আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য একটি শোকাবহ মাস। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ মাসে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। শোক ও বেদনাহত এই মাসে জাতির পিতা এবং তার পরিবারের শহিদ সদস্যদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এবং আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
এ মাসের ২৮ আগস্ট দিনটি আমার পরিবারের জন্য একটি শোকাবহ দিন। ২০১২ সালের এ দিনে আমার পিতা ডা. আখলাকুল হোসেন আহমেদ হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আমি আজকের এ দিনে আমার মরহুম পিতার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০-এর সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ ২২ আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আমার পিতাকে মনোনয়ন প্রদান করেন এবং জনগণের ভোটে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিজয়ের প্রাক্কালে ১৯৭১-এর ১১ ডিসেম্বর তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেষখলা ক্যাম্প ইনচার্জ এবং Civil Administration Council of Bhali Area of Mymensingh N. E. Zone No- II-এর চেয়ারম্যান থাকাকালীন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ইছাক মিয়াকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যা ৪৭ বছর পর আমার হস্তগত হয়। গত বছর (২০১৮ সালে) ময়মনসিংহস্থ মোহনগঞ্জ উপজেলা সমিতির ছেলেমেয়েদের এক পিকনিকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইছাক মিয়ার ভাতিজা জনাব কাঞ্চন এই চিঠিটি আমার হাতে হস্তান্তর করেন। আমার পিতার এরকম একটি চিঠি পেয়ে আমি এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি যে, চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।
আমার আব্বা ডাক্তার আখলাকুল হোসাইন আহমেদ চিঠি লিখতে ভালোবাসতেন। আব্বা সাধারণত প্রেসক্রিপশন প্যাডেই চিঠি লিখতেন। আব্বাকে দেখেছি, এক টানে দ্রুতই লিখে ফেলতে পারতেন।
ভারতের মহেষখলা, মহাদের, রংড়া, তুড়া এই অঞ্চলগুলোতে একজন আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে, ডাক্তার হিসেবে তিনি কাজ করছিলেন। তিনি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চিঠিতে তিনি হয়তো দায়িত্ব ও পরিস্থিতিকেই লিখেছিলেন। ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে বার্তা পাঠিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ ও ট্রেনিংয়ে পাঠানোর জন্যও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লিখেছেন। এই চিঠিগুলোই হতে পারত সময় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত দলিল। আব্বার সেই হূদয়-নিংড়ানো দায়িত্বপূর্ণ লেখাগুলো যদি আমরা খুঁজে পেতাম!
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাসা লুট হয়। বাসার একটা অংশ পুড়িয়েও দেওয়া হয়। হারিয়ে যায় অনেক দুর্লভ জিনিস। জিনিস লুট হলে জিনিস কেনা যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সেই চিঠিগুলো কোথায় পাবো! এই চিঠিগুলো আমার আব্বার স্মৃতি ছিল। লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস ছিল। আসলে, এই চিঠিগুলোই আমাদের সময় ও জীবনের প্রাণের দলিল। এর চেয়ে তাজা ইতিহাস আর কী হতে পারে!
