যাদের অপেক্ষার শেষ নেই!

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১৯:৪৩

বঙ্গোপসাগর আর বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ঘেঁষা পূর্বে বিষখালী, পশ্চিমে বলেশ্বরের মধ্যবর্তী পাথরঘাটা উপজেলা। বেড়িবাঁধ বেষ্টিত এ উপজেলার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মেস্যর ওপর নির্ভরশীল। এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবেলা করেই বসবাস করছেন। ঝড়, জ্বলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন দুর্যোগ উপকূলীয় এলাকার মানুষরা আপন করে নিয়েই বেঁচে আছেন। আর গভীর সমুদ্রে যারা মাছ শিকার করছেন তারা প্রতিবারই পরিবারের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে যান।

গভীর সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারে ডুবে কত জেলে নিখোঁজ রয়েছেন বা মৃত্যুবরণ করেছেন এর সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে না থাকলেও বেশিরভাগ জেলের মৃত্যু হয়েছে এমন কথা বলেন জেলে এবং উপকূলীয় বাসিন্দারা। বছরের পর বছর স্বজনহারা পরিবার অপেক্ষায় থাকে। হয়তো চলে আসবে প্রিয়জন। মা থাকে সন্তানের, সন্তান থাকে বাবার আর স্ত্রী থাকে স্বামীর অপেক্ষায়। যেখানে বিধবা হওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক। জেলে পল্লীগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যায় অনেকেই স্বামী হারিয়ে বিধবা জীবন বরণ করেছেন। কখনো কখনো অবুঝ শিশুদের কান্নার আওয়াজও শোনা যায় জেলে পল্লীতে।

স্বামীহারা স্ত্রী, পিতৃহারা সন্তান, আর সন্তান হারা পিতা-মাতা, যার কেউ হারায় সেই বোঝে স্বজন হারানো কষ্ট। এমন কষ্ট, দুঃখ-বেদনা এখানকার মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী। এখানকার জেলেরা যখনই  সাগরে মাছ ধরতে যায় তখনই চিরবিদায় নিয়ে যায় স্বজনদের কাছ থেকে। এমনভাবেই ১ বছর আগে স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন এক গ্রামের ৮ জন জেলে। মাছ ধরতে গিয়ে আজও তারা ফেরেননি। তাদের স্বজনরা এখনো অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা ফিরবেন।

স্বজনদের কাছ থেকে প্রতিদিনের মতো বিদায় নিয়ে গেলে শেষবারের মতো বিদায় হবে এটি হয়তো তারা জানতেন না। ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই স্বজনদের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিয়ে যায় তারা। ২১ জুলাই শনিবার সকালে হঠাত্ গভীর সমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে শাহিন ফিটারের একটি মাছ ধরা ট্রলার ডুবে যায়। ওই ট্রলারে থাকা ১৮ জেলে নিখোঁজ হয়। ১৮ জনের মধ্যে একই গ্রামের ৮ জনের আজও পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি। তাদের সবার পরিবারে এখনো চলছে আহাজারি। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া জেলেদের স্বজনদের আহাজারি এখনো চলছে। শুধু স্বজনরাই নয়, গ্রামের মানুষও তাদের শোকে শোকাহত।

জেলে পল্লী বাদুরতলা গ্রাম। এ গ্রামে পা রাখতেই বোঝা যায় শোকার্ত পরিবারের চাপা কান্না। ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া বাবুলের বাড়িতে কেউ ঢোকা মাত্রই অন্য পরিবারের সদস্যরা মুহূর্তেই হাজির হন। এটা তাদের প্রতিদিনের কাজের রুটিন। নতুন কোনো মুখ বা পরিচিত-অপরিচিত লোক এলেই তাদের মনে হয় কোনো ভালো সংবাদ  নিয়ে এসেছে। এই বুঝি কারো স্বামী, কারো বাবা, কারো পুত্র সন্তানের খবর নিয়ে এসেছে।

প্রথমেই গেলাম সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া মো. বাবুলের বাড়িতে। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করা মাত্রই দৌড়ে দরজা খুলে দেয় বাবুলে স্ত্রী ফাতিমা বেগম। তিনি সংবাদকর্মীদের দেখা মাত্রই ভেবেছিলেন হয়তো তার স্বামী এবং জামাতার খবর নিয়ে গেছি আমরা। ঘরের খাটে শুয়ে আছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে রাহাত, বড় ছেলে রুবেল পাশের বাড়িতে নারিকেলের বিনিময়ে আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন। রুবেল নিজেই আশেপাশের নিখোঁজ ৮ জেলে পরিবারকে ডেকে নিয়ে আসেন। একে একে ৮ জেলে পরিবার এলো। প্রত্যেক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর সংসারের অভাব-অনটনের গল্প।

কথা হয় নিখোঁজ জেলে বাবুল মিয়ার স্ত্রী ফাতিমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘১ বছর হইলো আমার স্বামী নিখোঁজ। আইজও তার অপেক্ষায় আছি। এই বুঝি স্বামী আইলো। দুইডা সন্তান নিয়া অতি কষ্টে দিন কাটাইতেছি। অন্যের বাড়িতে কাম কইর্যা খাই। আইজও পাশের বাড়ির ঘর লিইপ্যা দুইডা নারিকেল পাইছি।’ ৫ মাস আগে বাবুলের শোকে মারা যায় বাবা মো. কাঞ্চন মিয়া। বাবুলের মা শাহেদা বেগম বলেন, ‘মোর পোলায় তো গ্যাছেই, পোলার শোকে ওর বাবাও মইরা গ্যাছে। মুই বিধবাত হইছি আর পোলার বউডাও বিধবাত হইছে।’

বরগুনা জেলা মত্স্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘জেলে নিখোঁজ ও ট্রলার ডুবিতে মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই, তবে বছরের পর বছর কমবেশি ঝড়ের কবলে পড়ে জেলে নিখোঁজ হয় ও মৃত্যুবরণ করে। এটা এখন বলা চলে নিয়মিত ঘটনা।’