মনীষী

অসাম্প্রদায়িক নজরুল

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ২০:১৫

 

হিন্দু-মুসলিমকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন বলেই নজরুল লেখেন—

‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান

মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।

....

মোরা এক সে দেশের মাটিতে পাই

কেউ গোরে, কেউ শ্মশানে ঠাঁই;

মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান।’

কলকাতা এলবার্ট হলে ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ‘জাতীয় কবি’ সম্মানে সংবর্ধিত করার জবাবে কবি বলেছিলেন, ‘আমি মাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।’

ঐ অনুষ্ঠানে সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব তখন সেখানে নজরুলের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব তখনও তাঁর গান গাইব।’

সভাপতির ভাষণে প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘ফরাসি বিপ্লবের সময়কার কথা একখানি বইতে সেদিন পড়িতেছিলাম। তাহাতে লেখা দেখিলাম সে সময় প্রত্যেক মানুষ অতি মানুষে পরিণত হইয়াছিল। আমার বিশ্বাস, নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধররা এক একটি অতি মানুষে পরিণত হইবে।’

‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, ‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি-ধর্ম-ভেদ আমার কোন দিনও ছিল না, আজও নেই। আমাকে কোন দিন তাই কোনো হিন্দু ঘৃণা করেননি। ব্রাহ্মণেরাও ঘরে ডেকে আমাকে পাশে বসিয়ে খেয়েছেন ও খাইয়েছেন।’ 

‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন—

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?

কাণ্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’

‘কুলি মজুর’ কবিতায় কবি সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এভাবে:

‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি

এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।’

কবি তাঁর দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় লিখলেন, ‘এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান। এস বৌদ্ধ। এস ক্রিশ্চিয়ান। আজ আমরা সব গণ্ডি কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না। চাহিয়া দেখ, পাশে তোমাদের মহাশয়নে শায়িত ঐ বরি ভ্রাতৃগণের শব। ঐ গোরস্থান—ঐ শ্মশান ভূমিতে শোন শোন তাহাদের তরুণ আত্মার অতৃপ্ত ক্রন্দন।’

মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, জাতিতে জাতিতে বিভেদ, সমপ্রদায়গত দাঙ্গা-সংঘাত বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম জাতিগত দ্বন্দ্বে নজরুল সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তাই সকল সামপ্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠে তিনি ঘোষণা করলেন—

‘গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’