ট্রানজিট

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ১৯:২২

দুবাই এয়ারপোর্টের ট্রানজিটে এভাবে পুরনো প্রেমিকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ভাবেনি তানজিনা।

এয়ারপোর্টের একটা স্ন্যাকস বারে বসে আছে তানজিনা আর সৈকত। তানজিনা তাকিয়ে আছে সৈকতের দিকে। কিন্তু ওর মন ডুবে আছে টিএসসির সেই সন্ধ্যার স্মৃতিতে। সাড়ে তিন মাস নিখোঁজ থাকার পরে সৈকত ওকে কিছু বলতে এসেছিল সেদিন। কিন্তু ও না শুনেই চলে গিয়েছিল। কী বোকা ছিল ও! তানজিনার স্মৃতিভারাক্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সৈকত।

‘তুমি মানে আপনি... অনেক সুন্দর হয়ে গেছেন।’ সৈকতের কথা শেষ না হবার আগেই ওকে থামিয়ে দেয় তানজিনা।

‘তুমি করে বলেন, কোনো সমস্যা নাই।’

‘তুমি তো নিজে আপনি করে বলছ।’ সৈকত তার ট্রেড মার্ক মুগ্ধ করা হাসি ছড়িয়ে উত্তর দেয়।

সেই মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যে কোথায় যেন চাপ চাপ ব্যথা বোধ করে তানজিনা।

‘আপনি তো আমার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ভাই! তুমি করে কেন বলব? ইউনিভার্সিটি লাইফের মতো সজোরে জবাব তানজিনার।

‘হা-হা-হা ... তুমি সেই আগের মতো আছ। জেদি, অভিমানী বালিকা। আচ্ছা তোমার আমার সম্পর্ক কি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র জুনিয়রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল?’

প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন ভালো লাগে না তানজিনার। তারচেয়ে মনে হয় নীরব থাকুক সৈকত। এয়ারপোর্টের নানা দেশের মানুষের এই কোলাহলের মধ্যে চুপচাপ দুজন চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকুক। খুব বেশি সময় তো হাতে নেই। তিন ঘণ্টা! নাকি আরো কম সময়? হাতের ঘড়ি দেখে তানজিনা। আগেভাগে নিউ ইয়র্কগামী প্যাসেঞ্জারদের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।

‘ঘড়ি দেখছ কেন? আমার সঙ্গে বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে? ‘সৈকত আবার প্রশ্ন করল। আবার সেই দ্রুত কোনোকিছু নিয়ে মন্তব্য করা। আসলে ছেলেটার চিন্তাভাবনায় কোনো গভীরতা নেই। ছেলে না লোক? আমি নিজেও তো মহিলা। মাস্টার্স পাস করেছি তা-ও দশ বছরের বেশি।

‘দেখছিলাম, কত সময় আছে আমাদের হাতে? আর তিন ঘণ্টা পরে তো আপনি আমার জীবন থেকে আবার হারিয়ে যাবেন।’

‘আর হারাব না। এখন তো সেই যুগ নেই। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইন্সট্রাগ্রাম, ওয়েবক্যাম, হোয়াটস আপ... কতকিছু। তুমি চাইলেই আমি সারাক্ষণ তোমার চোখের সামনে থাকতে পারব।’ টেবিলের ওপর থাকা তানজিনার হাতের আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলে সৈকত।

সৈকতের হাতের ছোঁয়ায় শরীরে হালকা কাঁপন লাগে তানজিনার। মুখ রক্তিম হয়। দুই চোয়ালে কেমন যেন ব্যথা করতে থাকে।

‘তখন তো বাসার টিঅ্যান্ডটি নাম্বার দিয়েছিলাম আপনাকে। আপনি তো যোগাযোগ করলেন না!’ অভিমানে ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপতে থাকে তানজিনার। ও ভেবেছিল সৈকতের কোনো দোষ-ত্রুটির কথা এখানে তুলবে না। কোনোভাবে এই তিন ঘণ্টা সময়কে অপ্রিয় প্রসঙ্গে টেনে তিক্ততায় ভরিয়ে দেবে না। কিন্তু মানুষ যা চায় তা-ই কি হয়? তাহলে তো ওদের দুইজনের পথ এভাবে আলাদা হতো না!

