সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পর ইউরোপ সফররত তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের প্রত্যাশিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতায় প্রসঙ্গক্রমে স্মৃতিচারণায় বলেছেন, ড. কামাল এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্সে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হত্যাকাণ্ডের কোনো রকম প্রতিবাদ ও বিশ্ববাসীকে অবহিত করার মাধ্যমে জনমত গঠনের যথাযথ দায়িত্ব সেদিন পালন করেননি। অন্যদিকে ড. কামাল ও তার সুহূদরা বিষয়টি নাকচ করে আসছেন। তবে ১৬ ও ১৭ আগস্ট ১৯৭৫-এর জার্মান সংবাদপত্র দি ফ্রাংকফোর্টার আলগেমাইন-এর বিবরণী আমাদের বুঝতে সহায়তা করে যে, শেখ হাসিনার বক্তব্যই সর্বাংশে সঠিক। এ নিয়ে তত্কালীন জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র নোমান রশীদ চৌধুরীর (একটি সংবাদপত্রে ২২.০৬.২০১৪-এ প্রেরিত কিন্তু অদ্যাবধি অপ্রকাশিত) প্রতিবাদলিপি এবং একই সময়ে আমাকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে জানতে পারি : ‘বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, শুক্রবার, ঢাকা সময় ভোর ৪.৪৫ মিনিটে (জার্মান ও ইউগোস্লাভ সময় রাত ১২.৪৫ মিনিটে) হত্যা করা হয়। এই খবরটি বেশ কিছু সময় বিক্ষিপ্ত ছিল। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী অভ্যুত্থানের খবর প্রথম পান জার্মান সময় রাত ৩.৩০ মিনিটে গিজেলা বন নামের ৬৫ বছর বয়সি একজন জার্মান সাংবাদিকের কাছ থেকে। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আসা টেলিফোন কল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। শেষ কলটি আসে ভোর ৬টায় বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মরহুম সানাউল হকের কাছ থেকে। যার বাসায় তখন শেখ হাসিনা, তার পরিবার ও শেখ রেহানা অতিথি হিসেবে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর শোনামাত্র তিনি তার অতিথিদেরকে চলে যেতে বলেন এবং তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে ফোনে অনুরোধ করেন। ক্ষণিক বিবেচনার পর হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সম্মত হন এবং ব্রাসেলস থেকে তাদের আনার জন্য পরিবহন প্রদান করতে সানাউল হককে অনুরোধ করেন। বন দূতাবাসের পরিবহন পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না, কারণ হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বেলগ্রেড থেকে তুরস্ক যাওয়ার পথে ট্রানজিটে ফ্রাংকফুর্ট পৌঁছালে সেখান থেকে তাকে আনতে যান। কিন্তু সানাউল হক পরিবহন প্রদানেও অসম্মতি প্রকাশ করেন। অবশেষে ঠিক করা হয় যে, শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ব্রাসেলস থেকে জার্মানি—বেলজিয়াম বর্ডারের আচেন শহরে আসবেন এবং হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারকে কোয়েনিগসভিন্টারে (বনের খুব কাছে একটি গ্রাম) তার নিজের বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য আচেনে দুটি গাড়ি পাঠাবেন।
শেখ হাসিনা ও তার পরিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০.৩০ মিনিটে ব্রাসেলস ত্যাগ করে আচেনের পথে রওনা হন। তাদেরকে বেলা ১টার দিকে আচেন থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং তারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিকেল ৪.৩০ মিনিটে কোয়েনিগসভিন্টারে পৌঁছান। কাকতালীয়ভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বেলা ১২টার দিকে ড. কামাল হোসেন ও রাষ্ট্রদূত মরহুম রেজাউল করিম বন শহরে যান। ঢাকা ফিরে যাওয়ার আগে শিডিউল মোতাবেক বেলগ্রেড থেকে তুরস্কে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য যাওয়ার পথে ট্রানজিটে বন আসেন। ড. কামাল বেলগ্রেড ত্যাগ করার আগেই অভ্যুত্থানের কথা শুনেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে ড. কামাল এবং শেখ হাসিনা ও তার পরিবার উভয়েই আধাঘণ্টার ব্যবধানে কোয়েনিগসভিন্টার পৌঁছান। দুই কন্যাই তখন হতবিহ্বল ছিলেন এবং তাদেরকে সান্ত্বনা দিতে হয়। গভীর শোকাচ্ছন্নতার মধ্যেও বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সোচ্চার করতে সংবাদ সম্মেলনের কথাটি ওঠে। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী গিজেলা বনকে যোগাযোগ করেন। গিজেলা বলেন যে তিনি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবেন। ১৫ আগস্টের সন্ধ্যায় ডয়েচে ভেলে, জার্মান ব্রডকাস্টিং অথরিটি এবং ফ্রাংকফোর্টার আরগেমাইন-এর রিপোর্টার কোয়েনিগসভিন্টারের বাড়িতে আসেন, কিন্তু হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ছাড়া কারো মন্তব্যই তারা নিতে পারেননি। প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা অত্যন্ত শোকাভিভূত ছিলেন। পরিশেষে শেখ রেহানাকে নিচতলায় নেমে আসতে রাজি করানো হয় এবং তিনি গণমাধ্যমে যিকঞ্চিত কথা বলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বক্তব্য পশ্চিম জার্মান রেডিওতে প্রচারিত হয় এবং পরদিন ১৬ আগস্ট শনিবার এবং ১৮ আগস্ট, সোমবার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, ১৬ আগস্ট শনিবার ও ১৭ আগস্ট রবিবার পশ্চিম জার্মানিতে সপ্তাহান্তে ছুটির দিন ছিল। নিশ্চিত করবার জন্য দি ফ্রাংকফোর্টার বা ডয়েচে ভেলের ১৬ ও ১৮ আগস্ট তারিখের প্রকাশনা আর্কাইভে খুঁজে দেখা যেতে পারে।
ড. কামাল ও রাষ্ট্রদূত রেজাউল করিম পরের দিন সকালে (১৬ আগস্ট) লন্ডন চলে যান। অন্যদিকে জার্মানিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি ওঠে। স্পষ্টত তারা বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারবেন না। অতএব কোথাও আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) জরুরি প্রয়োজন ছিল। স্বাভাবিকভাবে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী পশ্চিম জার্মানি ও আস্ট্রিয়ার অ্যাসাইলামের জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু বেশিরভাগ দেশেই অ্যাসাইলাম প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
বিকল্প চিন্তা হিসেবে ভারতে আশ্রয়ের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। বনের একটি কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর প্রস্তাবে পশ্চিম জার্মানির ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বর্ষীয়ান মি. পুরি বলেন যে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
পরের দিন তিনি হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে তার অফিসে সাক্ষাত্ করেন। মি. পুরি বলেন তাকে তার নয়াদিল্লির বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেতে হবে এবং অ্যাসাইলাম প্রক্রিয়া দীর্ঘ হবে। এ অবস্থায় মি. চৌধুরী একটি উপায় বের করেন। স্বাধীনতার পূর্বে ও পরেও কয়েক মাস নয়াদিল্লির বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী নয়া দিল্লিতে অনেক সুনাম অর্জন করেন। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালে এবং ১৯৭২-এর প্রথম দিকে তিনি মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বহুবার সাক্ষাত্ করেছেন, কিন্তু এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। ১৮ আগস্ট তিনি কোয়েনিগসভিন্টারের বাড়ি থেকে নয়াদিল্লিতে মিসেস গান্ধীর অফিসে ফোন করেন। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হন, যখন মিসেস গান্ধী স্বয়ং টেলিফোন কলটি গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের দুর্ভাগ্যপূর্ণ অবস্থার কথা তিনি তাকে জানান এবং তাত্ক্ষণিকভাবে মিসেস গান্ধী ভারতে তাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সম্মত হন এবং যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
ফরাসি বর্ডারের অদূরে, জার্মানির দক্ষিণে ছবির মতো সুন্দর শহর কার্লসরুয়ের একটি অভিজাত গবেষণা ফ্যাকাল্টিতে তখন ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ফেলোশিপ করছিলেন। অতঃপর তাকে তার সব কাজ গুটিয়ে ফেলতে হয়। তাদের কোয়েনিগসভিন্টার ত্যাগ করার পরে নিরাপত্তার প্রসঙ্গ ওঠে। পুনরায় গিজেলা বনকে যোগাযোগ করা হলে পরদিন ২০ আগস্ট জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে জার্মান ভূমিতে থাকাকালীন তাদের নিরাপত্তার আশ্বাসও মিলে যায়।
অবশেষে জার্মান পর্ব শেষে শেখ হাসিনা, ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ রেহানা, জয় (সজীব ওয়াজেদ) ও পুতুল (সায়মা হোসেন) ২১ আগস্ট কোয়েনিগসভিন্টার ত্যাগ করেন এবং এক দিনেরও কম সময়ে দিল্লি পৌঁছান।
n লেখক : সাংবাদিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
