বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম সাংকেতিক নাটক বলা হয় ‘রক্তকরবী’কে। নাটকটি পাঠ্য হিসেবে অসাধারণ, শ্রুতিমধুর ও কাব্যময়। পাঠকের সঙ্গে চরিত্র ও সংলাপের প্রেম আর ভালোবাসা গড়ে উঠতে মুহূর্তকাল লাগে না। তবে দর্শকের সঙ্গে ‘রক্তকরবী’র সার্থকভাবে সেই প্রেম, ভাব, ভালোবাসা প্রথম গড়ে উঠেছিল শম্ভু মিত্রের হাত ধরে। আর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এই নাটকের প্রতি প্রেম জন্মেছে অনেক দলেরই। বাংলাদেশের অনেক দলই ‘রক্তকরবী’ নাটকটি করেছেন। আমার জানা মতে, সর্বশেষ এই নাটকটি মঞ্চে আনে প্রাঙ্গণেমোর। নাটকটি নির্দেশনা দেন দলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি নূনা আফরোজ। ‘রক্তকরবী’ নাটকের প্রধানতম আকর্ষণ হলো সংলাপ। সংলাপগুলো এতই শ্রুতিমধুর ও কাব্যময় যে, পুরো নাটকটিকে একটি কবিতা বললেও ভুল মনে হবে না। আর সেই সঙ্গে আছে নাটকের চরিত্র :নন্দিনী, রাজা, অধ্যাপক, বিশু পাগল, ফাগুলাল, সর্দার, গোসাই— সবগুলো চরিত্র এমন ভাবে এঁকেছেন যেন কোনোটিই কারো থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর তাদের একেকজনের পরিণতি বা যক্ষপুরীতে আসার বা নিয়ে আসার কাহিনিও আলাদা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনা বা কল্পনার একটি জগত্ হলো যক্ষপুরী। যক্ষপুরী থেকে তাল তাল সোনা তোলা হয় কিন্তু যে শ্রমিকেরা মাটির নিচ থেকে সোনা তুলে আনে তাদের ভাগ্যে জোটে নির্মম অত্যাচার আর দুঃখ-দুর্দশা। কখনো মনে হয় ১৭২০ সাল থেকে শুরু ১৮৫০ সালের দিকে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের সময় শ্রমিকদের দিয়ে যেভাবে কাজ করানো হতো, এটি বোধহয় তারই রূপক। আবার একটু ভাবলেই পরিষ্কার হয়, এ তো আমাদের দেশের অথবা পৃথিবীর অনেক দেশের আজকের শ্রমিকদের অবস্থা। যাহোক, সর্দারের লাঠিকে ভয় পায় না এমন লোক যক্ষপুরীতে খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল, তবে দু-একজন যে একেবারেই নেই, তা নয়। সেই দু-একজনের মধ্যে বিশু পাগল, নন্দিনী ও রঞ্জন অন্যতম। বিশু পাগলকে অনেক আগেই নিয়ে আসা হয়েছে যক্ষপুরীতে। সে শিক্ষিত ও গানপাগল লোক। ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে শোনানো তার নেশা। গুপ্তচরবৃত্তি ঠিকঠাক করতে না পারায় তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে খোদাইকরের দলে। আরেকজন নন্দিনী। সারাদিন সেজেগুজে থাকা ছাড়া বোধহয় আর কোনো কাজই নেই। আসলে যক্ষপুরীতে যত ঝামেলা বাঁধে বা তালগোল পাকে, তা একমাত্র এই নন্দিনীর জন্য। সকলেই প্রেমে পড়ে নন্দিনীর। সেই ছোট্ট কিশোর, অধ্যাপক, বিশু পাগল, ফাগুলাল, সর্দার, গোসাই এমনকি রাজা পর্যন্ত। নন্দিনীর রূপে পাগল হয় সকলেই। কিন্তু নন্দিনীর অপেক্ষা শুধু রঞ্জনের জন্য। আজ রঞ্জন আসবে, সে খবর নন্দিনী পেয়েছে নীলকণ্ঠী পাখির পালক তার ঘরের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখে। রঞ্জন অবশ্য আসে, কিন্তু সেই রঞ্জন জীবিত নয়, মৃত। ‘রক্তকরবী’ নাটকে রঞ্জন এক বিপ্লবের নাম। রঞ্জন বিপ্লব বয়ে নিয়ে আসে। যক্ষপুরীর খোদাইকরেরা ভেঙে ফেলে কারাগারের দেয়াল আর রাজা ভেঙে ফেলে তার ধ্বজা। রাজা এসে এক কাতারে মিশে যায় খোদাইকরের দলে। চলে যায় বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে ফেলার জন্য। সকলকে শেখায় শ্রেণি ও বৈষম্যের দেয়াল ভাঙার মন্ত্র। আর সেখানে সবার আগে থাকে নন্দিনী। ধানী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটি। সকল চরিত্রের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন যেন প্রতিনিয়ত মিশে থাকে নন্দিনী পরনের শাড়ির এই ধানী রঙের মতোই।
চরিত্র নির্মাণ ও নির্দেশনায় নূনা আফরোজ অনেক নিখুঁত শিল্পীর মতো এঁকেছেন ‘রক্তকরবী’র পট। সেই পটে বিশু পাগল চরিত্রে রামিজ রাজু অসাধারণ গায়ক-অভিনেতা; রাজা চরিত্রে অনন্ত হিরা সত্যিকার অর্থেই অনেক ক্লান্ত-শ্রান্ত আর নন্দিনী হিসেবে চমত্কার এক অভিনয়শিল্পী নূনা আফরোজ। পাশাপাশি, ফাগুলাল ও চন্দ্রা চরিত্রে রিগ্যান ও শুভেচ্ছা রহমান দারুণ মানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। সর্দার আর গোসাই চরিত্রে আউয়াল রেজা এবং শিশির রহমান—প্রত্যেকের অসাধারণ অভিনয় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে দর্শকদের। সকলের সমন্বিত অভিনয় ও নির্দেশকের স্বাতন্ত্র শিল্প ভাবনায় চোখ জুড়ানো এক নাট্য প্রদর্শনী উপভোগ করে থাকেন দর্শকবৃন্দ। তবে এই নাটকে বিশেষভাবে ভালোলাগার হয়ে থাকবে রাজার উপস্থাপন। সব মিলিয়ে মঞ্চের সামনের ও নেপথ্যে সকলের সম্মিলিত সফল উপস্থাপন প্রাঙ্গণেমোরের ‘রক্তকরবী’।
ছবি রুহুল আমিন রাজা
