নগরায়ণ ও আবাসন সংকট

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ২১:১২

ভারতের প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায় তাহার একটি লেখায় বলিয়াছেন, ‘গ্রামাঞ্চলে মানুষের জীবনমান যদি উন্নত করা না হয়, যদি তাহারা জীবনযাত্রায় বিস্তর ব্যবধান লইয়া পশ্চাতে পড়িয়া থাকে, তাহা হইলে তারা শহরে ছুটিয়া আসিবে। গড়িয়া উঠিবে একের পর এক বস্তি। ওভারব্রিজের নিচে, ফুটপাতে, সরকারি দপ্তরের বারান্দায় আশ্রয় লইবে। এমনকি একসময় শহরের উঁচু ভবন দখল করিয়া লইলেও বিস্ময়ের কিছু থাকিবে না। তাহারা অবকাঠামো উন্নয়নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইবে। ইহা তাহাদের রাষ্ট্রীয় অধিকার।’ বাংলাদেশে যে হারে মানুষ গ্রাম ছাড়িয়া শহরের দিকে ছুটিতেছে তাহাতে অরুন্ধতীর কথাই স্মরণ করিতে হয়। সহযোগী একটি দৈনিক শহর এলাকায় আবাসন সমস্যার যে বর্ণনা দিয়াছে তাহাতে ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে। তাহারা সরকারি সংস্থার প্রক্ষেপণ উল্লেখ করিয়া বলিয়াছে, ২০২১ সাল নাগাদ দেশে শহুরে জনসংখ্যা ৬ কোটিতে উপনীত হইবে। আর এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরিতে প্রয়োজন হইবে ৮৫ লক্ষ আবাসন। দেশে যে শহুরে জনগোষ্ঠী গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার ৫৫ ভাগ বসবাস করে বস্তিতে। শুধু ঢাকায় গড়িয়া উঠিয়াছে ৪ হাজার বস্তি। এই সংকট দিনে দিনে আরো তীব্র হইয়া উঠিতেছে। উল্লেখ্য, ফুটপাতে ও বস্তিতে বসবাসকারী জনগণের অংশটি একদিকে যেমন নাগরিক সুবিধাদি হইতে বঞ্চিত, অন্যদিকে তাহারা নাগরিক কোনো দায়ও অনুভব করে না। ফলে শহরগুলি কিম্ভূতকিমাকারে রূপ লইতেছে।

আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আবাসন প্রকল্প রহিয়াছে অনেক। সরকার নগরায়ণের কথা মাথায় রাখিয়া নানা পেশা-শ্রেণির জন্য নানাবিধ আবাসিক প্রকল্পে হাত দিয়াছে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, ইহাতে লাভ কী হইবে? আরো মানুষ আসিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িবে। প্রকল্পগুলি লইয়া আছে বহু জটিলতা, উহা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু কৃষিনির্ভর এই দেশে যদি মানুষ দৌড়াইয়া শহরে চলিয়া আসে, তাহা হইলে গ্রামবাংলার সম্পদ ও অর্থনীতির কী হইবে? কত আবাসনব্যবস্থাই-বা করা যাইবে? অন্যদিকে শুধু বসবাসের স্থান তৈরি করিলেই হয় না, সেই সঙ্গে স্যানিটেশন, পয়োনিষ্কাশন, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সরবরাহের প্রশ্নটিও জড়াইয়া আছে। সেই ব্যবস্থাও কি আমাদের শহরগুলির আছে? সেই সঙ্গে রহিয়াছে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্ন।

সুতরাং এই আসন্ন সংকট হইতে রক্ষা পাইতে এমন ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা প্রয়োজন, যাহাতে গ্রামের জনগোষ্ঠী শহরের দিকে ছুটিয়া আসাকে পেটের দায় না ভাবিতে পারে। এই ক্ষেত্রে চীনের উদাহরণ আমরা গ্রহণ করিতে পারি। চীন তার শিল্পায়নের কারণে দেখিতে পাইল যে সব মানুষ শহরাভিমুখে ছুটিয়া আসিতেছে। তাই চীন গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো, কৃষিশিল্প ও আবাসনের উপর গুরুত্ব দিয়াছে। তাহারা গ্রামাঞ্চলের ভূমির কোথায় আবাসন হইবে, কোথায় শিল্প হইবে, কোথায় কৃষিকাজ হইবে তাহা নির্ধারণের জন্য কাজ করিতেছে।

বিষয়টি এমন নহে যে, গ্রামের মানুষকে শহরে আসিতে না দেওয়া। বরং গ্রাম এলাকা শ্রমশূন্য হইয়া পড়িলে আমাদের মূল উত্স কৃষিতে একটি শূন্যতা দেখা দিবে। যাহা শেষাবধি শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলিবে। বিদ্যামান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শহরে আবাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করাটা মন্দ নহে। কিন্তু ভবিষ্যত্ বাংলাদেশে শহরে আবাসনের বদলে আমাদের গ্রামের উন্নয়নের দিকেই জোর দিতে হইবে। আর তাহা করিতে হইলে স্থানীয় সরকারকেও শক্তিশালী করিবার প্রয়োজন হইবে। বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা চিন্তা করিয়া দেখিবেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস।