অব্যবস্থাপনায় লোকসানে বরিশাল বিআরটিসি ডিপো

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ২২:০৪

নানান অব্যবস্থাপনায় মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে বরিশাল বিআরটিসির বাস ডিপো। একাধিক রুট লিজ দেওয়া, বাসগুলো সংস্কারের নামে বসিয়ে রাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন-ভাতা প্রদান করায় লোকসানের মুখে পড়েছে ডিপোটি।

বরিশাল ডিপো অফিস সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি রুটের জন্য ৭৭টি বাসের মধ্যে অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে ১৪টিকে। অকেজো ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে আরো ৯টি। ৮টি বাস ভারী মেরামত ও ৪টি হালকা মেরামতের কাজ চলছে। ৪১টি বাস সার্ভিসে থাকলেও এর মধ্যে ৬টি বাস লিজ দেওয়া হয়েছে। বাসের সংকটে একাধিক রুটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সরকারি সার্ভিস। গত ৯ জুলাই এ ডিপোতে নতুন ম্যানেজার অপারেশন পদে মো. জামসেদ আলী যোগদান করে নিয়মিত অফিস করলেও দেড় মাসেও নিজ কক্ষের বোর্ডে তার নাম সংযোজন করাতে পারেননি। গতকাল রবিবার নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল-সংলগ্ন এ ডিপোতে গিয়ে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ঢাকায় রয়েছেন বলে জানান। ডিপোর বিষয়ে            তথ্য জানতে চাইলে তিনি ঢাকার হেড অফিসের পরিচালক প্রশাসন মো. হামিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিআরটিসির পরিচালক প্রশাসনের মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগে চেষ্টা করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এসময় বরিশাল ডিপোর কর্মকর্তারা জানান, কোনো প্রকার তথ্য সরবরাহে হেড অফিসের নিষেধ রয়েছে।  তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান, বরিশাল ডিপোর অধীনে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের বাসে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার সড়কপথে ৫ সহস্রাধিক যাত্রী পরিবহন করা হয়ে থাকে। অতীতে প্রতি মাসে ডিপোটিতে দেড় কোটি টাকারও বেশি যাত্রীভাড়া আদায় হলেও এখন তা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বিভিন্ন রুটের বাসগুলো লিজ দেওয়া, পুরোনো গাড়িতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে এ বাস ডিপোর লাভের পথ রুদ্ধ করছে। ফলে একসময়ের লাভজনক ডিপোটি এখন লোকসানের মুখে পড়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। বর্তমানে বরিশাল ডিপোতে মোট ১৫১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ৮৫ জন চালক ও ২১ জন কারিগর থাকলেও তার অধীন বাস রয়েছে ৩৯টি। একাধিক চালক ও কারিগর জানান, তাদের ৬ থেকে ১৪ মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া রয়েছে। ডিপো লোকসানে থাকায় তাদের ঈদুল আজহায় বোনাস দেওয়া হলেও বেতন এখনো পাননি। তারা অভিযোগ করেন, ডিপো ম্যানেজারের অদক্ষতার ফলে তাদের এই দুরবস্থায় পড়তে হয়েছে।

বেসরকারি কোম্পানির বাসমালিকেরা এসব রুটে একের পর এক বাস সার্ভিসে যুক্ত করলেও বিআরটিসির বেলায় তার উলটো। একাধিক বাস লিজ দেওয়ায় সেসব রুটের আয় কমেছে, পাশাপাশি চালকসহ অন্যান্য স্টাফ বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন কর্মরত একাধিক ড্রাইভারের বেতন বেড়েছে। তাদের বসিয়ে রেখে এমনকি নাইটগার্ড হিসেবে কাজ করিয়ে লোকসানের বোঝা আরো ভারী করা হচ্ছে। এছাড়া গাড়ি মেরামতের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন চালকসহ অন্যরা। কর্মরত চালক ও স্টাফরা জানান, যখন যে ডিপো ম্যানেজার আসেন, তার সঙ্গে আঁতাত করে প্রশাসনিক, হিসাব কর্মকর্তাসহ কয়েকজন মিলে ডিপোকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। বেতন না পেয়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান চলাচলের অযোগ্য বাস সার্ভিসে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিসির কর্মকর্তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিআরটিসি বাস ডিপোটি ১৯৮২ সালে সামরিক সরকার বন্ধ করে দেওয়ার পর ১৯৮৭ সালে পুনরায় চালুর সময় পুরোনো বাসই ছিল একমাত্র ভরসা। এর মধ্যে প্রায় তিন বছর আগে ১০টি নতুন ভারতীয় এসি বাস দিয়ে বরিশাল-মাওয়া রুটে একটি বিশেষ সার্ভিস চালু করা হয়। প্রথমে এ সার্ভিস যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও নিম্নমানের গাড়ির কারণে এখন তা বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বরিশালে অনুরূপ ১৬টি বাস প্রদান করা হলেও এখন তা অনেকটা বোঝায় পরিণত হয়েছে। এসব এসি বাসের প্রায় সবগুলোই প্রচণ্ড গরমে যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য কেড়ে নিচ্ছে। অথচ যাত্রীদের এ জন্য বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে ছাদ থেকে পানি পড়া রোধে ছাতা মাথায় বসতে হচ্ছে যাত্রীদের।