শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৩৬

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কেমন হওয়া প্রয়োজন? আমাদের স্কুলগুলোতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কেমন সেটা সম্প্রতি অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনাটি একটা ধারণা দেয় মানুষের সামনে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় দেশ তোলপাড়। ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। প্রশ্নের আঙ্গুল উঠেছে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি। গ্রেফতার হয়েছেন শিক্ষিকা। তিন জন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। কিন্তু এইসব বিচার, দাবি পূরণ ছাপিয়ে কোথাও কি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানবিক সম্পর্কের বিষয়টির কথা কেউ বলছেন? মন্ত্রী, শিক্ষক, প্রশাসন কেউই কী বোঝার চেষ্টা করছেন, এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে যদি না শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক বন্ধুর মতো না হয়। আবার এটাও ভাবতে হবে, অরিত্রী পরীক্ষা দিতে না পেরে যখন বাসায় ফিরে আসলো তখন মা-বাবার কাছে কেমন ব্যবহার পেয়েছিল। সেই ব্যবহারটা কী খুব ভালো ছিল! তারা কী অরিত্রীকে বলেছিলেন, মা, জীবনে একটা ভুল করেছো, ঠিক আছে। আর করো না। আবার নতুন করে শুরু কর। যদি বলা হত, তাহলে কী অরিত্রী আত্মহত্যা করত?

একজন ছাত্রের ভালো লেখাপড়ার পেছনে তার শিক্ষক ও অভিভাবকের গুরুত্ব সমান। তাদের সঙ্গে সম্পর্কটাও সহজ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক মোটেও সহজ নয়। একটি ভুল করবার পর তা শিক্ষক বা অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করার মত সম্পর্ক কয়টা পরিবারে রয়েছে। তাই আমাদের শিশু-কিশোররা নিজেদের ভেতরে গুমরে মরে। ছেলেমেয়েদের বেড়ে উঠবার সময়টা এমন যে যত দিন যায় তারা নতুন নতুন জিনিসের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। মুখোমুখি হয় নতুন নতুন পরিস্থিতির। টিনএজ বয়সে খুব আবেগপ্রবণ থাকে ছেলেমেয়েরা। তাই তাদের মন বুঝে কথা বলতে হয়। কোনোকিছু শেখাতে হলেও হুকুম বা বাধ্য না করে বন্ধুর মতো বোঝাতে হয়। কিন্তু আমরা কি তা করি!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো। প্রত্যেক শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরে কিংবা একাডেমিক কাজ ছাড়াও কথা বলার সময় দিতে হবে। শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের সময় দেন তা হলে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় ভালো হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকরা শুধু শিক্ষক নয় অনেকটা গাইড, ফিলোসফারের মতো। কেননা বাংলাদেশের বাস্তবতায় সব শিক্ষার্থী শিক্ষিত পরিবার থেকে আসে না। তাদের কাছে শিক্ষকরাই হন সবচেয়ে কাছের মানুষ।

ভারতীয় নাগরিক পশ্চিমবঙ্গের নিরুপমা রায় ফেসবুকে লিখেছেন, তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময় হাতে কিছু পয়েন্ট লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিক্ষকের হাতে তিনি ধরা পড়েন। তাকে অধ্যক্ষের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। খাতা মিলিয়ে দেখা হয় সেই পয়েন্টগুলো তিনি খাতায় লিখেছেন। অধ্যক্ষ কোনো বকাঝকা না করে তাকে নতুন খাতা দিয়ে বললেন, আবার লেখো। এত সুন্দর সহজ সমাধান যে হতে পারে, আমাদের স্কুলের শিক্ষক, প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট- যারা গার্ড দেন পরীক্ষা কেন্দ্রে তারা মনে হয় কল্পনাও করতে পারেন না। নকল করাকে কেউ সমর্থন করছে না। কিন্তু এই বয়সটাই ভালোমন্দ না বুঝে পদক্ষেপ নেওয়ার বয়স। সেই বয়সের শিশু-কিশোরের যে কোনো পদক্ষেপকে তাই শিক্ষক ও অভিভাবককে সহমর্মিতার সঙ্গে দেখতে হবে।

‘অরিত্রী আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই’

এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল গণমাধ্যমে বলেছেন, এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি সবসময়েই এক ধরনের আত্মার সংযোগ অনুভব করি। অরিত্রীর মৃত্যুর খবরটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, আহা অভিমানী এই কিশোরীটির সঙ্গে আমি যদি একটিবার কথা বলার সুযোগ পেতাম তাহলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারতাম, পৃথিবীটা অনেক বিশাল, একটা মানুষের জীবন তার থেকেও বিশাল। সবার জীবনেই কখনো না কখনো দুঃখ হতাশা লজ্জা অপমান আসে, সেগুলো দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে এগিয়ে যেতে হয়। কারণ সবকিছুর পর এই জীবনটি অনেক সুন্দর। আমি তাকে কিছু বলতে পারিনি, সারা পৃথিবীর উপর তীব্র একটা অভিমান নিয়ে সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। আমি নিজে তীব্র অপরাধবোধে ভুগছি, মনে হচ্ছে তার মৃত্যুর জন্যে আমিও বুঝি কোনো না কোনোভাবে দায়ী। বড় মানুষদের আমরা শুধু শাসন করতে শিখিয়েছি, ছেলেমেয়েদের ভালোবাসতে শিখাইনি।

