মহাত্মা গান্ধী তিন বত্সর দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটাইয়া ভারতে আসিলেন স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া ফিরিবেন। তিনি আসিয়া দেখিলেন, বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) প্লেগ রোগ দেখা দিয়াছে। তিনি বুঝিলেন, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করিতে না পারিলে এই রোগ রাজকোটেও শীঘ্রই ছড়াইয়া পড়িবে। তিনি রাজকোটের প্রতিটি বাড়ির দরজায় উপস্থিত হইতে থাকিলেন এবং বাড়ির শৌচাগার, ঘর ও আশপাশের এলাকা পরিচ্ছন্ন করিতে মানুষকে বাধ্য করিতে থাকিলেন। তিনি কলকাতা কংগ্রেসে যোগ দিতে আসিয়া কংগ্রেসের ক্যাম্প অপরিচ্ছন্ন দেখিয়া অন্যান্য নেতার কাছে জানিতে চাহিলেন। তাহারা উত্তরে জানাইয়াছিলেন, উহা পচ্ছিন্নতাকর্মীর দায়িত্ব, আমাদের নহে। গান্ধী সঙ্গে সঙ্গে একটি ঝাঁটা আনাইয়া নিজেই পরিষ্কার করিতে শুরু করিলেন। তিনি একটি পরিচ্ছন্ন ভারতের স্বপ্ন দেখিতেন। পরিচ্ছন্নতা মহাত্মার কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ আমার নিকট স্বাধীনতার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ।’ ৭০ বত্সর পার হইয়া গিয়াছে ভারত স্বাধীন হইয়াছে। কিন্তু গান্ধীর পরিচ্ছন্ন ভারত পাওয়া যায় নাই। বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছেন। তিনি গান্ধীর পরিচ্ছন্নতার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, ১ হাজার গান্ধী, ১ লাখ মোদি আসিলেও ভারত পরিচ্ছন্ন হইবে না, যদি ১২৫ কোটি ভারতীয় একসঙ্গে সচেতন না হয়।
এই চিন্তা এবং উক্তি আমাদের জন্য আজ বড়োই প্রাসঙ্গিক। সহযোগী একটি দৈনিক বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভে ২০১৮’ জরিপের উল্লেখ করিয়া বলিয়াছে, স্বাস্থ্যবিধির অপরিহার্য একটি অনুষঙ্গ হইল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবণযাপন। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনাচরণে ইহার অভাব রহিয়াছে। আমরা আমাদের চারিপাশে লক্ষ করিয়া অনুভব করিতে পারি যে জরিপটি মোটেই অতিরঞ্জন নহে। ধর্মীয় দিকনির্দেশনায় বলা আছে, পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। স্কুলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হইতে আমরা শিখিয়া আসিতেছি ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। কিন্তু কোনো উপদেশই যেন কাজে লাগিতেছে না। দেশের মানুষের আর্থিক সংগতি বাড়িয়াছে, বহু মানুষ বিদেশ গমন করিতেছেন এবং ফিরিয়া আসিতেছেন। শিক্ষার হারও আমাদের অনেক বৃদ্ধি পাইয়াছে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে আমরা তিমিরেই রহিয়াছি।
এই অবস্থা হইতে উন্নতি করিতে হইলে শুধু সরকারের দিকে চাহিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। পরিচ্ছন্নতা নিরেট প্রচলিত শিক্ষার মধ্য দিয়াও আসে না। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। এইজন্য প্রয়োজন সত্যিকার শিক্ষা, পারিবারিক একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্ন সমাজ-সংস্কৃতি। গোটা উপমহাদেশেই এই সমস্যা তীব্র। মানুষ যতদিন স্বাস্থ্যসচেতন না হইবে, পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনকে গুরুত্ব না দিবে, ততদিন মাথা কুটিলেও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হইবে না। এই জন্য সকলকে সচেতন করিয়া তুলিতে হইবে। তবে ইহাও ঠিক যে, রাজনীতিবিদরাই এই সচেতনতার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড়ো ভূমিকা রাখিতে পারেন। তাহাদেরকেই সর্বাগ্রে আগাইয়া আসিতে হইবে।