তানজিনার অভিমানে টলমল মুখের সামনে চোখ নামিয়ে রাখে সৈকত। কয়েক সেকেন্ডকে ওর মনে হয় অনন্ত যুগ। চোখ তুলে সৈকত অবাক হয়ে যায়। তানজিনার গাল বেয়ে একটা জলের রেখা নেমে এসেছে। ওর বুকটা এমনভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে যে বলার নয়। জীবনের একটা ভুলে কত বড় জলাঞ্জলি দিতে হলো।

সৈকত পকেট থেকে টিস্যু বের করে তানজিনার চোখের জল মুছিয়ে দেয়। ওর ইচ্ছে করে এক চুমুতে শুষে নেয় সবটুকু কান্না।

—আমি আসলে কীভাবে তোমাকে বলব, বুঝতে পারছি না! তোমার দেওয়া নাম্বারটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। সম্ভবত শার্টের পকেটে রেখেছিলাম। বাবার অসুস্থতার খবর শুনে পাগলের মতো ছুটে গেলাম সিরাজগঞ্জে। মাথা ঠিক ছিল না তখন। পকেট থেকে কিছু বের করতে গিয়ে সম্ভবত নাম্বার লেখা কাগজটা পড়ে গিয়েছিল।

কথাগুলো বলতে গিয়ে সৈকতের মনে হলো বুকের ভেতর বহু বছরের জমে থাকা পাথর নেমে যাচ্ছে।

—বাবার অসুস্থতার জন্য সন্তানের অস্থির হওয়ারই কথা। তাই বলে তিন মাস আপনি লাপাত্তা হয়ে গেলেন।

ভাঙা কণ্ঠে কোনোরকমে বলে তানজিনা।

— শোনো তানি, কথা বলার মধ্যে সৈকত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করে তানজিনার হাত, আমি বাড়িতে যাবার বারো দিনের মাথায় আব্বা মারা গেলেন। ওই সময় আমার পরিবারের যে কী রকম দুঃসময় গেছে তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। বাবার মৃত্যুর পরে শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। সিরাজগঞ্জ শহরে আমাদের যে বাড়ি, তার বৈধ দলিল ছিল না আব্বার কাছে। আব্বা খুব সরল মানুষ ছিলেন। শুধু কথার ভিত্তিতে টাকা দিয়েছিলেন আগের বাড়ির মালিককে। কিন্তু লিখিত দলিল করে নেননি। অথচ জন্ম হওয়ার পর থেকে জানি ওটা আমাদের নিজের বাড়ি। একে বাবার মৃত্যুর শোক, আবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার হুমকি—জীবনটা এমন হয়ে গেল যে কারো কথাই মাথায় থাকল না।

এবার তানজিনা হাতের মুঠোয় নেয় সৈকতের আরেক হাত। ভিনদেশের এয়ারপোর্ট। এভাবে হাত ধরাধরি করে বসে থাকলে কেউ নেই নিন্দা করার। জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেও কেউ ফিরে তাকাবে না। বরং এয়ারপোর্টে এটা স্বাভাবিক দৃশ্য। তানজিনার গাল আবারও রক্তিম হয়।

সৈকত সেটা খেয়াল করে না। ও ডুবে আছে অতীতের বিষাদময় দিনগুলোতে। সৈকতের দিকে তাকিয়ে তানজিনা ভাবে, ও কি আসলে ভুল করেছে? ওর নিজের জীবন অনেক বেশি মসৃণ বলে ভেবেছে সবারই তেমন হবে।

