মস্তিষ্কে সমস্যা ও অমনোযোগীদের পাশে শিশু বিকাশ কেন্দ্র

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০১৯, ২১:৪৩

 ‘১৯ মাস বয়সি ফুটফুটে শিশু ‘সাইফা’। শিশুটি কথা বলতে পারে না, মুখ দিয়ে অনবরত লালা ঝরছে। হাত-পা শক্ত। শিশুর মা তন্বী জানান, বাচ্চা প্রসব হতে বিলম্ব হয়েছিল। জন্মের সময় বাচ্চা কাঁদে নাই, বাচ্চার খিঁচুনি হয়েছিল। সাত বছর বয়সি ‘ইকরা’, কথা বলতে পারে না, কানেও শোনে না। তার অস্থিরতা আছে বলে জানান বাবা মাহমুদুল হাসান খান। কুমিল্লা থেকে এসেছে ছয় বছর বয়সি ‘হাবীবা’। এই শিশুটিও অস্বাভাবিক। দিনে-রাতে তার ঘাড়ে ও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা হয়’—এমন অসংখ্য শিশু বিভিন্ন সমস্যা ও জটিলতা নিয়ে এসেছে ঢাকা শিশু হাসপাতালের ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্রে’।

স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন শিশুদের সেবা দিচ্ছে শিশু বিকাশ কেন্দ্র। ঢাকা শিশু হাসপাতালে এই শিশু বিকাশ কেন্দ্রে উপযুক্ত চিকিত্সাব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও দেশের অধিকাংশ শিশু এ চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত। আবার সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য এ চিকিত্সা ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকেই এ সেবা থেকে বঞ্চিত।

পেড্রিয়েটিক নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শায়লা ইমাম কান্তা বলেন, শিশু বিকাশ কেন্দ্রে শিশুর বিকাশগত সমস্যা, পক্ষাঘাত, মৃগী রোগ ও অন্যান্য খিঁচুনি রোগ, অটিজম, আচরণগত সমস্যা বাকশক্তি সমস্যা, চোখে না দেখা, কানে না শোনা এবং লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি রোগের চিকিত্সা করিয়ে থাকি আমরা।  তিনি বলেন, আমরা নিউরোলজিক্যাল সব বিষয় এখানে দেখে থাকি। যেসব শিশু জন্মের পর কাঁদে না, হাঁটতে পারে না, বসতে পারে না, মাথা ছোটো, হাত-পা ছোটো, খিঁচুনি হচ্ছে—এসব সমস্যাকে সেরিব্রাল পলসি (পক্ষাঘাত) বলে থাকি। আমরা এখানে দুটি আউট ডোরে রোগী দেখি। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া অন্যদিনগুলো খোলা থাকে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয়। ১০৭/১০৮ এই দুটি কক্ষে বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয়। সেখানে আমরা এক জন শিশুকে দেখি, তারপর যার যা প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী তাকে সেই বিষয়ের বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়। কারো চোখে সমস্যা, কেউ কথা বলতে পারছে না, কেউ হাঁটতে পারছে না, কারো খিঁচুনি আছে। এছাড়া যাদের বহির্বিভাগে চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব সেসব শিশুকে সেখানেই চিকিত্সা দেওয়া হয়। আর যেসব শিশুর জন্য বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন সেসব শিশুকে চতুর্থতলায় পাঠানো হয়। শিশু বিকাশ কেন্দ্র একটা ক্লিনিক। এখানে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আমরা একেক দিন একেক ধরনের রোগীকে দেখে থাকি।

তিনি জানান, কিছু বাচ্চাকে মনো-বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করিয়ে যাদের যে সেবা দরকার তা আমরা দিয়ে থাকি। যাদের খিঁচুনি আছে তাদের তাত্ক্ষণিক দেখা হয়। এরপর হয়তো একমাস পর পরবর্তী তারিখ দেওয়া হয়। শনিবার আমরা সারা দিন অটিজমের রোগী দেখি, রবি-সোমবার আমরা নতুন রোগী দেখি। মঙ্গলবার খিঁচুনি, মৃগী রোগীদের দেখি। মঙ্গল-বুধ-বৃহস্পতিবার ফলোআপ করি। এছাড়া শিশুর ব্রেনের ফাংসনাল অ্যাক্টিভিটিস—ইইজি পরীক্ষা করা হয়। আমাদের এই বিভাগে আটটা বেড আছে, যাদের অবস্থা বেশি খারাপ তাদের আমরা সেখানে ভর্তি করিয়ে নেই। তবে এই বেড সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে জানান ডা. শায়লা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদম নবজাতক থেকে শুরু করে ১৮ বছর পর্যন্ত এখানে চিকিত্সা দিয়ে থাকি। আমাদের বহির্বিভাগে ৭০ থেকে ১০০ রোগী প্রতিদিন দেখা হয়। আর চতুর্থ তলায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ জন রোগী দেখা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে প্রথম ঢাকা শিশু হাসপাতালে বেসরকারিভাবে শিশু বিকাশ কেন্দ্র চালু হয়। পরে ২০০৮ সালে সরকারিভাবে দেশের ১৪টি হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র নামের প্রকল্প শুরু হয়। ২০১১ সালে পাঁচ বছরের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তীকালে এ বছরে এক বছরের জন্য আগামী জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। এটি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত (এইচএনপিএসপি) কর্মসূচির বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্প; যা হাসপাতালগুলোর শিশু বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।