মাতাল ঋত্বিক

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ১৯:২১

আমার বাবার এক বন্ধু আছে, তার প্রিয় কবি শামসুর রাহমান। তার বাসায় আমি প্রথম ‘মাতাল ঋত্বিক’ নামক কবিতার বইটি দেখি। ঋত্বিক কুমার ঘটকের নামটি তখন থেকেই করোটিতে দখল করে নিয়েছিল। ঋত্বিকের প্রথম যে ছবিটি দেখি বিটিভির সৌজন্যে, তখন স্কুলের ছাত্র, নামটি মনে আছে ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ছবিটিকে দুঃখ-কষ্টের ছবি ছাড়া আর অন্য কিছু মনে হয়নি তখন। পরবর্তীসময়ে ১৯৯৬ সালে শর্ট ফিল্ম ফোরামে যখন ফিল্ম কোর্সের মাধ্যমে জড়িত হলাম তখন বুঝতে পারলাম, ঋত্বিক ঘটক সাধারণ মানের কেউ তো নয়ই; বরং ডিফিকাল্ট ধরনের পরিচালক মনে হলো। এই ডিফিকাল্ট ঋত্বিককে বুঝতে হবে, কীভাবে তা সম্ভব? ‘ইতিহাসের মাত্রা ও ঋত্বিক কুমার ঘটক’ নামক একটি কর্মশালার আয়োজন করে চলচ্চিত্রম ফিল্ম সোসাইটি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সেই কর্মশালায় সঞ্চালক। সেই কোর্সে নাম লেখালাম।

সেই কর্মশালা থেকে কতটুকু জানলাম? কতটুকু চেনা গেল ঋত্বিক ঘটককে? প্রায় ১১ বছরের পুরনো নোট খাতা আর নেই। তাহলে? ঋত্বিকের লেখা দিয়েই শুরু করছি :‘গণনাট্য আন্দোলনের প্রথম যুগে আমার আন্দোলনের সাথে গভীর যোগাযোগ ছিল। কয়েকটা নাটক লিখেছিলাম। অভিনয় করতাম। এর আগে আমি লিখতাম অর্থাত্ সাহিত্য করতাম। দেখলাম, এই গল্প, কবিতা মানুষকে সোজাসুজি effect করে না। সেইজন্য গেলাম নাটক করতে, stage-এ। সামনে এক হাজার দু হাজার পাঁচ হাজার লোক পাব। তাদের ক্ষেপিয়ে তুলতে পারব। immediate reaction হবে। পরে দেখলাম সিনেমা আরও শক্তিশালী মাধ্যম। আরও বেশি লোককে একসঙ্গে জড়ো করতে পারব। আমি যা বলতে চাই, তার একটা immediacy আছে, তাগিদ আছে, তাড়া আছে। সিনেমা এদিক থেকে সবচেয়ে আদর্শ মাধ্যম।’ এই খানে বক্তব্য শেষ হলে চলত, কিন্তু তিনি ঋত্বিক ঘটক। ‘চিত্রবীক্ষণ’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে আরো যোগ করেছিলেন, ‘এইভাবে আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে আসিনি। কাল যদি সিনেমার চেয়ে better medium বেরোয় তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাবো। I don’t love film.’

আসলে কি তা-ই? আমরা কি ধরে নেব, ঋত্বিক কুমার ঘটক সিনেমার প্রেমে পড়েননি? ঋত্বিক ঘটক পুণা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন দু বছর পরে তিন মাসের জন্য হয়েছিলেন ভাইস-প্রিন্সিপাল, সেই সময়কার ছাত্র, পরবর্তীসময়ে নামকরা চলচ্চিত্রকার কুমার সাহানী প্রবন্ধে ঋত্বিককে স্মরণ করেছিলেন এইভাবে :‘ফিল্ম ইনস্টিটিউটে তাঁর ‘কোমল গান্ধার’ দেখান হচ্ছিল, তাঁর জামার ওপরে বিড়ির ছাই পড়ছিল, আর তিনি নিজের তৈরী ছবি যেন প্রথমবার দেখছিলেন। কোলকাতার ছবিঘরগুলি থেকে কয়েকদিন দেখানোর পর ওটা তুলে নেওয়া হয়। তাঁর চোখে জল আসছিল, আর তাঁর একজন খ্যাতনামা মারাঠি চিত্র পরিচালক ঋত্বিকের কয়েকজন প্রিয় ছাত্রের সঙ্গে ছবিটি দেখতে দেখতে স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসায় মন্তব্য করছিলেন। ঋত্বিকের যদি কোন দোষ ছিল, সেটা তাঁর জেদ, তাই আমরা তাঁর শিশুসুলভ অসহায় প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক হলাম।’ 

