গত আগস্ট ২০১৯ তারিখে একটি পত্রিকায় সিনিয়র সাংবাদিক জনাব মনজুরুল আহসান বুলবুলের লেখা ‘নহর আলীর কাছে খোলা চিঠি শিরোনামে’ প্রবন্ধটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার জিয়েলতলা গ্রামের তৃণমূল সাংবাদিক নহর আলীকে সর্বহারা কর্তৃক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, অতঃপর সংসারের হাল ধরতে এবং জীবন ও জীবিকার তাগিদে নহর আলীর ছেলে রিপনের ঢাকায় রিকশা চালানোর করুণ কাহিনি এবং সিঙ্গাপুরে গিয়ে দারিদ্র্য জয়—এসব ঘটনা লেখকের হূদয়স্পর্শী লেখায় ফুটে উঠেছে। এদিকে প্রবন্ধের শেষাংশে লেখকের অনুরোধে নহর আলীর পরিবারকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে স্বাবলম্বী করার যে গুরুদায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয় সেটা পালনের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের জন্য যে প্রশংসামূলক বক্তব্য এসেছে, তার জন্য নিজেকে ধন্য মনে করছি। আমাদেরই সম্মিলিত উদ্যোগে কথিত চরমপন্থিদের হাতে নিহত সাংবাদিক নহর আলীর ছেলে রিপন শেখকে ২০১৬ সালের প্রারম্ভে সম্পূর্ণ বিনা খরচে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরে হুন্দাই কোম্পানিতে তিনি এখনো কর্মরত রয়েছেন। গত কয়েক বছরে রিপন শেখ সিঙ্গাপুরে চাকরি করে যেমন দারিদ্র্যকে জয় করেছেন তেমনি সমস্ত অসহায়ত্ব কাটিয়ে তার পুরো পরিবারই এখন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ।
প্রবন্ধের লেখক মনজুরুল আহসান বুলবুল যেহেতু আমাকে একটি জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, তাই সমসাময়িক জনশক্তি ব্যবসার সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে একটু আলোকপাত না করে পারছি না। কেননা এই ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে চলতি আগস্টের প্রথম ১০ দিনে প্রায় ১৭৫ কোটি ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। টাকার হিসেবে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই রেমিট্যান্সের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে। রোজা ও ঈদ সামনে রেখে গত মে মাসে ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ (১৬.৪২ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এই হিসাবে বর্তমান জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো।
বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীরাই মূলত এই রেমিট্যান্সের সিংহভাগ পাঠিয়ে থাকে এবং যারা এদেশের অবহেলিত ও উপেক্ষিত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী হিসেবে বিদেশে যায় এবং নিরন্তর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এসব শ্রমজীবী মানুষ অর্থ উপার্জন করে পরিবার-পরিজনের জন্য তা দেশে পাঠায়। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে, বাংলাদেশে এই অভিবাসী খাতটি এমন একটি খাত, যা বিনা বিনিয়োগে এবং ব্যক্তিপ্রচেষ্টায় উঠে দাঁড়িয়েছে। যেখানে সরকারি তেমন পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। আরএমজি খাত, চামড়াশিল্প খাত প্রসারতার জন্য আলাদা জোন তৈরি করাসহ স্বল্পমূল্যে পানি-বিদ্যুত্ সরবরাহ থেকে শুরু করে জমি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে, সেখানে অভিবাসন খাতে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা দৃশ্যমান এ ধরনের সহযোগিতা পেতে দেখি না, কোনো প্রণোদনাও প্রদান করা হয় না। অন্যদিকে পরিতাপের বিষয় হলো, একজন প্রকৃত জনশক্তি প্রেরণকারীকে ‘আদম ব্যাপারী’ বলে গণমাধ্যমে যখন সংবাদ প্রকাশিত হয়, আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে একজন নারী কর্মী নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে এলে একতরফাভাবে নারী কর্মী প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিকে দায়ী করা হয় এবং সেই এজেন্সির ওপর শাস্তির খড়্গ নেমে আসে। অথচ যে দেশে নারী কর্মী নির্যাতিত হয়েছে সেই দেশে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে আমাদের দূতাবাসগুলোকে কখনো কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ঐ নারী কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি যদি বিএমইটি নিয়মকানুন না মেনে, ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স গ্রহণ না করে অথবা সংশ্লিষ্ট এম্বেসি থেকে বৈধকর্মী ভিসা না নিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই ঐ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমরা প্রায় সময় দেখি, সকল প্রকার নিয়মকানুন মেনে নারী কর্মী প্রেরণকারী সেই রিক্রুটিং এজেন্সিকে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের কাছে নাজেহাল হতে।
