সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস-সংযোগের ধুম পড়েছে। দিনে-রাতে সমানতালে চলছে এই অবৈধ কাণ্ড। এসব অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও কয়েক দিনের মধ্যেই অবস্থা আবার আগের পর্যায়ে ফিরে যায়। এই অবৈধ গ্যাস-সংযোগকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কয়েকটি ধাপে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। প্রথমে তারা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এলাকার বাড়িতে বাড়িতে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ প্রদান করেন। কিছুদিন পর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে সেই সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে এলাকার সেই সব প্রভাবশালী ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে এবং তাদের সহায়তায় বিচ্ছিন্ন করা লাইনগুলোতে পুনরায় অবৈধ সংযোগ দিয়ে বাড়ি বাড়ি গ্যাস সরবরাহ করেন। এই সুযোগে নিজ নিজ এলাকার সংঘবদ্ধ চক্র অবৈধ গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভয় দেখিয়ে প্রতি মাসে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাভার তিতাস গ্যাস অফিসের কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবৈধ গ্যাস-সংযোগগুলো দেওয়া হয়েছে। আর এজন্য বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মাইলের পর মাইল পাইপ বসিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস-সংযোগ দিয়ে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লা থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা।
আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের আব্দুর রহিম জানান, ইতিপূর্বে কলতাসূতি এলাকায় অবৈধ সংযোগ প্রদানের প্রতিবাদ করায় ঠিকাদাররা তাকে হত্যা করার হুমকি দেন। এতে তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। তিতাস গ্যাসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এভাবে অবাধে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালালেও থানার পুলিশের নীরবতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জিরানী টেঙ্গুরী এলাকার বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম জানান, ‘অবৈধ গ্যাস-সংযোগ অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় আমাদের এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ একদম থাকে না। মাঝরাতের দিকে কিছুটা চাপ থাকলেও ভোর হতে না হতেই আবার সংকট দেখা দেয়। বৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ নিয়েও বর্তমানে গ্যাসের সংকটে আছি। অবিলম্বে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন করা না হলে দিনে দিনে এই সংকট আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে। এছাড়া নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করে কথিত ঠিকাদার দিয়ে শত শত বাড়িতে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।’
সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, বৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয় ঠিকাদার ও তিতাস কর্তৃপক্ষের পেছনে। বর্তমানে আবাসিক সংযোগ বন্ধ থাকলেও টাকা দিলেই মেলে অবৈধ সংযোগ। সরিষার মধ্যে ভূত থাকলে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধ করা কঠিন। তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে প্রকাশ্যেই অবৈধ সংযোগ প্রদান করা হচ্ছে। অবৈধ এসব সংযোগ থেকে আগুন লেগে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটছে। অবিলম্বে এসব অবৈধ সংযোগ অপসারণ করা না হলে ভবিষ্যতে আরো বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী। সম্প্রতি আশুলিয়ার শ্রীপুর, নতুননগর, সুবন্দি, কন্ডা ও খালপাড় এলাকায় প্রদান করা হয়েছে এসব অবৈধ গ্যাস-সংযোগ।
এছাড়া সাভারের গেন্ডা, রাজাশন, সিটিলেন, উলাইল, কর্ণপাড়া, হেমায়েতপুর, আশুলিয়ার কবিরপুর, বারৈপাড়া, জিরানী, শ্রীপুর, বাইপাইল, বুড়িরবাজার, ডেন্ডাবের, পল্লী বিদ্যুত্, গাজীরচট, জামগড়া, বেরন, নিশ্চিন্তপুর, ঘোষবাগ, নরসিংহপুর, জিরাব, ইয়ারপুর, টঙ্গাবাড়ী, কাঠগড়াসহ আশুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে এবং সাভার পৌর এলাকাসহ গোটা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অবৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগ দিয়ে ঠিকাদার ও স্থানীয় দালালরা প্রতিটি বাড়ির মালিকের কাছ থেকে ৬০-৭০ হাজার টাকা নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানির সাভার এরিয়ার ম্যানেজার প্রকৌশলী আবু সাদাত্ মো. সায়েম মোবাইল ফোনে জানান, অবৈধ গ্যাস-সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ইতািমধ্যে অনেক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও গ্যাসপাইপ জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
