‘আমি আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছি। ভ্রমণ আমাকে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও শৃঙ্খলা শিখিয়েছে। একাকী পথ চলার অভিজ্ঞতার ফলে মোকাবিলা করতে শিখেছি যে কোনো পরিস্থিতিকে।’ কথাগুলো বলছিলেন রাহিবুল হাসান রাকিব। রংপুর কারমাইকেল কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র রাকিব সাইকেলে চেপে দেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ শেষ করেছেন। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট উপজেলার কালিগঞ্জ উপজেলায়। জানা যায়, রাকিবের আগে এইচ আহমেদ আলী, মোহাম্দ শরীফুল ইসলাম, নিয়াজ মোর্শেদ, হাসিবুল ইসলাম বাপ্পি, তাম্মাম বিন খয়ের, এস এম জাহাঙ্গীর আহমেদ, শরিফুল ইসলাম হিরণ, বাহারুল ইসলাম, এ আর বাবুল, নোমান সিদ্দিক, রাকিবুল ইসলাম, মধুমিলন মহন্ত, হাফিজ উদ্দীন রানা, মোহাম্মদ ইউসুফ ৬৪ জেলা সাইকেলে ভ্রমণ করেছেন।
কিভাবে জেলা ভ্রমণের শুরু, জানতে চাইলে রাকিব বলেন, ‘ফেসবুকে বিভিন্ন সাইক্লিস্ট গ্রুপের পোস্ট দেখতাম। আগ্রহ নিয়ে সে সব পড়তাম। একসময় মনে হলো, আমিও দেশের জেলাগুলো ভ্রমণ করে দেখতে পারি।’ এ ভাবনা থেকেই তার আনুষ্ঠানিক জেলা ভ্রমণ শুরু। ২০১৬ সালে শুরু করে ২০১৮ সালে তার ৬৪ জেলা ভ্রমণ শেষ হয়। তবে শুরুতেই তিনি হোঁচট খান। নিজের সাইকেল নেই। সাইকেল কিনে দিতে বলার মতো অবস্থা পরিবারের ছিল না। তাই তিনি ঠিক করলেন, নিজের আয়েই সাইকেল কিনবেন। সে জন্য তাকে পাঁচ মাস একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি করতে হয়। তার প্রথম ভ্রমণ ছিল বরিশালের পাঁচ জেলা। রাকিব জানালেন, বরিশাল সাইকেল ট্রিপ নামে একটি ইভেন্ট খুলেছিল সাইক্লিস্ট নিয়াজ মোরশেদ। এই ট্রিপে তিনি অংশ নেন। তিনি ঘুরে বেড়ান বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা। রাকিবের মতে, এই ট্রিপের পর তার উত্সাহ, মনোবল বৃদ্ধি পায়। ৬৪ জেলা ভ্রমণের ইচ্ছাটা পোক্ত হয়। ভয়-সংকোচ যা ছিল, সব কেটে যায়। ২০১৭ সালে তিনি পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা ভ্রমণ করেন। ডিসেম্বরে পড়াশোনার চাপ থাকে কম। সেজন্য তিনি এই সময়টা ভ্রমণের জন্য বেছে নেন। ভ্রমণের সময় রোড সেফটির বিষয়টি রাকিবকে খুব নাড়া দেয়। এই বিষয়টি নিয়ে তিনি কাজও করেছেন। এ বিষয়ে রাকিব বলছিলেন, ‘আমি দেখেছি সিলেট, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ (আরিচা) মহাসড়কে ড্রাইভাররা কতটা বেপরোয়া বাস-ট্রাক চালায়। ফিটনেসবিহীন গাড়িও চলছে অহরহ। ভ্রমণের সময় ভ্রমণের উপকারিতা, রক্তদানে মানুষের উপকার হয়—এসব বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