তাই বলতে হয়, জনশক্তি প্রেরণের এ খাতকে মর্যাদাশীল করে তুলতে অথবা সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্থান করতে আরো অনেক সময় হয়তো লেগে যাবে। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের প্রধান এই মাধ্যমকে শক্তিশালী, গতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ করতে সরকার ও গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এও ঠিক, গুটিকয়েক জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফাখোর ১০-১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে বন্দি হয়ে গেছে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাত। এই গুটিকয়েক রিক্রুটিং এজেন্সি মাত্রারিক্ত অভিবাসন ব্যয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে বারবার এ খাতকে বিতর্কিত করে তুলেছে। তাদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু এর বিপরীতে প্রচুর জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছে। তারই উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, সর্বহারাদের হাতে নিহত ডুমুরিয়ার তৃণমূল সাংবাদিক নহর আলীর ছেলে রিপনের কথা। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জনাব মনজুরুল আহসান বুলবুল সাংবাদিকের ছেলে রিপন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে— এমন সংবাদের কথা যখন তিনি আমাকে জানান, তখন আমারই প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুরে কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন রিপন। বর্তমানে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বেতন পান তিনি। ফিরে এসেছে নিহত সাংবাদিক নহর আলীর পরিবারে আর্থিক সংগতি। মাটির দেওয়ালে তৈরি টিনের ছাউনি বেষ্টিত একটি ঝুপড়ি ঘরের বদলে গড়ে তুলেছেন পাকা ঘর। ২ বিঘা জমিতে গরু-ছাগল আর মাছের খামার গড়ে উঠেছে। পরিবারের সন্তানেরা এখন স্কুলে পড়ছে। রিপনের মায়ের অর্থাত্ নহর আলীর স্ত্রীর চিকিত্সা হচ্ছে এখন ভারতে। কার্যত এসব প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল বলেই। যারা সম্পূর্ণভাবে নিজেদের মহতী উদ্যোগ নিয়ে এসব জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, তাদের সবাইকে আমি এই কৃতিত্বের অংশীদার করতে চাই। তাদের অনেকেই প্রকারান্তরে নীরবে সমাজে এ ধরনের মহতী দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি আরো বলতে চাই, শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়াটি হতে হবে নিরাপদ ও জনসাধারণের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে, যা দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল ধরে যাতে শ্রম অভিবাসন না হয়, সেদিকে সরকারসহ সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে নজর দিতে হবে। কেননা দালালের মাধ্যমে বিদেশ গমন নিরাপদ অভিবাসনের এক বিশাল অন্তরায়, যা অনেক ক্ষেত্রে বেদনাবিধুর ঘটনার জন্ম দেয়। আর এ ধরনের অবৈধ প্রক্রিয়া বেছে নেওয়ায় অভিবাসী কর্মীর অকালমৃত্যু ঘটে কর্মস্থলে, জলে বা স্থলে। তাই একদিকে যেমন শ্রম অভিবাসন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও আস্থাশীল করতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাই আমি প্রত্যেক জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে সমাজের হতদরিদ্র, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্য থেকে বছরে কমপক্ষে ১ শতাংশ কর্মীকে বিনা খরচে বিদেশ পাঠাতে পারে কি না, সে বিষয়টি আন্তরিকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করছি।
বলা বাহুল্য, আমাদের ফরেন রেমিট্যান্স রিজার্ভ ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও দারিদ্র্য বিমোচন আশাপ্রদ হচ্ছে না, একইভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যও কমছে না। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পকে সরকার কর্তৃক যেভাবে সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক প্রণোদনাসহ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হয় সেভাবে অভিবাসী খাতকে গুরুত্ব দিলে বিদেশি শ্রমবাজার আরো প্রসারিত হয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তখন গ্রামগঞ্জে বসবাসরত হতভাগ্য সাংবাদিক নহর আলীর ছেলে রিপনের মতো আরো অনেক পরিবারের সন্তানদের কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হয়ে তাদের ভাগ্যের চাকা খুলে যেতে পারে, দারিদ্র্যের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসাও সম্ভব হবে। সমৃদ্ধ হবে গ্রামীণ জনপদ ও অর্থনীতি, কমে যাবে সামাজিক অপরাধপ্রবণতা, মাদকের ব্যবসা। ফলে সামগ্রিকভাবে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরে আসলে হয়তো নহর আলীর মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর সংঘটিত হবে না, রিপনদের মতো নতুন কোনা অভাগাকে আর রিকশা চালাতে হবে না।
n লেখক :চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি এবং শ্রম ও অভিবাসন বিশ্লেষক