—তারপর কী করলেন? হূদয়ের সমস্তটুকু মমতা নিয়ে জানতে চায় তানজিনা।

—বাবা আমার যে চাচার কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছিলেন, উনি ভালো মানুষ ছিলেন। চাচা মারা যান আব্বার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে। কয়েক মাসের ব্যবধানে আব্বা মারা যাওয়ায় চাচার ছেলেমেয়েরা সমস্যাটা তৈরি করে। ওনাদের সিরাজগঞ্জ শহরে একাধিক বাড়ি আছে। তবু আরো চাই। সদ্য বিধবা আমার মা, ছোট দুই বোন নিয়ে আমি তখন কী করব, কোথায় দাঁড়াব—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

—হুমমম... তখন তো আপনার বয়সও অনেক কম ছিল।

—সেটাই। যা-ই হোক, আমার ওই চাচা, যার স্ত্রী  বেঁচে ছিলেন। আম্মা গিয়ে ওনাকে ধরেন। আব্বা যে দফায় দফায় টাকা দিয়েছে সেটা চাচীর ভুলে যাওয়ার কথা না। ওই চাচী তখন ছেলেমেয়েকে বোঝালেন। আমাদের বাড়িটা বুঝিয়ে না দিলে, এটা যে নিমকহারামি হবে সেটা তিনি ছেলেমেয়েদের বোঝাতে সক্ষম হলেন। পরে অনেকবার বসার পরে আরো বেশকিছু টাকা দিয়ে দলিলটা ফেরত পেলাম।

—তারমধ্যে কেটে গেছে তিন মাস সময়।

—হ্যাঁ, আমার জীবনের সবচেয়ে সংগ্রামময় তিন মাস।

—আমার জীবনেও। তানজিনা অনেকটা স্বগতোক্তির মতো কথাটা বলে।

—তোমার জীবনেও? কীভাবে?

—আপনি চলে যাবার পর জাগরণের প্রতিটি মুহূর্ত আপনাকে নিয়ে ভাবতাম। রাতে ঘুম ভেঙে যাবার পরেও দেখি মাথার মধ্যে আপনি। এভাবে কারো ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা সম্ভবত! লাইলীর প্রেমে মজনুও ছিল না। ক্যাম্পাসে গেলে বান্ধবীদের একটাই প্রশ্ন, সৈকত ভাই যোগাযোগ করেছে? আমি আর কতবার বলব, ‘না’। আমার বন্ধুরা আপনাকে প্রতারক বলতে শুরু করল। আমি সেই আঘাত নিতে পারছিলাম না। আমার মন কোনোভাবে আপনাকে প্রতারক ভাবতে পারছিল না। হঠাত্ আমার শরীর খারাপ হতে লাগল। এমন জ্বর হলো যে বাইশ দিন লাগল সেরে উঠতে। এমনিতে আমার অসুখবিসুখ কম হয়। জীবনে এত লম্বা সময় কখনোই এভাবে অসুখে ভুগিনি। জ্বর সেরে যাবার পরে শুরু হলো প্রচণ্ড কাশি। সঙ্গে ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। বিছানায় বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর বসে বসে আপনার কথা ভাবতাম।

—তানজিনা, প্লিজ আর বোলো না। এত খারাপ লাগছে। ইস্ তখন আমাদের মোবাইল ছিল না। তাহলে হয়তো কাউকে এভাবে কষ্ট পেতে হতো না।

—এখন আমার ওজন কত জানেন? তানজিনার হঠাত্ আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তনে অবাক হয় সৈকত। ও মাথা নাড়ে। সামনে বসে থাকা মানুষটির উত্তরের অপেক্ষা না করে তানজিনা আবার বলতে শুরু করে। ওকে যেন এই মুহূর্তে কথা বলার ঘোরে পেয়েছে।

—৫৮ কেজি ওজন এখন আমার। তাতেই আমাকে কত স্লিম দেখাচ্ছে তা-ই না? ওই সময়ে আমার ওজন ৪৮ কেজি হয়ে গিয়েছিল। আমার এই উচ্চতায় এত কম ওজন, রীতিমতো কঙ্কালসার লাগত আমাকে। ইউনিভার্সিটি বাস থেকে নেমে চারতলায় ক্লাসে যাবার ক্ষমতা ছিল না। কলাভবনের নিচতলার কমনরুমে বসে থাকতাম অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে এক-একটা সিঁড়ি ভেঙে উঠতাম।

