যে কারণে বাজারে বড়ো বড়ো ইলিশ...

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ২৩:১৩

চকচকে রুপালি ইলিশে এখন রাজধানীর বাজার সয়লাব। শুধু কি বাজার, পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও এখন ইলিশ আর ইলিশ। অফিস ফেরত অনেক চাকরিজীবী ঘরে ফেরার সময় হাতে করে নিয়ে যাচ্ছেন এই সুস্বাদু মাছ। আকারে বড়ো বড়ো এসব ইলিশ দেখে ভোজনরসিকদের দু’চোখ জুড়িয়ে যাবারই কথা। অথচ দু/চার বছর আগেও ইলিশ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটা অধরা। বিশেষ করে বড়ো ইলিশ খুব কমই পাওয়া যেত। এখন ভ্রাম্যমাণ মাছবিক্রেতাদের ঝুড়িতে উলটো চিত্র—মানে ছোটো ইলিশ কমই পাওয়া যাচ্ছে!

কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) জানিয়েছে, ইলিশের প্রজনন সফলতা, জাটকা রক্ষা এবং মাছ আহরণের পরিমাণের ওপর এর টেকসই উত্পাদন বৃদ্ধি নির্ভর করে। প্রতি বছরই আগের বছরের ইলিশ উত্পাদনের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত অর্থবছরে দেশে ইলিশ উত্পাদিত হয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২১ হাজার টন বেশি। অথচ এক দশক আগে গত ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উত্পাদন ছিল মাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার টন।  

বিএফআরআই’র তথ্যমতে, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হচ্ছে আশ্বিন মাস। আগে আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার আগে ও পরের ১০ দিন, ১১ দিন ও ১৫ দিন মা ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা হতো। কিন্তু বিএফআরআই’র গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৬ সাল থেকে তা ২২ দিন করা হয়েছে।

বিএফআরআই’র গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২২ দিন মা ইলিশ সুরক্ষিত হওয়ায় ডিম দেওয়া ইলিশের হার ছিল ৪৬ দশমিক ৪৭ ভাগ। ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়ে হয় ৪৭ দশমিক ৭৪ ভাগ। অথচ ২০০৮-০৯ সালে যখন ১১ দিন মা ইলিশ আহরণ বন্ধ ছিল, তখন ডিম দেওয়া ইলিশের হার ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৬২ ভাগ।  

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইলিশ সারা বছরই কমবেশি ডিম ছাড়ে। কিন্তু আশ্বিন মাসের ১ম পূর্ণিমার ভরা চাঁদে বেশিরভাগ মা ইলিশ ডিম ছাড়ে। এজন্য আশ্বিনের বড়ো পূণির্মার দিনসহ আগের ১৭ দিন এবং পরের ৪ দিন (১৭+১+৪) ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন, মজুত ও বিনিময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর এতেই ইলিশ উত্পাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার ফলে ইলিশ আহরণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ১০ বছর আগে মাত্র ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএফআরআই থেকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ব্যবহার করে ইলিশের অভয়াশ্রম এলাকার জিপিএস পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে অভয়াশ্রমগুলোতে আহরণ নিষিদ্ধকালীন যথোপযুক্তভাবে জাটকা নিধন প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ইলিশ উত্পাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বর্তমানে বাজারে শুধু যে বড়ো বড়ো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে তাই নয়। দামেও তুলনামূলক সস্তা। ১ কেজি থেকে ১ কেজি ২’শ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২’শ টাকায়। আর ৬’শ থেকে ৭’শ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬’শ থেকে সাড়ে ৬’শ টাকায়। এছাড়া ৫’শ গ্রামের নীচে ইলিশের কেজি ৪’শ থেকে সাড়ে ৪’শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর উত্তরায় আব্দুল্লাহপুর মাছের আড়তের ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ বলেন, মাছের ব্যাপক আমদানি। আর বড়ো আকারের ইলিশই বেশি। তবে পদ্মার ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় সাগরের তুলনায় পদ্মার ইলিশের দাম একটু বেশি। তিনি বলেন, সাগরের ইলিশ লম্বাটে হয়। স্বাদও একটু কম। কিন্তু পদ্মার ইলিশের প্রস্থ মোটা হয়। এই ইলিশের তেল হওয়ায় স্বাদ বেশি।

মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেছেন, দেশে ইলিশের উত্পাদন রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির এই ধারা কীভাবে ধরে রাখা যায়, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। 

চলতি মৌসুমে ইলিশ উত্পাদন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে আশা করছেন বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এর মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ। তিনি জানান, ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির মূল কারণ হচ্ছে বিএফআরআই এর গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে সরকার কর্তৃক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠ পর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়ন। ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য ইনস্টিটিউট থেকে নতুন করে গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।