শহরের নাম ‘ইস্ট হ্যাম্পটন’। এই শহরটিকে ঘিরে একটা কথা জনশ্রুত আছে, তা হলো—গভীর বন্যায় যদি কোনোদিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিউইয়র্ক-নিউজার্সি এলাকার পুরোটা ডুবেও যায় তবে শহরতলীর মানুষদের প্রধান আশ্রয় হবে ইস্ট হ্যাম্পটনের মনটাক সাগরতীর। যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বা কাজে কেউ গেলে অগণিত ট্যুরিস্ট জোনের নাম শোনা যায়। সেই হিসেবে মনটাক খানিক কম জনপ্রিয় একটি ভেন্যু। নিউইয়র্কে থেকেও অনেকে জায়গাটির অপরূপ সৌন্দর্য মিস করে ফেলেন অনেকেই।
এ বছরের জুনের মাঝামাঝি সময়। নিউইয়র্কে তখন এই মেঘ এই রোদ্দুর। বেলাটা পড়ে গেলেই আবার ঠাণ্ডা হাওয়ায় শীত পোশাক খুঁজতে চায় শরীর। ষোড়শী নারীর মতো এমন বিক্ষিপ্ত চরিত্রে তখন আমেরিকার আবহাওয়া। সকলে মিলেই ঠিক করলাম খুব সকালেই রওনা হবো মনটাকের উদ্দেশ্যে। এদিকে কানাডা থেকে সেখানকার স্থায়ী নিবাসী ছোটভাই প্রখ্যাত অ্যাথলেট হোসাইন সুমন তার গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে আমাকে কিছু দর্শনীয় জায়গা দেখাবে বলে। সেভাবেই প্রস্তুতি আমাদের। নাস্তা শেষ করে যখন রওনা হবো তখন গুগল জিপিএস এ কিন্নরী কণ্ঠে বলছে, ‘প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা লাগবে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা থেকে মনটাক যেতে।
যেহেতু দিনে গিয়ে দিনেই ফিরবো। তাই সকালটা শহরে খরচ করতে চাইছিলাম না। পেট্রোল পাম্পে সুমন তার গাড়িটির পেটপূর্তি করতেই নিউইয়র্ক বইমেলা থেকে নাহিদুল ইসলাম ফোন দিয়ে বললো, ‘তানভীর ভাই, আজ আপনাকে বইমেলায় কিছু কথা বলতে হবে। আমরা তখন শহর ছাড়িয়ে মনটাকের উদ্দেশ্যে। দোটানার ভেতরে পড়ে গেলাম। না বলা গেল না। কারণ ঢাকা-কলকাতা থেকে বেশ ক’জন লেখক এসেছেন। সেখানে আমার নাম থাকা সত্ত্বেও হাজির না হওয়া মানে বেয়াদবী। এদিকে সুমনের চোখ-মুখে বিরক্তি। কারণ সে সুদূর কানাডা থেকে এসেছে শহরের বাইরে সময় কাটাবে বলে। ওই মেলার অডিটোরিয়ামে থাকাটা তার জন্য আসমান সমান বিরক্তির। অগত্যা আবার গাড়ি ঘুরিয়ে আলোচনা পর্ব শেষ করে আমরা যখন ভোঁ-দৌড় দেওয়ার জন্য মনটাকে রওনা হলাম তখনও আবহাওয়াটা একেবারেই বর্ণচোরা। এই ভালো, এই গুমট! কারণ মনটাকের যে মূল বাতিঘরের পাশে আমরা যাবো সেখানে মূলত পৃথিবীর শেষপ্রান্ত বলা যায়। আটলান্টিক মহাসাগরের একটি পাড়। যতদূর চোখ যায় অন্তহীন সাগর আর মেঘের খেলা।
গুগল দেখে এসব মুখস্ত করে যখন রওনা হলাম তখন চারদিকের সবুজ নিসর্গ চোখ আটকে রাখলো। গাড়ির জানালা খুলে কিছুটা বাতাসের অনুভব নেব বলে গ্লাস নামাতেই বুঝলাম সাঁ সাঁ করে দৌড়াচ্ছে গোণ্ডা সিভিক সিরিজের সুমনের গাড়িটি। আশেপাশের সাইনবোর্ডে তাকাতেই কিছু পার্কের নাম চোখে পড়ল। পরে জানলাম, এসব সবুজঘেরা পার্কেই এই সামার সিজনে বনভোজনের জন্য ছুটে আসে পুরো পরিবার কিংবা বন্ধুদের দল।
ঋতু বদলের বৈচিত্র্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যে খুব একটা পাওয়া যায় না। যতটা আছে নিউইয়র্কে। সুমন তার সেলফোনে বসন্তকালে ঠিক এই রাস্তার চেহারাটা কেমন হয়ে ওঠে তা দেখালো। গাড়ির দু-পাশ থেকে তাকিয়ে দেখতে ঘন সবুজের এই রূপ বদলের কথা ভাবতে লাগলাম। বিশ্বের এই দামি শহরের মানুষগুলো অনেক কারণেই সৌভাগ্যবান। তার ভেতরে একটি হলো শহরের চারপাশ ঘিরে নানারূপের, নানারকমের সাগর সৈকতের অবস্থান। কেউ আনন্দে পরিবার সমেত সাগরে ঝাঁপাঝাঁপি করে আসতে পারে ধারে কাছের দ্বীপে। সেই বিচের সংখ্যাও একটি দুটি নয়।
কনি আইল্যান্ড, রবার্ট মোসেস স্টেট পার্ক বিচ, লং আইল্যান্ড বিচ, স্যান্ডিহুক বিচ, অর্চাড বিচ, ব্রাইটন বিচ, ফায়ার আইল্যান্ড বিচ, শেল্টার আইল্যান্ড বিচ, রকওয়ে বিচ, ক্রাবমিডো বিচ, ম্যানহাটন বিচ, চিডার গ্রোভ বিচ, সাউথ বিচ, জ্যাকব রিস অ্যান্ড ফোর্ড, লংবিচ, ইস্ট হ্যাম্পটন বিচ ও মনটাক। কারো মন খারাপ হলে গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে সাগরপাড়ের এসে নির্জন চুপচাপ খানিক কেঁদে বুকটা হালকা করে আসতে পারে।
না, আমাদের কারোরই মন খারাপ নেই। তবে মনটাক তীরবর্তী শহরে আসতে জিপিএস কেন এত লম্বা সময়ের কথা বললো তা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম প্রায় কাছাকাছি এসে। কারণ ইস্ট হ্যাম্পটন শহরের শুরু থেকেই সুনসান মসৃণ কার্পেটের মতো রাস্তায় হঠাত্ করেই কচ্ছপ গতিতে চালাতে হলো গাড়িকে। সেও প্রায় অনেকখানি পথ। প্রায় ১ ঘণ্টা মাত্র ১৫/২০ মাইল গতিতে গাড়ি চালাতে হবে। আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে হাইওয়ে। সাগরে যাওয়ার উন্মাদনায় অনেকেই লিমিট ছাড়া গাড়ির গতি বাাড়িয়ে দেয় এখানে। তারই শাস্তিস্বরূপ এখানে এমন গতির নিয়ম করে দিয়েছে, মাঝে মাঝে মনে হবে সুনসান চুপচাপ এই রাস্তাগুলোতে বোধহয় আমরা থেমে আছি।
মাত্র ৪ হাজার মানুষের বসতি নিয়ে এই শহর। প্রতিটি পুরোনো শহর বা সৈকত উপকূলের দারুণ দারুণ সব গল্প থাকে। মনটাকেরও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সামরিক ঘাঁটি ছিল এই মনটাক উপকূল। কারণ এই মনটাক থেকে ঠিক ৯০ ডিগ্রি বরাবর অপর প্রান্তের যে উপকূল তার নাম ইংল্যান্ড। এছাড়া সেসময় সাগরের বিভিন্ন আবহাওয়ার সঙ্কেত থেকে শুরু করে শত্রুদের অবস্থান অনেক আগে থেকেই স্পষ্ট হতেন নৌবাহিনীর সৈন্যরা।