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে মহেষখলা থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইছাক মিয়াকে লেখা চিঠিটির কিছু অংশ তুলে ধরছি:
চিঠির একটি জায়গায় তিনি সম্মুখ সারির কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘মোহনগঞ্জ আসার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। তুমি হয়ত জান আমাদের একটা Bindings আছে; এভাবে চলে আসতে পারি না। সরকারের একটা নির্দেশের দরকার। জনগণ নিশ্চয়ই তোমাদেরকে ঘিরে আছে। আমার তরফ থেকে তাদের সংগ্রামী সালাম জানাইয়া আমার না আসার কারণ জানাইয়া দিও।’ একদিকে অস্থায়ী সরকারের প্রতি আনুগত্য অপরদিকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দেশে আসার ব্যাকুলতা।
অন্য একটি অংশে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বোধন করে লিখেছেন, ‘তুমি থানায় আছো; হীরা বাজারে ও মহব্বত আলী স্টেশনের দিকে আছে। Distributionটা ভালই হয়েছে। নানা লোকে নানা ভাবে তোমাদেরকে নানা চাতুরী কথা বলবে। খুব চিন্তা করে; তার সম্মন্ধে ভাল-ভাবে অবহিত হয়ে কাজ করিও।’
যতটুকু আমার ধারণা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন দেশ বিজয়ের পথে। বঙ্গবন্ধু তখনো দেশে ফিরেননি। স্থানীয় প্রশাসন কাঠামো তৈরিতে কিছুটা সময় নেবে। এই অন্তবর্তীকালীন সময়টুকু খুব সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে, যাতে সুযোগসন্ধানীরা কোনো অপকর্মে জড়িয়ে না পড়ে।
চিঠির অন্য একটি অংশে তিনি লিখেছেন, অতিশীঘ্রই আমরা Civil Administration চালু করার ইচ্ছা রাখি। অতি তাত্পর্যপূর্ণ একটি বাক্য। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৯ মাসের যুদ্ধের পর দেশ নিশ্চিত বিজয়ের পথে। আবার দেশ পুনর্গঠনে নামতে হবে। থেমে গেলে চলবে না। এত কষ্ট করে দিনাতিপাত করছেন, এরপর দেশ কী করে ভালোভাবে চলবে তাও চিন্তা করছেন। দেশপ্রেম না থাকলে এ ধরনের কমিটমেন্ট থাকে না।
১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ লেখা এই চিঠিতে উঠে এসেছে মোহনগঞ্জ বিজয়ের স্পষ্ট আনন্দ। চিঠিতে মোহনগঞ্জের কথা বলা আছে। পাঞ্জাবিরা, দালালরা থানা ছেড়ে পালিয়েছে। মোহনগঞ্জের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। স্থানীয় জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্বে থাকায় এই আনন্দ মিছিলে যোগ দিতে পারছেন না। কিন্তু চিঠি পড়ে বোঝা যায়, ওনার মনটা এই আনন্দ মিছিলে মিশে গেছে।
চিঠিতে উঠে এসেছে আমাদের বাড়ি লুটের আশ্চর্য কাহিনি। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন—লোকমুখে শুনেছেন কারা আমাদের বাড়ি লুট করেছে, কার বাড়িতে কোন জিনিসটি আছে, কারা কারা আমাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে—আব্বা সবই জানতেন। আসলে, মুক্তিযুদ্ধসংগঠকের দায়িত্ব নিয়ে চলে যাওয়ার পর আব্বা আমাদের পরিবারটি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি জানতেন, পরিবারের ওপর হামলা হতে পারে। তাই আম্মাকে আমাদের মোহনগঞ্জের বাসা থেকে চলে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। অবশ্য পরবর্তী সময়ে আমরাও মা, ভাইবোনসহ ভারতে মেঘালয়ের মহেষখলায় আব্বার ওখানে চলে যাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাড়ির জিনিসপত্র লুট হয়েছিল। বাড়ির একটা অংশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিনা ফিতে যাদের নিত্য চিকিত্সাসেবা দিতেন, এমন মানুষও ফার্মিসির সব ওষুধ লুট করে নিয়েছিল।
