ছায়াঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে পাখিদের অনবরত কিচিরমিচির গান। এই শিমুল বাগান জুড়ে আছে সবুজ আর সবুজ। সুনামগঞ্জ জেলার এই শিমুল বাগান দেখার জন্য ভ্রমণপিপাসুরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অনেকে শুধু বাগান ঘুরেই আবার ফিরতি পথ ধরেন। কিন্তু সেই জেলাতেই যে আরো কত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান রয়েছে, তা হয়তো জানা নেই অনেকের। প্রায় একশত কেয়ার (ত্রিশ শতাংশে এক কেয়ার) জমির ওপর সৃজন করা এ শিমুল বাগানে তাঁবু টানিয়ে রাত্রিযাপন আর ঝলসানো আগুনে দেশি মোরগের গোশত পুড়িয়ে খাওয়ার মজার তুলনা নেই।
রাত যখন গভীর, শিমুল বাগান তখন নৈঃশব্দের দখলে। মাঝে মাঝে দু-চারটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা যায়। তাতে যেন নৈঃশব্দ আরো জেঁকে বসে। বাগানের পাশেই নদীর পানি বয়ে চলেছে অজানায়। মায়াবিনী জাদুকাটা নদীর ওপারে ভারতের মেঘালয় প্রদেশ। সীমান্ত চৌকির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাতিগুলো জ্বলজ্বল করছে। হিমহিম হাওয়ায় প্রকৃতির নিস্তব্ধতা আপনার ভাবুক মনকেও নদীর পানির মতো নিয়ে যাবে দূর অজানায়। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলাম। উঠলাম খুব সকালে। সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়—দু সময়েই শিমুল বাগানের রূপ-রঙের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে বেশ আপ্লুত হলাম। বাগানের পাশের এক বাড়িতে দ্রুত সাফসুতর হয়ে বাইকে করে ছুটলাম নেত্রকোনার কলমাকান্দার পথে। কিছুটা পথ গিয়ে থামলাম লাউড়ের গড় বারেকটিলায়। একটি পিলার দিয়েই ভারত-বাংলাদেশের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে এখানে। পাশেই জাদুকাটা নদীর দৃষ্টিনন্দন তীর। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ধূ-ধূ মরু প্রান্তর। অসাধারণ এক নজরকাড়া প্রকৃতি। এখানে চা চক্র শেষ করে আবারও ছুটলাম। মোটরবাইক এসে থামল টেকের ঘাট শহীদ সিরাজ লেকে। টলটলে নীলাভ পানির লেক। উঁচু-নিচু পাহাড় আর টিলার মাঝে লেকটির অবস্থান। অতি উত্সাহীরা একে নীলাদ্রি নামে ডেকে থাকে। তবে যে যা নামেই ডাকুক না কেন, শহীদ সিরাজ লেকটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য। এরপর ছুটে চলাম টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশে। মোটরবাইক চলল সরু পথ ধরে। মাঝে লাকমাছড়ায় খানিকটা বিরতি। সাদা পাহাড়ের পাশে বেশ ভালোই লাগল। এবার যাচ্ছি বাগলী বাজার। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। স্থানীয় এক দোকানে ইচ্ছে মতো পুরি, সিঙ্গারা, ছোলা, পিঁয়াজু, মুড়লি, মিষ্টি আর গরু দুধের স্বাদ নেওয়া হলো। এবার যাব ইন্দ্রপুর গ্রামে। সেখানে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর। ছুটছি তো ছুটছি, একসময় ইন্দ্রপুর গ্রামের মায়াময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে হাওরের বুক চিরে আমরা এগিয়ে গেলাম। এরপর এক জায়গায় মোটরবাইক থামালাম। নৌকা ভাড়া করে শুরু হলো হাওরের স্বচ্ছ জলে ভেসে বেড়ানো। হাওরের এপাশটা মাছের অভয়াশ্রম। তাই পাখির দেখাও মিলল বেশ। বেলা প্রায় তিনটা। পেটেও টান পড়েছে। যাই এবার মহিষখোলা। যাওয়ার পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিভাবে এই স্বল্প লেখনীতে প্রকাশ করব, তা ভেবে পাচ্ছি না। শুধু এটুকু বলব, যখন বাইক এগিয়ে যাবে, তখন মনে হবে, আপনি যেন দূর পাহাড়ের কোথাও সব পিছুটান ছুড়ে ফেলে সুখী নতুন জীবনের দ্বার প্রান্তের দেখা পেয়েছেন। প্রায় সীমান্ত ঘেঁষা পথে ছুটছি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মহিষখোলা বাজারে পৌঁছে গেলাম। আহ্ সেই কী ঘ্রাণ! কোনো মতে হাত-মুখ ধুয়ে বসে যাই খেতে। একেকজনের খাওয়ার ভাব দেখে মনে হলো, যেন কত বছর ধরে এরকম সুস্বাদু খাবার পাতে জোটে না! খাবার শেষে ছুটলাম নেত্রকোনার কলমাকান্দার উদ্দেশে। বিদায় ভাটির দেশ সুনামগঞ্জ। পাহাড়ের পাদদেশের সড়ক পথে মোটরবাইকে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণ ঝুলি সমৃদ্ধ করবে নিশ্চিত। চৈতা নতুন বাজার হতেই প্রাকৃতিক রূপের রানি নেত্রকোনা জেলার শুরু। আজ থাক এই পর্যন্তই। পরের কোনো এক সংখ্যায় কলমাকান্দার গল্প হবে।
যো গা যো গ
ঢাকার গাবতলী বা সায়েদাবাদ থেকে সুনামগঞ্জগামী নানা পরিবহন চলাচল করে। সুনামগঞ্জ সুরমা ব্রিজ থেকে মোটরবাইক বা লেগুনায় সরাসরি শিমুল বাগান যাওয়া যায়। সেখান থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরবাইকে যেতে হবে নেত্রকোনা।
বা স ভা ড়া
ঢাকা-সুনামগঞ্জ ননএসি ৫৫০ টাকা। মোটরবাইক, লেগুনা ভাড়া দরদাম করে নেওয়াটাই উত্তম হবে।