সেই হিসেব ধরেই বিংশ শতাব্দিতে মনটাক বাতিঘর স্থাপন করা হয়। যা এই এলাকার অন্যতম দর্শনীয় একটি জায়গা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এই শহরে রাজত্ব করতো সাগরপাড়ের মাঝিরা।
আমরা যখন মনটাক উপকূলে পৌঁছালাম, প্রধান টুরিস্ট জোনে, তখন আকাশে বয়সী বিকেল। সন্ধ্যাকে যতটুকু দূরে ঠেলে দেওয়া যায় সেই চেষ্টায় করছি যেন সবাই। যে যার মতো ছবি তুলতে লাগলাম। চারপাশে চোখজুড়ানো অদ্ভুত সৌন্দর্য। একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁর অর্ধেকটা সাগরপাড়ের উঠোন। যেখানে মঞ্চে রক গান গাইছে কয়েক তরুণ। তারাও গাইতে গাইতে ক্লান্ত। আমরা শেষ সময়ে এসে পৌঁছাতেই বুঝলাম তাদের শেষ গানটি চলছিল।
আমার হাতে গিটার দেখে খানিক উচ্ছ্বসিত আফসোসে গিটারিস্ট বললো, ‘আরো খানিক আগে এলে তোমার গান শোনা যেত।’
ততক্ষণে গিটার প্যাক করছে মিউজিশিয়ানরা। রেস্তোরাঁ উঠোনজুড়ে বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা। সেখানে একটু কথা বলে বুঝতে পারলাম নিউইয়র্কবাসী খুব কম এসেছে, কিংবা তারা চলে গেছে আবার নিজবাড়িতে। পর্যটকদের কেউ ইতালি, জার্মানি, মেক্সিকো থেকে এসেছে। কেউ পরিবার বা কেউ প্রেমিকাকে নিয়ে। বয়সী বিকেলের সঙ্গে সাগর পাড়ের শো শো বাতাস। সুমনের গাড়িটার পার্কিং ফি ২০ ডলার বেঁচে গেল। কারণ পার্কিং এরিয়াও তাদের বাণিজ্যিক সময় শেষ করে ফেলেছে। তাই বিকেল ৪টা থেকে পার্কিং ফ্রি। বুঝলাম, সন্ধ্যার পর এখানে তেমন একটা জমে না। আর জমার কথাও নয়। কারণ যে অদ্ভুত সাগর সৌন্দর্য তা বর্ণনাতীত। দিনের আলোয় এই অন্তর্চক্ষু দিয়ে অবগাহন না করলে বোঝা যাবে না। আমরা যে রেস্তোরাঁয় তখনও বসে সেখান থেকে সাগর পাড় প্রায় আধা কিলোমিটার নিচে। নিচে যাওয়ার হাঁটাপথটুকুও সবুজে ঘেরা। সন্ধ্যার দুর্বল অন্ধকার অসীম সাগরকে চাদর পরিয়ে দিতে চাইছে। আমরা ক’জন কিছুক্ষণ হাঁটলাম। অন্যারাও একইরকম মুগ্ধতা গুনছে। সেলফিতে সাগর আর নিজেকে ধরে রাখার তীব্র চেষ্টা করছে সকলে। সাগরের জলে হাত দিতে বোঝা গেল তীব্র ঠাণ্ডা। ওই দূর আকাশের গায়ে মনটাক বাতিঘরের চূড়া দেখা যায়।
ফেরার পথে অন্ধকার নেমে এলো। রাস্তার মৃদু আলোয় সবুজ গাছ-গাছালি তখন হরর ছবির সিকোয়েন্সের মতো। অথচ এই রাজ্যে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি বড় বড় জাহাজের মাঝিদের বাস ছিল। এক বড় দুর্ঘটনায় ওভারলোডেড জাহাজ ডুবীতে ৩৯ জন আরোহীর মৃত্যু হয়। কারণ মনটাকের সাগরপাড়ের চরিত্র খুব দ্রুত বদলায়। হঠাত্ বৈরি আবহাওয়ায় ফুলে ফেঁপে ওঠে। গাড়িটি তখনও ধীরগতির বাধ্যবাধকতায়। জিপিএস বলছে, নিউইয়র্কের আলোর শহরে ফিরতে আমাদের রাত ১২টা বেজে যাবে। আমরা তখন নিয়মিত গতির অপেক্ষায় রাস্তা গুনছি...
ছবি :লেখক