জাফর ইকবাল আরো বলেন, কেউ কি জানে না, যদি তাদেরকে গভীর মমতা দিয়ে ভালোবাসা যায়, তাহলে শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষটি যেন মনে কষ্ট না পায় সেজন্য তারা কখনো কোনো অন্যায় করে না? কেউ কি জানে না এই বয়সটি কী অসম্ভব স্পর্শকাতর একটি বয়স? কেউ কি জানে না অপমানের জ্বালা কতো তীব্র? কেউ কি জানে না পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ব্যবহার করেও একটি হারিয়ে যাওয়া প্রাণকে ফিরিয়ে আনা যায় না? অরিত্রী, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই। আমরা তোমাকে এই পৃথিবীতে বাঁচতে দিইনি।

‘শিক্ষা এখন সনদমুখী’

অনেকেই বলছেন, বিশ, ত্রিশ বা পঞ্চাশ বছর আগেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের। শিষ্য যে ভক্তি নিয়ে শিক্ষককে সমীহ করতেন, শিক্ষকরাও সেই মর্যাদাকে ধরে রাখতে নিজেদের সেই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পড়াশোনা করতেন, আদর্শবান হতেন। আধুনিক সময়ে বলা হচ্ছে শিক্ষক হবে বন্ধুর মতো। কিন্তু তারপরেও শিক্ষক সেই সমীহ করবার স্থান কী আগের তুলনায় অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন নি! যদি হারিয়েই থাকেন তার কারণ কি? উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণে এমনটা ঘটছে। শিক্ষা জ্ঞান আহরণের বিষয় আর নেই। শিক্ষা হয়ে গেছে ভালো চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি। আমাদের শিক্ষকরাই স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব শেখাচ্ছেন। বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে বলেই একই শিক্ষকের ক্লাস করে এসে তার কাছেই প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা যখন থেকে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে তখন থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষা এখন সনদমুখী। চাকরি পাওয়া ছাড়া এখন শিক্ষার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। শিক্ষা বাণিজ্য ও সনদমুখী হওয়ায় নামি-দামি স্কুলগুলো ভর্তি-বাণিজ্য শুরু করেছে। আর একইসঙ্গে শুরু হয়েছে কোচিং বাণিজ্য। এতে অভিভাবক আর শিক্ষার্থীরা জিম্মি। কেননা একজন শিক্ষার্থীকে টিসি দিলে সেই সিটে কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে আরেকজনকে ভর্তি করানো যাবে। তিনি বলেন, এ অবস্থা বদলাতে শিক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি বদলাতে হবে। ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষা বদলে সাপ্তাহিকভাবে ক্লাস টেস্টের মতো সৃজনশীল পরীক্ষা নিতে হবে। বছর শেষের পরীক্ষার চাপ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা বদলে দেওয়ায় জাপানে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মাত্রা কমে এসেছে। শ্রীলংকা, মালয়েশিয়াও এখন সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় চলে যাচ্ছে। অরিত্রীর মৃত্যু আমাদের যেন সেই বোধদয় দেয়। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী কখন নকল করে যখন সে পড়াটা বোঝে না। তাহলে সেই বিষয়ের শিক্ষকেরও জবাবদিহিতার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, সামনে নির্বাচনে প্রত্যেক দলের কাছে দাবি জানানো প্রয়োজন। তারা যেন নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং ক্ষমতায় গেলে সেই অঙ্গীকার যেন পূরণ করেন।

‘অরিত্রীর সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো আচরণ করা হয়েছে’

বুঝতে কষ্ট হয় না আমাদের স্কুলগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কটা খুব সহজ নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। এ প্রসঙ্গে মনোবিদ ও সাহিত্যিক মোহিত কামাল বলেন, শিশু না ভেবে অরিত্রীর সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো আচরণ করা হয়েছে। তাকে ও তার পরিবারকে অপমান অপদস্ত করা হয়েছে। আর সেই অপমান সইতে না পেরে অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার পাচ্ছে মিডিয়াতে। শিশুরা অপরাধ করলে তার বিচার করতে হবে কিশোর আইনের স্তরে নেমে। কিশোর মনস্তত্ত্ব বুঝে। শিশুরা ভুল করবে, না বুঝে অপরাধও করে ফেলতে পারে। তবে তাদের যে কোনো অপরাধ বিবেচনা করতে হবে কিশোর আইনের আলোকে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি অরিত্রীর ক্ষেত্রে বিচারটি হয়েছে নির্মম, নিষ্ঠুরভাবে। এডাল্ট আইনকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে শিক্ষকদের বিচারিক হিংস তা। এখানে প্রশ্ন থাকে শিক্ষকরা কি তবে শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্ব না জেনেই শিক্ষক হয়েছেন?