—এখন মনে হচ্ছে আমার চেয়েও তোমার দিনগুলো বেশি খারাপ গিয়েছে। সৈকতের কণ্ঠে নির্ভেজাল দরদ।

—কী যে খারাপ, এরচেয়ে আসলে খারাপ আর হতে পারে না। ক্লাসে গেলে বান্ধবীদের প্রশ্ন তো ছিলই। ওরা মাসখানেক পরে অবশ্য প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে আমার আড়ালে ফিসফাস করত বুঝতাম। তবে আমার অসুস্থতায় ওরা দুঃখ পেয়েছিল। বাসায় গিয়ে আম্মাকে বলত, আমার দিকে যেন একটু বেশি নজর দেন।

—ওই দিনের সন্ধ্যার কথা মনে আছে? আমার সঙ্গে টিএসসিতে দেখা হবার পরে তুমি কথা না বলে চলে গেলে। সৈকত অভিমানী কণ্ঠে জানতে চায়।

—আমার তো তখন নতুন জন্ম হয়েছে। আমি বহুকষ্টে নিজেকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম, সৈকত বলে কেউ নেই আমার জীবনে।

—কিন্তু তুমি তো সেটা পারনি!

—হ্যাঁ পারিনি। তানজিনা স্বীকার করে।

—তাই তো এই এয়ারপোর্টে অচেনা মানুষের ভিড়ে ঠিকই খুঁজে পেয়েছে তোমার দুই চোখ আমাকে।

তানজিনা কোনো উত্তর দেয় না। ওর দুই গাল আরো রক্তিম হয়। সৈকত চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে কাউন্টারে কফির বিল দেয়। পেছন থেকে ওকে খুব সুদর্শন মনে হয়। যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ত তখনো দারুণ সুন্দর মনে হতো সৈকতকে। তানজিনা ওর এই জীবনে বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক মিলে আজ পর্যন্ত সৈকতের মতো সুদর্শন কাউকে দেখেনি।

মানিব্যাগ পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে এগিয়ে এসে সৈকত বলে, চলো অন্য কোথাও গিয়ে বসি। তানজিনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করে সৈকতকে। অনেকখানি পথ হাঁটার পরে প্যাসেঞ্জারদের বসার জন্য একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজে পায় ওরা।

তানজিনা ‘একটু আসি’ বলে ওয়াশরুমে যায়। সৈকত ওখানে বসে মোবাইলে মেসেঞ্জার ওপেন করে।

ওয়াশরুমের আয়নায় নিজেকে দেখে মন ভালো হয়ে যায় তানজিনার। এখানে প্রচুর আলোর কারণে বা যেভাবে হোক আয়নায় খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তানজিনাকে। গত তেরো বছর ধরে সৈকতের সঙ্গে দেখা হবার কথা মনে আসলেই একটা কথা মনে হতো প্রথমে। যেদিন দেখা হবে, ওদিন যেন ওকে খুব মিষ্টি দেখায়। উস্কোখুস্কো, ঘামে ভেজা মুখ নিয়ে তানজিনা মুখোমুখি হতে চায়নি সৈকতের।

তানজিনা সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দেয় প্রাণখুলে। ওদের দেখা হয়েছে এক অচেনা এয়ারপোর্টে। যেখানে কেউ ওদের চেনে না। ইন্টারনেট অফ করে রাখলে মোবাইলে কারো ফোন আসার সম্ভাবনা নেই। তানজিনা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত থাকে ওর স্বামীর মোবাইলে ফোন আসা নিয়ে। এমন নয় যে জহির কিছুক্ষণ পর পর ফোন করে। কিন্তু হঠাত্ করে ফোন করে বসলে বানিয়ে কিছু বলার ক্ষমতা নেই তানজিনার। ট্রানজিটের এয়ারপোর্টে ওরা না চাইলে কেউ ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না।

