আমাজন, নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বৃষ্টিচ্ছায় অরণ্য। এখান থেকেই তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অক্সিজেনের জোগান আসে। এখন সবচেয়ে আলোচনার বিষয় এই বনটিই। কারণ হঠাত্ সেখানে দাবানল সৃষ্টি হয়েছে। গোটা জঙ্গল ঢেকে গেছে কালো ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত গ্যাসে। ব্রাজিলের সাও পাওলোয় দিনেই নেমে এসেছে রাতের আঁধার। সবুজ চাঁদোয়ার নিচে দাঊদাঊ করে জ্বলছে আগুন।
পৃথিবীর একাধিক গহীন অরণ্যের ভেতর গবেষক, পর্যটক, আলোকচিত্রী, সাংবাদিকরা পৌঁছাতে পারলেও আমাজনে এখনো এমনকিছু গহীন অরণ্য রয়েছে যেখানে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকেই প্রবেশ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আর ফিরে আসতে পারেননি। আমাজনে এমনকিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।
মাথার ওপর দিয়ে যখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের হেলিকপ্টার আমাজনে প্রবেশ করে তখন আমাজনের গহীন অরণ্যের আদিবাসীরা হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে থাকেন, এ গল্প নতুন নয়। কিন্তু তারা হয়তো এখনো জানেন না তাদের তীর দ্বারা হেলিকপ্টারকে নামানো সম্ভব নয়। পুরোপুরি বুনো জীবনে অভ্যস্ত আমাজনের আদিবাসীরা তাদের অঞ্চলে কাউকে প্রবেশ করতে দিতে চান না। তারা চান নিজেদের অরণ্যের মাঝে লুকিয়ে রাখতে। আর ব্রাজিলসহ আমাজন অঞ্চলের নৃ-তাত্ত্বিক গবেষকরাও চান আমাজনের গহীনে যেন সবাই যেতে না পারেন। এই আমাজনকে নিয়ে একাধিক হলিউডের ব্লকবাস্টার ছবি নির্মিত হয়েছে। যেমন অ্যানাকোন্ডা। এই ছবিটি দেখার পর পুরো পৃথিবী থেকে লাখ লাখ পর্যটক-গবেষক আমাজনের গহীনে ছুটে যাচ্ছেন।
আমাজন যেন জীবন্ত লাইব্রেরি
আমাজনকে জীবন্ত লাইব্রেরিও বলা হয়। এর ভাণ্ডার যেন অপার জ্ঞানের আঁধার! জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, জলবায়ু, নদী, ভূগোল, পদার্থ বিজ্ঞান, ফার্মাকোলজি বা চিকিত্সা, সবারই আগ্রহের বিষয় আমাজনের নানা অধ্যায়। উষ্ণ ভৌগলিক আবহাওয়ার কারণে আমাজন পৃথিবীর সবচেয়ে জীববৈচিত্র্যময় অঞ্চল।
আমাজন জঙ্গলে প্রহরী বলা হয় অ্যানাকোণ্ডাকে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্ আকারের সাপ। এই সাপ ছোট হরিণসহ ছোট আকারের সব ধরনের প্রাণীকে গিলে খেয়ে ফেলতে পারে। এছাড়া রয়েছে বিশাল আকৃতির কুমির। যাদের ভয়ে বনের পশুরা নদীতে পানি পান করতে ভয় পায়। আমাজনের মোট আয়তন হচ্ছে ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এই গহীন অরণ্যে প্রায় ১০০ কোটি নানা শ্রেণির প্রাণীর ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব রয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এই বিশাল অরণ্য প্রায় ২.