এক জন নারী ফুটবল মাঠে রেফারির বাঁশি হাতে দৌঁড়াচ্ছেন। কখনো মেয়েদের খেলায়, কখনো আবার ছেলেদের খেলায়ও। ফুটবল মাঠে তাকে খেলোয়াড়রা কড়া রেফারি হিসেবেই জানেন। কিন্তু এখন বিশ্ব যে তাকে জানবে ফিফার বাংলাদেশের প্রথম নারী রেফারি হিসেবে। বিশ্বের বুকে আবারও আমাদের দেশের পতাকাকে উঁচু করে ধরলেন আমাদের কন্যা জয়া চাকমা। পুরো নাম জয়ামতি চাকমা।
জয়া যে শুধু এক জন রেফারি তা নয়, তিনি একাধারে এক জন খেলোয়াড়, এক জন কোচ, এক জন ভালো মনের মানুষও। কারাতে, অ্যাথলেটিক, ফুটবল, হ্যান্ডবল, ব্যাডমিন্টনসহ সব খেলায়ই পারদর্শী তিনি। জন্ম রাঙ্গামাটি জেলায়, বাবা সঞ্জীবন চাকমা কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কর্মকর্তা ছিলেন। মা মালতি চাকমা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিন বোনের মধ্যে জয়া সবার বড়ো। খেলাধুলা তার রক্তের সঙ্গে, তথা তার পরিবারের সঙ্গে মিশে আছে। তার বাবা এক জন ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন। দুই ফুপু ছিলেন হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। এক বোন কারাতে খেলোয়াড়। তার খেলোয়াড়ি জীবনও অবশ্য কারাতে-অ্যাথলেটিক দিয়েই শুরু। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকতে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রতিযোগিতায় অ্যাথলেটিকে অংশ নেন দৌঁড় প্রতিযোগিতায়। তারপর মা তাকে ভর্তি করিয়ে দেন কারাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শারীরিকভাবে একটু দুর্বল হওয়ায় ব্যায়াম বা শরীরচর্চার প্রতি ঝোঁক ছিল। আর সেই থেকেই খেলায় আসা। ২০০৫ সালে রাঙ্গামাটিতে ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন। সেখান থেকে সুযোগ পেয়ে যান বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে আন্তঃজেলা চ্যাম্পিয়নশিপে। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় তার জেলা রাঙ্গামাটি। সেখান থেকে সুযোগ পান ন্যাশনাল ক্যাম্পে। প্রথমে জুনিয়র দল পরে সিনিয়র দল তথা জাতীয় দলে পৌঁছে যান জয়া চাকমা। খেলেছেন ইন্দো-বাংলা গেমসে। বিজেএমসির হয়েও খেলেছেন তিনি। ২০০৯-১০ সেশনে স্নাতক পর্বে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন জয়া চাকমা। একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন তিনি। স্পোর্টস সায়েন্সে করেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা। বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়া ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি ছিলেন সবার প্রিয় বোন, বন্ধু এবং কাছের মানুষ। নিজের ব্যাচের র্যাগ অনুষ্ঠানে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন র্যাগ রানি। জমকালো অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে দেখিয়ে দেন খেলাধুলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দক্ষতায় আছে তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়েও বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় হ্যান্ডবল দলের অধিনায়কত্বের। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় খেলাধুলায় নিজের ভার্সিটির হয়ে লড়েছেন বিভিন্ন খেলায়।
২০১০ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন থেকে রেফারিং কোর্স করেন। লেভেল ৩, ২, ১ সম্পন্ন করে হয়ে যান ন্যাশনাল রেফারি। ২০১২ বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে শুরু করেন ফুটবল ক্যারিয়ার। ২০১৩ সালে এএফসির অনূর্ধ্ব-১৪ খেলায় রেফারিং করে নাম লেখান বাংলাদেশের প্রথম নারী রেফারি হিসেবে। ২০১৪ ও ২০১৬ সালে একই খেলায় রেফারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৫ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যালে অংশ নেন বিশ্বের ১০০ জন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের এক জন হিসেবে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় এক জন নারী হয়েও রেফারিং করেছেন ছেলেদের খেলায়। পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ, তৃতীয় বিভাগ ফুটবল লিগ ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল খেলায় ছেলেদের রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
রেফারিংয়ের পাশাপাশি তিনি কোচিংয়েও মনোনিবেশ করেছেন। কোচিং কোর্স করে বর্তমানে বিকেএসপিতে কর্মরত আছেন কোচ হিসেবে। তার কোচিংয়ে সুব্রত মুখার্জি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে জয় লাভ করে বিকেএসপি। বর্তমানে তিনি একই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য বিকেএসপির দল নিয়ে রয়েছেন দিল্লিতে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তৃতীয়বারের মতো চেষ্টা করে পাশ করেন ফিটনেস পরীক্ষায়। ফিটনেস পরীক্ষার ফলাফল ফিফার কাছে পাঠানোর পর ফিফার স্বীকৃতি মিললেই হয়ে যাবেন ফিফার রেফারি। তখন ফিফা আয়োজিত কোনো ম্যাচ পরিচালনায় বাধা থাকবে না আর।
বিশ্বকাপ ফুটবলে ম্যাচ পরিচালনা করার স্বপ্ন দেখেন জয়া চাকমা। তার সাফল্যের রহস্য জানতে চাইলে বলেন, পরিশ্রম আর পরিশ্রম সঙ্গে ধৈর্য্য। তিনি ধন্যবাদ জানাতে চান বিকেএসপিকে। বিকেএসপি এখন খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি বিশ্বমানের কোচ ও রেফারি তৈরিতে রাখছে ভূমিকা। বাংলাদেশ নারী ফুটবলের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ দেখতে পান জয়া। তিনি মনে করেন খেলাধুলায় নারীর মধ্যে যে লড়াইয়ের অনুভূতি তৈরি হয়, তা কাজে লাগে ব্যক্তিগত জীবনেও।