এই জেদটা কী? ঋত্বিক তার লেখায় বলেছেন :‘আমি বিশ্বাস করি না যে আমার কোন শিল্পকর্ম করার অধিকার আছে, যদি না আমার দেশের সংকটকে কোন না কোন দিক থেকে উদ্ঘাটন করে তুলতে না পারি। আমার বেশির ভাগ ছবিই সেই সংকটকে ধরবার চেষ্টা মাত্র।’ 

তাহলে প্রশ্ন আসে, কেমন ছিল ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা? তিনি কি বক্তব্যধর্মী ছবি করতেন? সমস্যাসংকুল সিনেমা তৈরিতে নিয়েজিত ছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তরে সমালোচক গুরুদাস ভট্টাচার্য ঋত্বিক বিষয়ক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন :‘শ্রীঘটক এ বিষয়ে (মাইথোপিয়া’ বা উপকথা-বৃত্তি) প্রচুর পড়াশোনা করেছেন, ভেবেছেন, লিখেছেন। ... শ্রীরায় (সত্যজিত্) ও শ্রীসেনের (মৃণাল) ছবি আমাদের বাধ্য করে আশেপাশে তাকাতে, নিজের মধ্যে নজর ফেলতে; কিন্তু হাজার হাজার বছরের মানবিক অস্তিত্বের রহস্য আমরা উপলব্ধি করি না। উপকথাবৃত্তির অ-প্রয়োগে ছবির সেই অলৌকিক ক্ষমতা জন্মায় না। ফলে, তার বাস্তবতা দর্শকের অনুভবের গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষণিকের আনন্দ পরিণত হয় চিরকালের অতৃপ্তিতে। ওঁদের ছবির সমালোচনায় একথা আমি বরাবরই, বারে বারে বলেছি। বিপরীত পক্ষে, ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে আছে মহাকালের ডাইমেনশন; আর, তা আছে বলেই তাঁর সৃষ্ট চিত্র-বাস্তবতা আমাদের রক্তের মধ্যে খেলা করে, আমাদের নিয়ে যায় অতিশয় বাস্তবের কেন্দ্রভূমিতে, মানুষের জীবনের-ইতিহাসের একেবারে সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে শ্রীঘটক আজও অদ্বিতীয় রহিত, এই মাইথোপিয়ার প্রয়োগে।’  

ওপরের কথাগুলো অস্পষ্ট মনে হতে পারে। এই অস্পষ্টতা দূর করার জন্য ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র নিয়ে এবার লিখব।

‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৭-৫৮) ঋত্বিকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। সুবোধ ঘোষের গল্প নিয়ে ঋত্বিক ঘটক চিন্তাভাবনা করেছিলেন দীর্ঘ বারো বছর। গল্পটি ছিল ভিন্নধরনের, কিছুটা অদ্ভুত। ছবিতে নায়ক বলতে বিমল আর নায়িকা অবশ্যই জগদ্দল (গাড়িটা)। ঘটনাস্থল ছোটনাগপুরের আদিবাসী সমাজের পশ্চাদপটে-একটি ছোট নদীর ধারের শহরে যেখানে আছে কয়েকটি ট্যাক্সি। সবচেয়ে পুরনো আর নড়বড়ে ট্যাক্সি বিমলের, আদর করে সে যার নাম দিয়েছে জগদ্দল। নিঃসঙ্গ বিমলের না আছে মা, না আছে স্ত্রী। তাই সে প্রাণভরে ভালোবাসা দেয় তার জগদ্দলকে—আর তার সাড়া দেয় জগদ্দল নানারকম শব্দ করে। জগদ্দলকে ভালোবাসলেও একসময় জগদ্দলের ধ্বংস মেনে নিতে হয় বিমলের।

