একবিংশ শতাব্দীতে টেকসই উন্নয়ন

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ২১:২৭

উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। উন্নয়ন শব্দটির সমার্থক শব্দ উন্নতি, অগ্রগতি তথা পরিবর্তন। কারো মতে, উন্নয়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়ন, কারো কাছে স্বাধীনতা অর্জন। কারো কাছে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাধীনতা অর্জন। এক একটি জাতি তার বিদ্যমান অবস্থার আলোকে বেছে নেবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। তবে লক্ষ্যে ভিন্নতা থাকলেও সকল জাতিই উন্নয়নের পক্ষে একমত হবে এটা নিশ্চিত। প্রশ্ন হলো, টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা কী? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত ধারা কি টেকসই উন্নয়নের পক্ষে কথা বলে? শিক্ষা মানুষের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ তৈরি করে, যা ভবিষ্যত্ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। তবে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ভবিষ্যতের রূপরেখা অনুধাবন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিং-এর দিকে লক্ষ্য রেখে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা প্রয়োজন যা কিনা ভবিষ্যতে এই উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নের দিকে পরিচালিত করবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা বলতে বোঝায় শিখন এবং শিক্ষণের ক্ষেত্রে উন্নয়নের ইস্যুগুলো অন্তর্ভুক্তকরণ। যেমন, আবহাওয়ার পরিবর্তন, দুর্যোগ মোকাবিলা, দারিদ্র্য নিরসন, সাসটেইনেবল কনজাম্পশন, বায়োডাইভারসিটি, ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যকার সৃষ্ট বৈষম্য নিরসন, মানবাধিকার, বিশ্বায়ন, উন্নত জীবন সম্পর্কে সচেতনতা ইত্যাদি। পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের ওপর মানুষের চাহিদার চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এই বৃদ্ধির মাত্রা উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় উন্নত দেশে বেশি। এই বৃদ্ধির বোধ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের থাকতে হয়, থাকা উচিত। কারণ আমরা কোথায় আছি, আমাদের অবস্থান নিয়ে ভাবতে শুরু না করলে এগিয়ে যাবার রাস্তায় পথ হারাতে হবে। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে মূল উপাদানটি হলো মানসম্মত ও সৃজনশীলমূলক শিক্ষা। কাজেই শিক্ষার ধারায় পরিবর্তন আনয়ন, শিক্ষকদের ট্রেনিং প্রদান, কারিকুলাম তৈরিতে দক্ষতা আনয়নসহ অন্যন্য সব দিক পরিকল্পনার আওতায় আনার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে একটা বিপ্লব আনা যায় যা নিশ্চিত করবে একুশ শতকের শিক্ষার চাহিদা। তবে বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তারা কি চলমান উন্নয়নের ধারাকেই অনুসরণ করবে নাকি উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন ধারা উন্মোচিত করবে, ভাববে নতুন কিছু? কারণ একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট, উন্নয়নের ধারা পরিবর্তনশীল। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাই উন্নয়নের নতুন নতুন ধারাকে রপ্ত করতে হয়। সৃজনশীলতা সেখানে একটা মস্তবড়ো ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তাই সৃজনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হয় সর্বাগ্রে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁচতে শেখাই টেকসই উন্নয়নের ভিত মজবুত করে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা তাই অপরিহার্য একটি মাধ্যম। শিক্ষার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে তাই নিম্নলিখিত পয়েন্টগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারিকুলাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর স্ট্রাটেজিকে বিবেচনায় রেখে নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষাদর্শন, শিক্ষার্থীদের মনোবৈজ্ঞানিক অবস্থাকে বিবেচনায় আনা; শিক্ষণ-শিখনের ক্ষেত্রে একুশ শতকের চাহিদাকে গুরুত্ব প্রদান; বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, বয়স ও মেধা যাচাই করা; উপকরণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রযুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া; পাঠ উপস্থাপন পদ্ধতিতে ভিন্নতা আনার মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; আদর্শ শিক্ষণ পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকসহ স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান; একুশ শতকের শিক্ষা সম্পর্কে ধারণা রাখা; শিক্ষকদের ডিজিটাল ক্লাসরুম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া; বাস্তব প্রয়োগভিত্তিক জ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠের বিষয়বস্তুর সঙ্গে বাস্তবের সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো; হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে পাঠের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানো; একটা কথা মাথায় রাখা জরুরি যে, গ্লোবালাইজেশন কেবল অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়; অন্যান্য ব্যাপারগুলোর সঙ্গেও জড়িত। এক দেশের মানুষ আরেক দেশে যাচ্ছে। সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটছে। তথ্যের আদানপ্রদান ঘটছে। বদলাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস। পুরো বিশ্ব আজ মিলেমিশে একাকার। একটি দেশকে তাই সমৃদ্ধ করে তুলবার ক্ষেত্রে শিক্ষার অবদান হবে অনস্বীকার্য। তাই সঠিকভাবে, প্রয়োগমুখী ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে হবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা