পার্বত্য চট্টগ্রামকে আবারো অশান্ত করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সম্প্রতি এক সপ্তাহে এক সেনা সদস্যসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। জানা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে তিন পার্বত্য জেলায় আঞ্চলিক দলগুলোর অবাধ চাঁদাবাজির ক্ষেত্র আগের তুলনায় অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুনসহ সকল অপরাধ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। প্রতি মাসে কোটি কোটি চাঁদা আদায়ও বন্ধ। পাহাড়ি-বাঙালিরা শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে আসছেন। তবে শান্তি চুক্তির সুবিধা নিয়ে কিছু সংখ্যক গ্রুপ বিলাসবহুল জীবনযাপন আর বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশে অবস্থানরত কিছু সংখ্যক বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ পাহাড়কে অশান্ত করার জন্য সকল ধরনের ষড়যন্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছেন। তারা সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও সরবরাহ করছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিকালে ‘সেভেন মার্ডার’সহ বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেফতার এড়াতে আঞ্চলিক দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ আত্মগোপন করেছেন। এ কারণে আঞ্চলিক দলগুলো দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের কর্তৃত্ব কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠাতা প্রসীত খীসা ও তার ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত মাইকেল চাকমা অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে এ দুজনের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আবার স্বাভাবিক জীবনের আশায় আঞ্চলিক নেতাদের একটি অংশ স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণও করছেন। এদের মধ্যে ইউপিডিএফ এর বিচার ও সাংগঠনিক পরিচালক আনন্দ চাকমা, পার্বত্য ছাত্র পরিষদের সভাপতি কুনেন্টু চাকমা রয়েছেন। নেতার অভাব এবং অর্থের জোগান না থাকায় দল পরিচালনায় সংকটে পড়েছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তারা ইদানিং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি আরেকটি কারণ হচ্ছে, প্রথম সারির নেতাদের অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরেছে দ্বিতীয় সারির নেতারা। তারাও নিজেদেরকে জাহির করতে চায়। এসব কারণেই মূলত পাহাড়কে অস্থির করার মিশনে নেমেছে আঞ্চলিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তারা সেনাবাহিনীকে প্রধান প্রতিপক্ষ বলে মনে করছে। এমনকি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করতেও তারা কুণ্ঠা বোধ করছে না। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে চলতি আগস্ট মাসে এক সপ্তাহে তিনবার সেনাবাহিনীর টহল যানের ওপর হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় এক সেনাসদস্য ও চার হামলাকারীসহ মোট পাঁচজন নিহত ও কমপক্ষে দুইজন আহত হয়েছে বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর), পুলিশ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলের নেতাদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতকালে পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠনের নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক দলগুলোর দাবি তাদের নেতাকর্মীদেরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, নিহতরা এলাকায় দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত। এদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে বেশ কিছু মামলা রয়েছে। এদিকে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা ও একের পর এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় এ পর্যন্ত ৩৫২ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৮৪ জন। বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২২৭ জন।
এক সপ্তাহে ৫ খুন: জানা গেছে, গত ১৮ আগস্ট সকালে রাঙামাটি রিজিয়নের আর্মি ক্যাম্প থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণে পোয়াতুমুখ এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি নিয়মিত টহল দলের ওপর সন্ত্রাসীরা অতর্কিত গুলি বর্ষণ শুরু করে। এতে সৈনিক মো. নাসিম গুলিবিদ্ধ হন। পরে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালাতে গিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরিত হয়ে ক্যাপ্টেন মেহেদি ও সৈনিক মশিউর গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। ঘটনার আটদিন পর গত সোমবার রাতে রাজস্থলী থানার এসআই এরশাদ মিয়া বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। রাজস্থলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মফজল আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাজস্থলীর ঘটনার পাঁচদিন পর ২৩ আগস্ট বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম এলাকায় টহল দিতে গেলে পুনরায় সেনাবাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনীর পাল্টা গুলিতে শান্তিময় চাকমা ওরফে সুমন চাকমা নামে একজন নিহত হয়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত সোমবার খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার বড়াদম এলাকায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় ৩জন নিহত হয়।