ছবিটি দেখার পর যে বক্তব্য প্রথমে আসে—যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে সেই দ্বন্দ্বের প্রকাশ হলো যন্ত্রসভ্যতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি—আত্মিক নৈরাশ্য অথবা শূন্যতা। এছাড়া আরেকটি বক্তব্য বা অর্থ ছবিতে পাই—শহরের মানুষ আর গ্রাম্য আদিবাসীদের বিপরীত চিত্র। অযান্ত্রিকে আদিবাসীদের জীবনভিত্তিক নৃত্যগীতির দৃশ্যে ছিল জন্ম, শিকারে যাওয়া, বিবাহ, মৃত্যু, পূর্বপুরুষের প্রতি পূজা এবং নবজন্ম—এই সমস্ত cycle। ছবির বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে পুরো ছবি জুড়ে গাড়ি চলার সময় effect noise বা আলংকারিক শব্দের ব্যবহার, জগদ্দলকে মানুষ মনে করিয়ে দেওয়াটা ঋত্বিকের পক্ষেই সম্ভব। আলি আকবর খানের সংগীত, ঋত্বিকের পরিকল্পিত ব্যবহার ভাবনায় ফেলে। যেমন—ছবিতে দুটো জায়গায় পাগলের ব্যবহার আছে। দুটি ভিন্ন জায়গায় রাস্তার ধারে বসে থাকে সে। বিমলের গাড়ি পাগলকে একবার ধুলো উড়িয়ে চলে যায়, অন্যবার বর্ষার জল ছিটিয়ে চলে যায়। দৃশ্য দুটির  সময় ভিন্ন হলেও একই দৃষ্টিকোণ থেকে তোলা। কিন্তু এই দুই জায়গায় দুই বার ভিন্নভাবে এসে যেন একই গানের সুর দুই রকমভাবে শুনতে পাই আমরা। এরকম আশ্চর্য জিনিস ‘অযান্ত্রিক’-এ রয়েছে।

‘অযান্ত্রিকের main theme, মৌল উপজীব্য ছিল এইটাই। যাকে আমরা the low of life জীবনের নিয়ম বলতে পারি। পাগলের নতুন গামলা পেয়ে পুরানটিকে ভুলে যাওয়ার সেই নিষ্ঠুর দৃশ্য এবং সর্বশেষ এক শিশুর হাতে জগদ্দলের ক্রেংকার ধ্বনি, যাতে বিমলকে উপলব্ধির হাসিতে ভুলিয়ে দিয়েছিল—এগুলোতে সেই কথাই প্রকাশ করছে। এ যেন variation on a minor scale of the main theme, a sort of echo, যা যে কোন symphonic structure-এর প্রাণবস্তু। আমার ভুল হয়েছিল, সর্বজনগ্রাহ্য বস্তুর মধ্যে দিয়ে ব্যাপারটাকে টেনে আনতে পারিনি। কিন্তু উপায়ও ছিল না—বিষয়বস্তু এবং পটভূমিকার জন্যে। কাজেই esoteric হয়ে থাকতে হোলো, সাধারণ গ্রাহ্য হওয়া গেল না।’ ছবিটি মুক্তির তিন দিন পরেই যখন নামিয়ে ফেলা হয়, পরবর্তীসময়ে এই উপলব্ধি হয়েছিল ঋত্বিকের।

এই উপলব্ধি থেকেই কি না জানি না ঋত্বিক ঘটক তৈরি করলেন শক্তিপদ রাজগুরুর গল্প অবলম্বনে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) যা বক্স অফিস আনুকূল্য পেয়েছিল। এবং একমাত্র আনুকূল্য পাওয়া চলচ্চিত্র। সাধারণ দর্শকেরা হূদয় দিয়ে ছবিটি গ্রহণ করেছিল। কী ছিল সেই ছবিতে—উদ্বাস্তু সমস্যা ছাড়াও ছিল নীতা নামক একটি মেয়ের কাহিনি। দরিদ্র সংসারটিকে কোনোক্রমে দাঁড় করিয়ে রাখে নীতা। বাবা-মাকে সাহস দেয়, ভাই-বোনকে সাহস দেয়, উত্সাহ দেয় দাদাকে সংগীতচর্চায়। কিন্তু যেদিন প্রেমিক সনত্ প্রত্যাখ্যান করে বিয়ে করল তারই ছোট বোন গীতাকে, অসহ্য হয়ে উঠল দিন-রাত্রি। এরপর সবার অগোচরে যক্ষ্মা। স্যানাটোরিয়াম এবং মৃত্যু। এ মৃত্যু সে চায়নি, এর জন্য দায়ী সমাজেরই বহুতর পাপ-অপরাধ।