৫ মিলিয়ন কীটপতঙ্গ, প্রায় ১৬ হাজার প্রজাতির গাছ, দুই হাজারের মতো পাখি আর স্তন্যপায়ী নিজের মাঝে ধারণ করে আছে। এছাড়াও ৪০ হাজার প্রজাতির গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, ৩৭০০ প্রজাতির বিভিন্ন মাছের বিচরণ রয়েছে সেখানে। অ্যানাকোণ্ডা ছাড়াও আমাজনে আরো পাওয়া যায় এমন প্রাণীদের মাঝে অন্যতম হলো জাগুয়ার, ম্যাকাও, তাপির, পয়জন ডার্ট ফ্রগ, গোলাপি ডলফিন ইত্যাদি। গবেষকরা শুধু আমাজনের ব্রাজিল অংশেই ১২৮,৮৪৩টি অমেরুদণ্ডী প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন এখন পর্যন্ত। পেরুর অংশের একটি গাছে ৪৩ হাজার প্রজাতির পিঁপড়ার সন্ধান মিলেছে। সমগ্র ব্রিটেনেও এত প্রজাতির দেখা পাওয়া যায়নি এখন অবধি। চিকিত্সা বিজ্ঞানে যত পথ্য আমরা জানি, তার প্রায় ৩৭ শতাংশ আসে আমাজনের বৃক্ষরাজি থেকে।
আমাজনের নদী
আমাজনের কথা উঠলে আমাজন নদীর নামও অবধারিতভাবে চলে আসে। বলা হয়, আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ১২ বছরে যত পানি ব্যবহূত হয় বিভিন্ন কাজে কিংবা আশেপাশের নদীতে প্রবাহিত হয়, আমাজনের নদীতে একদিনেই তার চেয়ে ১৮ হাজার কিউসেক লিটার বেশি পানি প্রবাহিত হয়। পৃথিবীর মোট ২৫ শতাংশ স্বাদু পানি আসে আমাজন থেকেই। আমাজন নদীর মুখ এতই বিশাল, যার কারণে এর নিকটবর্তী দ্বীপ মাজারিও ধীরে ধীরে ডুবে যায়।
এছাড়া আমাজনে আরো অনেক নদী আছে। এরমধ্যে একটি নদীর পানিতে পড়লে যেকোনো জীব মুহূর্তেই গলে যাবে। হাঁড়েরও হদিস পাওয়া যাবে না। নদীটিতে পড়া বা নামা তো দূরে থাক কাছাকাছি গেলেই হাঁড়-মাংস ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই জঙ্গলের এই অংশে কোনো জীবজন্তু বাস করে না। পরিবেশ একেবারে স্তব্ধ। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ কিলোমিটার। পেরুতে আমাজনের জঙ্গলের একেবারে গভীরে এই নদীটি বয়ে চলেছে।
আমাজন রেইন ফরেস্টের উপজাতি
বন মানেই নানা জীবজন্তুর আবাস আর অবাধ বিচরণ হলেও আমাজনে প্রায় ৩শ’র বেশি উপজাতি বা নৃ-গোষ্ঠী বাস করে। এদের মধ্যে কয়েকটি হলো—আইকানা, আইমোরে, আজুরু, আনাক, আনাম্বি, অ্যাপারাই, আরারা, আরুরা, বাকাইরি, বানাওয়া, বারা, বারাসানা, বারে, বারোরা, কানেলা, দেনী, দেসানো, দাও, ফুলনিও, গুয়াজা, হুপদা, ইরানজে, জাবুতি, জারুয়ারা, জুমা, জারুনা, কাপড়, কাম্বা, কামবেবা, কানামারি, কারাজা ইত্যাদি। উল্লেখিত বিবরণ অতি ক্ষুদ্র বিবরণ। কারণ আমাজনের গহীনে এমন সব আদিবাসীরা বসবাস করছেন যাদের কাছে সভ্য জগতের বাসিন্দারা কোনোদিনই যেতে পারেনি।
অনেকেই হয়তো জানেন না আমাজন নামটি এসেছে এক যুদ্ধের পটভূমি থেকে। ফ্রান্সিস্কো ডি ওরেলানা গোত্রের সঙ্গে টেপিউস আর কয়েকটি গোত্রের যুদ্ধ বেঁধেছিল। রীতি অনুযায়ী, ওরেলানা গোত্রের মেয়েরাই টেপিউসসহ অন্যদের পুরুষ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। গ্রিক পুরাণের এমাজোনাস থেকেই ওরেলানার গণকরা এই যুদ্ধের নাম দিয়েছিল আমাজোনাস। সেখান থেকেই পুরো বনের নাম হয়ে যায় আমাজন। কিন্তু এখন ভাবার বিষয়, আমাজন কী লুটরাজদের যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে? পৃথিবীর অদ্বিতীয় ভৌগলিক, জীববৈচিত্র্যের আঁধার আমাজন হয়তো বা আর খুব বেশিদিন আর আমাদের গর্ব হিসেবে থাকবে না। আমাজনকে হয়তো আমরা খুঁজবো ইতিহাসের পাতায়।
