সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সময়সীমার মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা ও সবার কল্যাণে কাজ করার যে প্রত্যয় রয়েছে তা নিশ্চিতকল্পে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। জনগণের অত্যাবশ্যকীয় চিকিত্সাসেবা বিতরণে তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুসারে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছিল, যা বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী সফল উদ্যোগসমূহের একটি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ দেশের মানুষ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। স্বাস্থ্য অন্যতম মানবাধিকার এবং সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত মানব উন্নয়নের সূচক। স্বাস্থ্যের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়; মানুষের জীবনের গুণগত মান ও সামাজিক প্রগতির ভিত্তিস্বরূপ। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছে জনবল সংকট এবং এর বিন্যাসে আঞ্চলিক বৈষম্যের সঙ্গে রয়েছে জবাবদিহিতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট। স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ে ব্যক্তিগত ব্যয় অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অতিমুনাফা, চিকিত্সার ব্যয় বাড়ানো, সরকারি নজরদারির অভাবের ফলে স্বাস্থ্যসেবায় জনগণকে অসহায় করে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার সাফল্যের কথা কমবেশি উঠে আসছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ, সেখানে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠাকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করলেও এখনো অনেক মানুষ এর বাইরে রয়েছে।
সর্বস্তরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হলে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়ন জরুরি। সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার জন্য যে জনবল ও অবকাঠামো আছে, সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সার ব্যয় এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীদের অতিরিক্ত ভিড় লক্ষ করা যায়। স্বাস্থ্যের পেছনে যত খরচ হয়, তার ৬৭ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে খরচ করছে। অথচ বৈশ্বিক মান হচ্ছে ৩৪ শতাংশের মতো।
প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিচালন ব্যয় ১০ হাজার ৭ কোটি টাকা ও উন্নয়ন ব্যয় ৯ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ও উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও এর বেশিরভাগটাই চলে যায় এই খাতে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনেই।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেছিলেন, যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বা ধীরগতিসম্পন্ন, সেখান থেকে সহজেই টাকা কেটে স্বাস্থ্যে লাগানো যেতে পারে। তিনি আরো বলেছিলেন, একটা অর্থবছর শেষে যদি দেখা যায় কোনো খাতে অর্থ বেঁচে গেছে, সেটা পরবর্তী অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতে কাজে লাগাতে পারে সরকার।
জিডিপির অনুপাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
সেই হিসেবে চিন্তা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অবহেলিত, যেটা গ্রহণযোগ্য নয় এবং বাংলাদেশের জন্যও কোনো সুখবরও নয়।
স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্ব দিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে :১. স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত জনবলের সুষম বিন্যাস নিশ্চিত করতে হবে। ২. অবিলম্বে স্বাস্থ্য খাতের সকল শূন্যপদ পূরণ করতে হবে। বাজেটে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। ৩. স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অপচয়, দুর্নীতি দূর করতে হবে। ৪. মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাস্তবসম্মত পথনকশা করতে হবে।
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত কিছুটা হলেও অবহেলা থেকে মুক্তি পাবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য অর্থনীতি,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