এত সরলীকরণ ব্যাখ্যায় ছবিটির আলোচনা শেষ করা গেলে ভালো হতো, কিন্তু আপনাদের বুঝতে হবে চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটক। এই ছবিটির মাধ্যমে তিনিই ভারতীয় Mythology কে ব্যবহার শুরু করেন, যেখানে একমাত্র তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় ঋত্বিক ঘটক universal theme নিয়ে কাজ করেছিলেন। নিজেকে পরিব্যাপ্ত করেছিলেন ঐতিহ্যের মধ্যে। ছবি মুক্তির ৭ বছর পর ঋত্বিক ঘটক মুভি মনতাজ-কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন :‘গত সাত-আটশো বছরের বাংলাদেশে একটা বড়ো মজার ব্যাপার গড়ে উঠেছিলো যা একেবারেই বাঙালী। স্মার্ত প্রভাবপুষ্ট বাঙালী সমাজ গৌরীদানেতে পাগল হয়ে উঠেছিলো। সেই অষ্টম বর্ষিয়া শিশু খেলার আঙিনা ছেড়ে অজানা গাঁয়ের অজানা বাড়িতে গিয়ে চারিপাশের ভ্রুকুটি কুটিল মুখগুলো দেখে বড়োই ভয় পেত, বড়োই তার নিজের বাড়ির জন্য মন কেমন করতো। এই ব্যথা আমাদের লোককথার শাশ্বত কালের জন্য বিধৃত হয়ে আছে। এই কান্না ঝরছে আগমনী বিজয়াতে। তাই দূর্গা আমাদের মেয়ে; তাই শরত্কাল বড়ো কেমন করা। Great Mother Archetype-এর বিচিত্র বহিঃপ্রকাশ। এই ছিল ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মূলতম প্রয়োজন। আরও বহু কথা এসে গেছে, হয়তো আধুনিক জীবনের বহু পাপের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ আছে। কিন্তু ছবিটির সমৃদ্ধি ঐখানে। তাই আমার নীতার জন্মদিন হয় জগদ্ধাত্রী পূজোর দিন। তাই যক্ষ্মার আবিষ্কারের সময় মেনকার বিজয়ার বিলাপোক্তি শোনা যায়, ‘আয় গো উমা কোলে লই’। নীতা মহাকাল পাহাড়কে জীবনভর দেখতে চায়, দেখে তখনই যখন মহামিলন ঘনিয়ে আসে, মহাকালরূপী সংহারদেব তাকে আলিঙ্গন দেন সেই পরম অবলুপ্তিতে।’