ভ্রমণে গেলে বিখ্যাত খাবারের স্বাদ কে না নেয়। রাকিবুলও বিভিন্ন জায়গার বিখ্যাত খাবার চেখে দেখেছেন। তার কাছে ভালো লেগেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালাই রুটি, শিবগঞ্জের আদি চমচম, নাটোরের কাঁচাগল্লা, কুষ্টিয়ার কুলফি মালাই, মেহেরপুরের সাবিত্রী ও রস কদম্ব, রাজবাড়ির ভাদুসাহার মালাইকারি, চাঁদপুরের ওমান মিনিটের আইসক্রিম, ময়মনসিংহের মন্ডা, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী ইত্যাদি। কেবল ঐতিহ্যবাহী খাবারই নয়। তিনি প্রতিটি জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখেছেন। এ বিষয়ে রাকিব বলেন, ‘শুধু খাওয়াই নয়, চেষ্টা করেছি প্রতিটি জেলার বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থান ঘুরে বেড়ানোর। পাহাড়পুর থেকে শুরু করে কুসুম্বা মসজিদ, ছোট সোনা মসজিদ, চামচিকা মসজিদ, পুঠিয়া রাজবাড়ি, উত্তরা গণভবন, মুজিবনগর, ষাটগম্বুজ মসজিদ, উদ্রাকপুর কেল্লা, পানাম নগর, সোনারগাঁও, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি, জাতীয় স্মৃতি সৌধ, জয়নুল আবেদিন পার্ক, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি, শদুপুর জাতীয় উদ্যান, উয়ারী বটেশ্বর, স্বর্ণ মন্দিরসহ বিভিন্ন জায়গা।’
ভ্রমণে থাকা-খাওয়ার বিষয়ে কমবেশি সমস্যা সবারই হয়। তবে রাকিবের সমস্যা হয়নি মোটেও। তিনি বলেন, ‘রাতে হোটেলে থাকিনি। থাকার জন্য সরকারি ডাকবাংলাও বেছে নিতে হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ। মানুষের বাড়িতে থেকেছি, খেয়েছি, তাদের সঙ্গে মিশেছি। তাদের সুখ, দুঃখের কথা শুনেছি। আমার সব কথাও তাদের বলেছি। মানুষের এই সহযোগিতার কথা কখনো ভুলে যাওয়ার মতো বিষয় নয়।’ রাকিব সাইকেলে দেশ ভ্রমণে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের রুট চার্ট এবং গাইড লাইন দিয়ে থাকেন। রাকিব নিজে যে শুধু সাইকেলে ভ্রমণ করেন, তা নয়; তিনি সাইকেলে ভ্রমণে মানুষকে উত্সাহিত করেন। রংপুর সাইক্লিস্ট নামে ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এই গ্রুপের মাধ্যমে সাইক্লিং বিষয়ে মানুষকে উত্সাহ দেন। অবর্ণনীয় নামে সমাজকল্যানমূলক সংগঠনের সভাপতি রাহিবুল হাসান রাকিব। এ সংস্থাটি সুবিধাবঞ্চিত শিশু, শীতার্তদের কল্যাণে কাজ করে থাকে। রাকিব জানালেন, কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ২০০টি পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন তারা। ছেলেদের মতো মেয়েরাও কি সাইকেল ভ্রমণে যেতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাকিব বলেন, ‘যথাযথ নিরাপত্তা থাকলে অবশ্যই তারা সাইকেলে চেপে ভ্রমণে যেতে পারে।’ তিনি জানালেন, এঞ্জেলা চৌধুরী নামে একজন নারী ৬৪ জেলা ঘুরেছেন। দোলা নামে এক মেয়ে তার বরিশাল সফরে সঙ্গী ছিলেন। নিশাত আনজুম, জিনিয়া তাবাসসুম টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সাইকেলে ভ্রমণ করেছেন। রাকিবের স্বপ্ন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু গাড়ি চলাচলযোগ্য রাস্তা লেহ লাদাখ ধরে মাউনটেন পাস খারদুংলা পাস অতিক্রম করার। এজন্য তিনি সহূদয়বান কোনো এক স্পন্সরের প্রত্যাশায় আছেন।