হালকা পারপেল কালারের একটা শার্ট পরেছে সৈকত। সঙ্গে নীল জিন্স। দূর থেকে সৈকতকে সিনেমার নায়কের মতো লাগছে। ফর্সা গালে সবুজ আভা।

—কার সঙ্গে চ্যাট করছেন? পাশের চেয়ারে বসে আচমকা প্রশ্ন করে তানজিনা।

—বউয়ের সঙ্গে। উত্তর দেয় সৈকত। তোমার কথা বললাম।

—আপনার বউ কি বাঙালি? তানজিনার প্রশ্ন।

—না। আসলে ওরা ইংলিশ। কিন্তু মেলবোর্নে স্থায়ী হয়েছে। আমার সঙ্গে পরিচয় এক কফিশপে। খুব ভালো মেয়ে। সৈকত এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে যায়।

—ভালো বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন? তানজিনার কণ্ঠে কৌতূহল। সেটা কান এড়ায় না সৈকতের। মুখ ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসে।

সেই হাসি। সেই তীব্র অন্তর্ভেদী চাউনি। তানজিনার চোখে মুগ্ধতার ঘোর লাগে। প্রচণ্ড হিংসা হয় অচেনা মেয়েটির জন্য।

—তোমার মতো এত ভালো না। তানজিনা হলো আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মেয়ে। সৈকত বলে হাসিমুখে।

কথাগুলো হয়তো মজা করে বলা। তবু তানজিনার খুব ভালো লাগে। মনের ক্ষোভ অনেকখানি হ্রাস পায়।

—একটু পরে আমার ফ্লাইটের কল আসবে। আর আপনি ব্যস্ত হয়ে আছেন মেসেঞ্জার নিয়ে। তানজিনার কণ্ঠে অভিমান। ও যে একটু আগে ওয়াশরুমে গিয়ে কাটিয়ে এল অনেকক্ষণ, সে কথা আর ওর মনে এল না।

সৈকত মোবাইল সুইচড অফ করে তানজিনার চোখের দিকে সরাসরি তাকায়।

—সরি, এখন থেকে শুধু তোমার কথাই শুনব।

—আপনি সেই ইউনিভার্সিটি লাইফের মতো দারুণ স্মার্ট আছেন। আগে হিন্দি নায়ক ছিলেন, এখন হয়েছেন হলিউডের নায়ক! তানজিনার কণ্ঠে মজার সুর। সৈকত হো হো করে হাসতে থাকে। উদ্দাম হাসি তানজিনার মনকে ভরিয়ে দেয় অনাবিল আনন্দে। মনে পড়ে যায় সৈকতকে দেওয়া ওর বান্ধবীদের নামকরণ।

—আচ্ছা, আপনার সঙ্গে লাইব্রেরিতে আমার প্রথম দেখার কথা মনে আছে? তানজিনা প্রশ্ন করে।

—প্রথম দেখার কথা মনে নেই। কিন্তু মনে আছে তোমরা চার বান্ধবী সবসময় একসঙ্গে থাকতে। লাইব্রেরিতে একই টেবিলে বসতে। সৈকত উত্তর দেয়।

সৈকতের রেখে যাওয়া ব্যাগ সরিয়ে দিয়ে এক টেবিলে বসেছিল তানজিনা আর ওর তিন বান্ধবী শ্রেয়া, রিমা ও কাকলী। পরে সৈকত এসে ওর ব্যাগ খোঁজ করে। প্রশ্নটা করেছিল তানজিনার উদ্দেশেই। ও না বোঝার ভান করে তাকিয়ে থাকে। পরে ব্যাগটা খুঁজে পেয়ে সৈকত রাগ করে চলে যায়। ওরা বান্ধবীরা সবাই মিলে হাসতে থাকে।