এখানেই আলোচনা শেষ করা যেত, কিন্তু আরো কিছু বলার আছে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ নিয়ে। এই ছবিতে ঋত্বিক ঘটক শব্দ নিয়ে খেলা করেছেন। আলংকারিক শব্দের ব্যবহারে জন্য ছবিটি অবশ্যই শিক্ষণীয়। সনতের বাড়িতে গীতাকে আবিষ্কার করে শূন্য সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিল নীতা, চূড়ান্ত দুঃখের মুর্হূতে চাবুকের শব্দ ব্যবহার করেছিলেন তিনি। আরেক দৃশ্যে—মা চান না নীতা সনতের সঙ্গে প্রেম করুক। তাই তো যখন মা দেখতে পান সনত্ আর নীতা তা করছে, সেসময় ভাত ফোটার বদলে ভেসে আসছিল চড়বড় করে তেল পোড়ার শব্দ, মায়ের মানসিক অবস্থা বোঝানোর জন্য। দৃশ্যপরিকল্পনার মধ্যে ছিল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। একই মাঠে বসে সনত্-নীতার দুটি দৃশ্যের কথা বলব। প্রথমটিতে যখন সনত্ বিয়ের কথা বলে, তখন সেই সময় রেল তীব্র হুইসেল দিয়ে চলে যাওয়াতে যে অর্থ প্রকাশ করেছিল, পরবর্তীসময়ে সনত্ যখন তার ভুল বুঝতে পেরে সেই একই স্থানে বসে নীতার কাছে আবার ফিরে আসতে চাওয়ার কথা বলে, তখন রেলের তীব্র হুইসেল দিয়ে চলে যাওয়ার সঙ্গে চাবুকের শব্দের ব্যবহার নীতার একার নয়, দর্শকেরও মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। ছবির শুরুর দিকে পথিমধ্যে নীতার স্যান্ডেলের স্ট্যাপ ছিঁড়ে যাওয়া আর শেষে আবারও নীতার মতো ঠিক আরেকটি মেয়ের স্যান্ডেলের স্ট্যাপ ছিঁড়ে যাওয়া চিরায়ত ব্যাপারটিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা ছায়াছাবিতে সংগীত থাকে এবং থাকবেও। কম করে হলেও এই ‘বিশেষ ধরনের’ ছবিগুলোতে সংগীতের ব্যবহার দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়েছে, কিন্তু ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় সংগীতের এত সার্থক ব্যবহার আমাকে অবাক করে। দাদার সঙ্গে নীতার গান ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’ দৃশ্যের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি মনে হবে এই গানটি বুঝি এই ছবির জন্যই লেখা হয়েছিল। আর ঋত্বিকের কম্পোজিশন যে কত অদ্ভুত পাওয়ারফুলি এক্সপ্রেস করতে পারে, তা তার ছবি না দেখলে বোঝা যায় না। বাংলাদেশের অন্যতম চিত্রগ্রাহক বেবি ইসলাম, যিনি ঋত্বিকের সঙ্গে দুটি ছবিতে কাজ করেছিলেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এবং ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’, তার কথা দিয়ে প্যারাটি শেষ করব : ‘মেঘে ঢাকা তারা’র কথা বলছি। কম্পোজিশন যে কতটা শেখার জিনিস তা বোঝা যায় শেষ দৃশ্যটা দেখে। নীতা বলছে তার ভাইকে, ‘দাদা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম’—ক্যামেরা প্যান করতে শুরু করে। একেবারে ভরাট ফ্রেম-গাছপালা, পাহাড় এসবকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে প্যান করে। শেষে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায় যেখানটা একেবারে শূন্য। একেবারে এম্পটি একটা স্পেস। মনে হবে যেন মাটি আঁকড়ে ধরতে চাইছে নীতা। মাটি তাকে ছেড়ে যেতে চায়, আবার সে তাই আঁকড়ে ধরতে চাইছে। লাস্টে ফ্রেমটা একদম ব্ল্যাঙ্ক। একেবারে শূন্যতা, নিঃসীম হাহাকার। কম্পোজিশনের যে এত গুরুত্ব, সেটা ঐ চরিত্রের বাঁচা, তার বেঁচে থাকবার আকাঙ্ক্ষা, সবকিছুর সাথে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।’                        

ভারতীয় সিনেমার দুটি নাম, সত্যজিত্ রায় এবং ঋত্বিক ঘটক। সত্যজিত্ রায়ের লেখা দিয়ে শেষ করছি : ‘—একটা বিশেষ গুণ ঋত্বিকের ছবির, সেটা হল আমরা যারা প্রায় গত চল্লিশ বছর ধরে ছবি দেখেছি তাদের মধ্যে তো প্রায় ত্রিশটা বছর কেটেছে হলিউডের ছবি দেখে। কেননা কলকাতায় তার বাইরে কিছু দেখার সুযোগ ছিল না সে সময়টা। উনিশো ত্রিশ বা পঁচিশ থেকে শুরু করে প্রায় পঞ্চান্ন বা ষাট অবধি আমরা হলিউডের বাইরে খুব বেশী ছবি দেখতে পারিনি। আমাদের সকলের মধ্যে তাই কিছু কিছু হলিউডের প্রভাব ঢুকে পড়েছে। কিন্তু ঋত্বিক কোন এক রহস্যময় কারণে সে প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল। তার মধ্যে হলিউডের কোন ছাপ নেই। এটা যে কি করে হয়েছে, সেটা এখনও আমার কাছে রহস্য রয়ে গেছে। যদি প্রভাবের কথা বলতে হয় আমার মনে হয়, ঋত্বিকের ছবিতে কিছুটা সোভিয়েত ছবির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সে প্রভাবটা—প্রভাব মানে সেখানে অনুকরণ নয় কারণ ঋত্বিকের প্রধান গুণ ছিল তার বৈশিষ্ট্য, তার মৌলিকতা এবং সেটা সে শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছিল। এই সোভিয়েত ছবির প্রভাব এবং সংলাপে, বিষয়বস্তুতে, ছবির পরিসমাপ্তিতে নাটকের প্রভাব তার মধ্যে ছিল, এবং এই দুটো জিনিস দাঁড়িয়েছিল যে ভিত্তির ওপর সেটা একেবারে বাঙলার মাটিতে বসানো। ঋত্বিক মনে প্রাণে বাঙালী পরিচালক ছিল, বাঙালী শিল্পী ছিল—আমার থেকেও অনেক বেশী বাঙালী, আমার সেইটেই তার সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং সেইটেই তার সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।’