রাজধানীর অন্যতম আকর্ষণ মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানা। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, অনেকটা অযত্ন-অবহেলা আর প্রাণী খাদ্যের অর্থ নয়ছয় করার অভিযোগ থাকলেও দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে এ চিড়িয়াখানায়। শিশুদের জন্য চিড়িয়াখানা যেন এক বিস্ময়। চিড়িয়াখানায় অনেক দিন পর দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রাণীর সংখ্যা বাড়াতে চাচ্ছেন তারা। এক সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা বাঘ, ইম্পালা আর ক্যাঙ্গারু দর্শনার্থীদের আমোদিত করবে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে এসব প্রাণী। চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ডা. মো. নূরুল ইসলাম জানান, নতুন অতিথিদের জন্য খাঁচা পরিষ্কার ও মেরামত করা হচ্ছে। সাধারণ বাজেট থেকে ক্রয় করা হয়েছে নতুন ১১টি প্রাণী। এর মধ্যে রয়েছে চারটি বাঘ, এক জোড়া চিতা, দুইটি হরিণ গোত্রীয় ইম্পালা ও তিনটি ক্যাঙ্গারু। এ ছাড়া দুবাই থেকে এক জোড়া শিম্পাঞ্জি ও ভারত থেকে এক জোড়া সাদা বাঘ আনার প্রক্রিয়া চলছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানান, ইতিমধ্যে চারটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, দুইটি চিতাবাঘ ও ইম্পালা দেশে এনে আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি ক্যাঙ্গারু এলেই তাদের খাঁচায় দেওয়া হবে। নতুন অতিথিদের আগমনকে কেন্দ্র করে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। খাঁচা পরিষ্কার ও মেরামতের কাজ শেষ হয়েছে। ফ্লাইট চূড়ান্ত হলেই তিনটি ক্যাঙ্গারু আসবে, তখন সব প্রাণীকে এক সঙ্গে খাঁচায় দেওয়া হবে। ১০ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা বাঘ ও বাঘিনির পোশাকি নাম দেয়া হয়েছে ‘বেঙ্গল টাইগার।’ চিড়িয়াখানায় বর্তমানে যে ছয়টি বাঘ রয়েছে তার মধ্যে কেবলমাত্র ‘জ্যোতি’ নামের বাঘিনিটি বাংলাদেশের সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাকি পাঁচটি দক্ষিণ আফ্রিকার। বর্তমানে চিড়িয়াখানায় থাকা তিনটি বাঘের বয়স ১৬ বছরের বেশি হয়ে গেছে। এর মধ্যে রাজা নামের বাঘটির বয়স ১৭ বছরের বেশি। কিছুদিনের মধ্যে বয়স্ক বাঘগুলো প্রদর্শনের অনুপযুক্ত হয়ে যাবে।
চিড়িয়াখানা সূত্র জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এ প্রাণীগুলো আনতে খরচ হচ্ছে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে চারটি বাঘ আনতে খরচ হয়েছে ৮০ লাখ টাকা, এক জোড়া চিতা ৬০ লাখ, তিনটি ক্যাঙ্গারু ৩৩ লাখ ও এক জোড়া ইম্পালা আট লাখ টাকা। এ প্রাণীগুলোর প্রজননের পরিকল্পনাও রয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের। ইতিমধ্যে চিড়িয়াখানায় নতুন অতিথিদের রাখার শেড প্রস্তুত করা হয়েছে। ১৮৬ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা। ১৯৭৪ সাল থেকে চিড়িয়াখানায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো দর্শনার্থী আসেন। চিড়িয়াখানায় রয়েছে মাংসাশী আট প্রজাতির ৩৮টি প্রাণী, ১৯ প্রজাতির বৃহত্ প্রাণী (তৃণভোজী) ২৭১টি, ১৮ প্রজাতির ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী ১৯৮টি প্রাণী। এছাড়া রয়েছে ১০ প্রজাতির সরীসৃপ ৭২টি, ৫৬ প্রজাতির ১ হাজার ১৬২টি পাখি। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পশুপাখির মধ্যে রয়েছে হরিণ, বাঘ, চিতা বাঘ, বানর, ভাল্লুক, সিংহ, হাতি, জলহস্তী, গণ্ডার, ঘোড়া, জিরাফ, জেব্রা, মায়া হরিণ, সাদা হংস, উট, বানর, বনগরু, শিয়াল, অজগর, ময়ূর, কাকাতুয়া, উটপাখি, প্যাঁচা, হুতুমপ্যাঁচা, টিয়া-ময়না দোয়েল প্রভৃতি।
এ দিকে, চিড়িয়াখানায় থাকা প্রাণীদের ঘরে গত এক সপ্তাহে বেশ কিছু নতুন অতিথি এসেছে। সেখানে থাকা জিরাফ, জেব্রা, অ্যারাবিয়ান হর্স ও জলহস্তী বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। সেসব বাচ্চার জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। গত ২১ আগস্ট একই দিনে বাচ্চা দেয় জেব্রা আর অ্যারাবিয়ান হর্স বা আরবীয় ঘোড়া। গত বুধবার সকালে আর আগের রাতে পৃথক দুটি খাঁচায় দুটি পশুই কন্যা শাবক প্রসব করে। জেব্রা শাবকের নাম রাখা হয়েছে ‘ঝিলিক’। জন্মের পর থেকেই তিড়িংবিড়িং নাচ দেখিয়ে সবাইকে মাতোয়ারা করছে ঝিলিক। অন্য দিকে, বুধবার সকালে এল ১৯ নম্বর খাঁচায় অ্যারাবিয়ান হর্স দুলকিও একটি কন্যা শাবক প্রসব করে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এর নাম রেখেছে দোলন। ঝিলিকের তুলনায় দোলন অনেকটাই মা ঘেঁষা। সারাক্ষণ মায়ের কাছাকাছি থাকতেই পছন্দ করে সে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. এস এম নজরুল ইসলাম জানান, আমাদের এখানে মোট চারটি জেব্রা ছিল। বুধবার একটি নতুন যোগ হওয়ায় এ সংখ্যা পাঁচে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে, অ্যারাবিয়ান হর্স ছিল পাঁচটি। এখন এ সংখ্যা ছয়ে উন্নীত হয়েছে। দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাণী ‘প্রিয়া’ নামের জিরাফটি ১৭ আগস্ট বাচ্চা দেয়। তার নাম রাখা হয়েছে শ্রাবণী। এটি প্রিয়ার দ্বিতীয় সন্তান।
