্ত ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী নারীদের বিষয়ে জানতাম না। আমি ব্যক্তিগত ও সরকারিভাবে তাদের পুনবার্সনসহ যাবতীয় সহযোগিতা করবো। তিনি জানান, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, যারা আমাদের সহায়তা করেছে তারাও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা। তাই তাদের সম্মান জানানো দেশের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। আমি তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
