রূপগঞ্জে স্কুলছাত্র জিসান হত্যা

খুনিদের ভয়ে এলাকাছাড়া পরিবার, করা হয়নি মামলা

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকায় গত বৃহস্পতিবার জিসান হোসেন (১৬) নামে নবম শ্রেণির এক ছাত্রকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে ও উঁচু থেকে মাটিতে আছড়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এত বড়ো নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও জিসানের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়নি। কারণ হত্যাকারীরা এলাকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের ভয়ে জিসানের দরিদ্র অসহায় পরিবার থানায় মামলা করার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও নিজ উদ্যোগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। জানা গেছে, ঘটনার পর থেকেই হত্যার সঙ্গে জড়িতরা এলাকায় মহড়া দিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডের পরও প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ফুঁসে উঠছেন এলাকাবাসীসহ শিক্ষার্থীরা। জিসানের খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে ফাঁসির দাবিতে গতকাল জিসানের স্কুল পেরাব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এলাকাবাসীও মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দিন ১৫ আগে গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকার ছাত্রলীগ নামধারী নেতা সৌরভের ছোট ভাই সিয়ামসহ তার লোকজন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার মাসুদ রানাকে পিটিয়ে জখম করে। এসময় বউবাজার এলাকার বাদল নামে একজন প্রতিবাদ করলে তাকেও পিটিয়ে জখম করা হয়। ঐ সময় নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার লোকজনও পালটা সিয়ামের দুই জন লোককে পিটিয়ে আহত করে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার সকালে নাগেরবাগ বউবাজার এলাকার হূদয় হাসান শুভ স্কুলছাত্র জিসান হোসেনকে নিয়ে গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকায় ক্রিকেট খেলা দেখতে যায়। এসময় গোলাকান্দাইল মধ্যেপাড়া এলাকার সৌরভ, তার ছোট ভাই সিয়াম, বিদ্যুত্, ইকরাম, শাওন, রোহান, আলামিন, আরমান, ইমন, সাকিব, হূদয়, ইয়ামিন, ফাহিম, মাসুম, মোস্তাকিমসহ বেশ কয়েক জন সন্ত্রাসী শুভ ও জিসানকে জোরপূর্বক গোলাকান্দাইল হাট সংলগ্ন বালুর মাঠে নিয়ে রড ও কাঠ দিয়ে পিটিয়ে সমস্ত শরীর থেঁতলে দেয়। পরে সেখান থেকে তুলে এনে সৌরভের অফিস কক্ষে দুই জনকে দুই দফা পেটানো হয়। সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় শুভ। একপর্যায়ে প্রকাশ্য দিবালোকে জিসানকে প্রায় ১০ ফুট উঁচু থেকে মাটিতে বেশ কয়েক বার আছড়ে ফেলা হয়। পরে বালুর মাঠে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করেন। পরদিন শুক্রবার সকালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জিসান মারা যায়। এদিকে, আহত হূদয় হাসান শুভর খোঁজ নিতে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তারাও সন্ত্রাসীদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। উল্লেখিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘মৃত্যুর আগে জিসান বলছিল আমার কোনো অপরাধ নেই, আমাকে অন্যায়ভাবে পিটিয়ে জখম করা হয়েছে। ওদের পায়ে ধরেও রেহাই পাইনি আমি।’ নিহত জিসানের চাচি সুমি বেগম জানান, জিসানের বাবা গোপাল হোসেন কান্দাপাড়া এলাকার এক বাসায় চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিন বছর আগে তার বড়ো ছেলে ইমন হোসেন রূপসী এলাকায় ট্রাক চাপায় নিহত হয়। ছেলে জিসানকে হারিয়ে বাবা গোপাল হোসেন ও মা রিনা বেগম পাগলের মতো হয়ে গেছেন। ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তারা।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, জুরাইনের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে মামলা করার জন্য, কিন্তু নিহত জিসানের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ মামলা করতে রাজি হয়নি। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তদন্ত মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।