চায়ে চুমুক দিয়ে লায়লা বলল, ‘রিমোট টিপাটিপি করতেছ কেন? এক চ্যানেলে থাকো।’
আমি বললাম, ‘এক চ্যানেলে বসে কি বিজ্ঞাপন দেখব?’
‘তুমি তো কোনো চ্যানেলেই স্থির থাকছ না।’
‘তোমার মতো স্টারপ্লাস ধরে বসে থাকব?’ বলেই আমি জিহ্বায় কামড় দিলাম। সারছে! স্টারপ্লাসের খোঁটা দিলে লায়লার মাথা ঠিক থাকে না। সকালবেলাই ঝামেলা করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। হঠাত্ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
‘আমি স্টারপ্লাস ধরে বসি থাকি! রান্নাবান্না করে কে? খাবার আসে কোত্থেকে! লজ্জা করে না কথা বলতে!’
সমস্যায় বেশিক্ষণ থাকতে হলো না। পাশের বাসার খালাম্মা এসে কলিংবেল চাপলেন। দেখা গেল খালাম্মার সঙ্গে আরো কে যেন একজন মেয়েলোক। লায়লাকে দেখে কে বুঝবে যে এইমাত্র কাশ্মীর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে, দু-চারটা গোলাবারুদ ছুড়ে হাসিমুখে দরজা খুলে দিল!
খালাম্মা বললেন, ‘লায়লা, এই মেয়েটা কাজ খুঁজতেছে। তোমার তো কাজের লোক নাই। রাখবা নাকি?’
লায়লা ইন্টারভিউ শুরু করল, ‘থাকো কোথায়?’
‘এই বাজারের পেছনে।’
‘নাম কী?
‘ময়না।’
‘বাড়ি কোথায়?’
‘ফরিদপুর।’
‘ছেলেপেলে কী?’
‘একটা মেয়ে। বাড়িতে মায়ের কাছে থাকে।’
‘জামাই কী করে?’
‘ঘুইরা ঘুইরা চা বিক্রি করে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাচ্চাটির কী নাম, বয়স কত?’
সঙ্গে সঙ্গে লায়লা আমার দিকে কটমট করে তাকাল। তার চোখ বলছে, তুমি এর মধ্যে নাক গলাচ্ছ কেন? বাচ্চার বয়স কত তা দিয়ে তোমার দরকার কী!
ময়না বলল, ‘তার নাম রিতা। একটা ফটক আছে স্যার।’
আমি বললাম, ‘ছবিটা যত্ন করে রেখো।’
ময়না আগ্রহের সঙ্গে বলল, জি, আচ্ছা।’
পরদিন থেকে মেয়েটি কাজে লেগে গেল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে লায়লা ওর ব্যক্তিগত খবরও নেয়। একদিন শুনলাম লায়লা জিজ্ঞেস করছে, ‘ময়না, তোমার জামাই লোকটা কেমন?’
‘ভালো।’
‘যত্ন নেয়?’
‘জি আফা।’
একদিন লায়লা বলল, ‘জানো, ভালো কিছু খেতে দিলে ও খায় না, সঙ্গে নিয়ে যায়।’
আমি বললাম, ‘ভালো।’
‘মেয়েটা একটু হাবাগোবা ধরনের, বুঝলা।’ লায়লা বলল।
‘কেমন?’
‘মনে হয় একটু বোধ-বুদ্ধি কম।’
‘এই যুগে বোধ-বুদ্ধি কম হওয়াই ভালো।’ আমি বললাম।
বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেল। একদিন মেয়েটি ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল মুখের বাঁ পাশে বেশ খানিকটা ফুলে আছে। ডান হাতের কব্জির কাছে ব্যান্ডেজ। লায়লা বেশ উঁচু গলায় বলল, ‘কী হয়েছে ময়না!’
‘আফা মারছে।’
‘কেন, কী করেছ তুমি?’
‘ট্যাকা চায়।’
লায়লা খানিক চুপ করে থেকে বলল, ‘বেতনের টাকা কী করো?’
ময়না মাথা নিচু করে বলল, ‘তারে দিয়া দেই।’
‘তাহলে আর টাকা তুমি কোত্থেকে দেবে?’
‘আপনি যে টাকা দেন, সেইখান থিকা এক শ টাকা রাখছিলাম রিতার জন্য জামা কিনব।’
লায়লা রাগে ফুসতে থাকল, ‘আমার ধারণা ছিল দরিদ্র মানুষরা অত্যাচারী হয় না। এ তো দেখছি অমানুষ!’
আমি ছোট করে বললাম, ‘অত্যাচারীর কোনো শ্রেণি থাকে না।’
কয়েকদিন পরের কথা। কম্পিউটারে কাজ করছি। লায়লার উচ্চকণ্ঠ শুনলাম, ‘কী ব্যাপার ময়না, কী হয়েছে! এমন দেখাচ্ছে কেন!’
আমি কান সজাগ করলাম। কয়েক হাত দূরে দরজা দিয়ে রান্নাঘরের কাছে দাঁড়ানো ময়নাকে দেখা যাচ্ছে। ময়না বলল, ‘আফা, আজ ছয়দিন ধরে রিতার বাপে বাড়ি আসে না।’
‘কেন, বাড়ি আসে না কেন? বিয়ে-টিয়ে করে বসেনি তো আবার?’
‘শুনছি বিয়া করছে।’
আমার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। আমি সাউন্ড সিস্টেমে গান শুনছিলাম,‘বন্ধুহারা পোড়া দেশে, যায় না বসত করা...যা গো সখী চলে যা মথুরা...’
লায়লা এসে আমার পাশে বসল। দেখলাম ওর চোখ দুটো টলমল করছে।