ওই ঘটনার পরে কেমন যেন অদৃশ্য শত্রুতা সৃষ্টি হয় সৈকতের সঙ্গে। ওর সঙ্গে আরেক বন্ধু থাকত। আর দুইজন মেয়ে। সবাই দেখতে সুবেশ আর সুদর্শন।

—আমরা আপনার নাম রেখেছিলাম কী, জানেন? হি হি হি... হাসির দমকে কথা শেষ করতে পারে না তানজিনা। ওর মনে হয় অনেকদিন এভাবে হাসেনি ও।

—কী? তানজিনার হাসিতে সংক্রামিত হয়েছে সৈকত নিজেও।

—আপনার নাম রেখেছিলাম মোখলেস...হি হি হি।

—মোখলেস? সৈকত অবাক হয়। কই তোমার সঙ্গে তো আমার অনেকবার কথা হলো তখন তো বলনি এই নামের কথা।

—বলিনি, কারণ তখনো তো আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়ের আড়ষ্টতা সেভাবে কাটেনি। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে থাকতাম আপনার সঙ্গে কথা বলার সময়। পরে নিশ্চয়ই বলতাম। কথাগুলো বলতে বলতে তানজিনা অবাক হয় এই ভেবে যে, এয়ারপোর্টে তেরো বছর পরে একজন মানুষকে দেখার পরে বুঝতে পারছে মনের কত গভীরে ছিল সে।

—এত নাম থাকতে মোখলেস কেন রাখলে? সৈকতকে একটু বোকা বোকা লাগছে।

—না মানে, আপনার নাম তো জানতাম না তখন। কাউকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে একটা নাম দিতে হয়। পুরো বিষয়টা ছিল মজা করার জন্য। তাই ওভাবে নাম দেওয়া। আপনার সঙ্গে ভারী গোঁফওয়ালা আরেকজন ছিল, মনে আছে ? ওর নাম কী দিয়েছিলাম জানেন?

—হ্যাঁ ইশতিয়াক, কী নাম রেখেছিলে ওর?

—মকবুল... হি হি হি... হা হা হা... হাসতে হাসতে তানজিনার চোখে পানি চলে আসে। সৈকত নিজের চেয়ে ওর বন্ধুর নামকরণ শুনে আরো বেশি হাসে। একসময় ওদের হাসি থামে।

—এভাবে অনেকদিন হাসিনি। ইশতিয়াককে বললে ও খুব মজা পাবে। ও ঢাকাতে থাকে। একটা বেসরকারি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

—আমিও ব্যাংকে চাকরি করি। তবে নিউ ইয়র্ক সিটিতে। তানজিনা উত্তর দেয়।

—কাজের চাপ কেমন? সৈকত জানতে চায়।

—খুব কাজের চাপ। দুপুরে লাঞ্চ করার টাইম পাই না।

—কম খেলেই তো ভালো। তাহলে এভাবে স্লিম থাকতে পারবে। জানো তো, নাথিং ইজ সুইটার দ্যান স্লিমিং।

সৈকতের এভাবে হঠাত্ প্রশংসায় মুখে রক্ত জমা হয় তানজিনার। এমনিতে ওর মুখ লালচে। এখন সেই মুখকে নিশ্চয়ই আরো লাল দেখাচ্ছে। একটা লম্বা শার্ট পরেছে ও। সঙ্গে চাপা প্যান্ট। পায়ে সাদা কেডস। দেখতে হালকা-পাতলা তরুণীই মনে হয় তানজিনাকে। ওর দিকে সৈকতের মুগ্ধ দৃষ্টি মনে আবেশ ছড়িয়ে দেয় তানজিনার।

—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়েছ। অনেক বেশি পরিপাটি।

—শুধু আকর্ষণীয়, আবেদনময়ী বললেন না? কোনো ভাবনা ছাড়া হুট করে কথাটা বলে বসে তানজিনা।