এই চিঠিতে একাত্তরে বাংলাদেশ কেমন ছিল, মুক্তিযোদ্ধার বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনবাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করার যে ব্রত নিয়ে কাজ করেছিল, তা দৃশ্যমান হয়। একইসঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের আনন্দ-উত্কণ্ঠার প্রামাণ্য দলিল এই চিঠি। যা বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা অনুভব করতে সাহায্য করবে।
স্নেহের ইছাক মিঞা ;-
তোমার চিঠি পেয়ে বিস্তারীত অবগত হয়ে আনন্দে উল্লসিত হয়ে পরেছি। বাংলার সারে সাত কোটি নিপীড়িত মানুষের দিকে চেয়ে; বাংলার মা বোনের ইজ্জতের দিকে চেয়ে তোমরা তোমাদের মা বাবা ভাই-বোন, বন্ধু আত্মীয় স্বজনের মায়া মমতা ত্যাগ করে যুদ্ধে নেমেছ বাংলা মাকে বাঁচাতে হবে, তাকে-পাঞ্জাবি জানোয়ারদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। আজ থানার পাঞ্জাবি ও স্থানীয় দালালদেরকে বিতাড়িত করে আসন গেড়ে বসেছ শুনে কতটুকু যে খুশী হয়েছি তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তাই তোমাদের কে জানাই আন্তরীক মোবারকবাদ ও সংগ্রামী অভিনন্দন। ইলিয়াস মিঞা আটপাড়া চলে গেছে তাকে আলাদা কোন চিঠি দেই নাই। তোমাদের যারা এখানে আছে তাদের প্রত্যেককে আমার প্রাণঢালা ভালবাসা ও দোয়া জানাইও। মোহনগঞ্জ আসার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। তুম হয়ত জান আমাদের একটা Bindings আছে; এভাবে চলে আসতে পারিনা। সরকারের একটা নির্দেশের দরকার। জনসাধারণ নিশ্চয়ই তোমাদেরকে ঘিড়ে আছে। আমার তরফ থেকে তাদেরকে আমার সংগ্রামী সালাম জানাইয়া আমার না থাকার কারণ জানাইয়া দিও।
তুমি থানায় আছো; হীরা বাজারে ও মহব্বত আলী স্টেশনের দিকে আছে। Distributionটা ভালই হয়েছে। নানা লোকে নানা ভাবে তোমাদেরকে নানা চাতুরী কথা বলবে। খুব চিন্তা করে; তার সমন্ধে ভাল-ভাবে অবহিত হয়ে কাজ করিও।
আমার বাসার অবস্থা কি? পূর্ব দিকে আগুন দিয়েছিল। সমস্ত জিনিষ-পত্র লুট করে নিয়া গিয়েছিল। একটু খেয়াল করলে কোন জিনিষ কোন দিকে নিয়েছে তা বোধ হয় জানতে পারবে। যদি পার একবার বাসার ভিতরে গিয়ে দেখিও। শেখের বাড়ীর কাসেমের বাড়ীতে কিছু জিনিষ পত্র আছে বলে জানতে পারলাম। বর কাশিয়ার সুরুজ মিঞার বাড়ীতে আমার একটা বড় সতরঞ্জি ও ১টা বড় তামার ডেগ আছে বলে জানতে পারলাম। কতটুকুন সত্য জানি না। লোকমুখে শুনলাম। ঔষুধ যা দোকানে ছিল তা আলোকদিয়ার দুধু নিয়াছে বলে শুনেছি। অন্যান্য বহু আসবাবপত্র ছিল তা কোথায় নিয়েছে কোন হদিস পাই নাই। যা হোক, মোহনগঞ্জ প্রত্যেকটা অফিসে কি আছে তা দেখা দরকার ও গার্ড রাখা প্রয়োজন। অতি শীঘ্রই Civil Administration চালু করার ইচ্ছা রাখি। আজ আর নয় আমরা সবাই খোদার রহমতে ভালই আছি। আগামীতে তোমাদের সুফল কামনা করি। আমাদের থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছদ্দু মিঞা সাহেবের বাসার দিকেও একটু লক্ষ্য রাখিও।
ইতি
তোমার মামা
ডা. এ. হোসাইন
১১/১২/১৯৭১ ইং
পূনঃ ইলিয়াস গরম কাপড়ের কথা লিখেছিল। আমাদের এখানে কিছুদিন পূর্বে কিছু কম্বল আসছিল তার মধ্যে Captain Hamid ৯৪টা নিয়া যাওয়ায় Youth দেরকে সব দিতে পারি নাই। বর্তমানে কিছুই নাই—তাই দিতে পারলাম না।
ইতি
আখলাক
[চিঠির লেখক : আখলাকুল হোসেইন আহমেদ। ১৯৭০ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রথমে মহেষখলার ক্যাম্প ইনচার্জ ছিলেন। পরে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।
চিঠি প্রাপক : বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব ইছাক মিয়া। চিঠির সংগ্রাহক : মো. কামরুজ্জামান, করাচাপুর, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।]
n লেখক : সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