সামনে তাকিয়ে দেখে সৈকত গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সঙ্গিনীর মুখে উড়ে আসা চুল সরিয়ে দেয়। সৈকতের দিকে তাকিয়ে সারা শরীরে রক্ত যেন ছোটাছুটি করতে থাকে তানজিনার। একটু পরে টের পায় কোমরের কাছে সৈকতের দুই হাত। ওকে বুকের মধ্যে টেনে নেয় সৈকত। ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনে ঠোঁটে। এমন গভীরভাবে চুমু খায় যে তানজিনার মনে হয় ওর নিজের বলতে কিছু নেই। পুরোটাই বিলীন হয়ে গেছে সৈকতের মধ্যে।

অনেকক্ষণ না অল্পক্ষণ দুজনের কেউই টের পায় না। একসময় এয়ারপোর্টের স্পিকারে নারীকণ্ঠের উচ্চশব্দ শুনতে পায়। নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটের শিডিউল ঘোষণা করা হচ্ছে। সৈকত আস্তে আস্তে সরে গেলে প্রচণ্ড কান্না পায় তানজিনার।

—জানেন, আমি খুব বোকা ছিলাম। যে কারণে ওইদিন টিএসসিতে আপনার কথা শুনতে চাইনি। কত বিপদ গেছে আপনার ওপর দিয়ে। আমি সেদিকটা নিয়ে একদম ভাবিনি। কেবল আমার কথা ভেবেছি। এত বোকা ছিলাম আমি! এত বোকা! এভাবে নিজের জীবনটা নষ্ট করলাম। আপনার ও আমার দুই জনের জীবন এখন দুই দিকে।

শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে তানজিনার গলা ধরে আসে। নিজেকে কেমন নিঃস্ব-রিক্ত মনে হয়। ও নিজেকে সামলাতে পারে না। হু হু করে কাঁদতে থাকে অঝোরে। একসময় মুখ তুলে চোখের পানি মুছে আবার বলতে থাকে।

—আপনি যেদিন টিএসসিতে আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন... কান্নার দমকে কথা থেমে যায় তানজিনার।

—বাদ দাও ওই প্রসঙ্গ। ভাগ্যে যা ছিল তা-ই ঘটেছে। সঙ্গিনীকে থামানোর চেষ্টা করে সৈকত।

—জানেন, বান্ধবীদের বলেছিলাম আপনি আমার সঙ্গে তিন মাস পরে ফিরে কথা বলতে চেয়েছিলেন! ওরা হেসেছে আমার কথা শুনে। কিন্তু ওদের চোখ দেখে বুঝেছি কথাটা বিশ্বাস করেনি কেউই। আমাকে ওরা প্রতারিত প্রেমিকা হিসেবে জেনেছে। আর আপনাকে প্রতারক হিসেবে।

তানজিনা হূদয়ের গভীর গোপন থেকে বের করে আনা হতাশা থেকে কথাগুলো বলে।

প্রথমে তানজিনার কথার উত্তরে কিছু বলতে পারে না সৈকত। ও বুঝতে পারে একটা ভয়ঙ্কর ক্ষত এতদিন বুকে নিয়ে ঘুরছিল তানজিনা। আজ সেখানে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তানজিনার হাতটা নিজের বুকে নেয়। আবার মুখে ছোঁয়ায়।

—আমাদের ভাগ্য আসলে খারাপ। নয়তো কেন আমার জীবনে ওই সময়েই এমন একটি ঘটনা ঘটবে। মাত্র তোমার সঙ্গে পরিচয় হলো, এরমধ্যে বাবার মৃত্যু। শোন, আমি এ বছর বাংলাদেশে যাব। গিয়ে তোমার সব বান্ধবীদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করব। ওদের বলব, আমি প্রতারক নই। আমি তানজিনার সঙ্গে প্রতারণা করিনি। আমাদের ভালোবাসা এখনো আছে। আছে না বলো?

তানজিনা ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে সৈকতের দিকে। জানে না আর কোনোদিন দেখা হবে কি না সেই মুখ।

‘তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,

পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,

মানুষ রবে না আর, রবে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখন

সেই মুখ আর আমি রবো সেই স্বপ্নের ভিতরে।’