মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যে হিজরি সন

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৬

স্বাগতম ১৪৪১ হিজরি সন। ইসলামি জীবন-বিধানে এ হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। এ সনের সঙ্গে মিশে আছে মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আদর্শ। আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সময়ের হিসাব গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যের মাধ্যমে বছরে বারোটি মাস নির্ধারণ করেছেন এবং সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী হিসাব নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন নামে এ বারো মাসের ব্যবহার করে আসছে। বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী যুগে যুগে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি নির্ধারণ করেছে; এর মাঝে উল্লেখযোগ্য : জুলিয় বর্ষপঞ্জি, গ্রেগরয়ি বর্ষপঞ্জি, ইরানীয় বর্ষপঞ্জি, বাইজেন্টাইন বর্ষপঞ্জি, হিজরি বর্ষপঞ্জি, চীনা বর্ষপঞ্জি, কোরীয় বর্ষপঞ্জি, বুদ্ধাব্দ ও মায়া পঞ্জিকা। আল্লাহ তাআলা আল- কোরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে মাসগুলোর সংখ্যা হচ্ছে বারো, যেদিন থেকে তিনি মহাকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, এর মধ্যে চারটি হচ্ছে পবিত্র মাস’ (আল-কোরআন, তাওবা-৩৬)। 

প্রাচীনকাল থেকেই আরবরা চন্দ্র বছর হিসাবে দিন মাস গণনা করত, কিন্তু তাদের কোনো নির্দিষ্ট বর্ষ পঞ্জিকা ছিল না। ফলে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘বর্ষ গণনা’ করা হতো। যেমন আমুল ফীল, আমুর রিমাদাহ, আমুত ত্বাউন, হারবুল ফুজ্জার, আমুল হুযুন ইত্যাদি। এরপর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা) ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ধর্মীয়, প্রশাসন ও আর্থসামাজিক বিভিন্ন কারণে মুসলিম জাতির ‘বর্ষপঞ্জি’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহর (স) হিজরতের গুরুত্ব ও তাত্পর্যকে স্মরণ করে ‘হিজরি সনের’ গোড়াপত্তন করেন। হিজরত একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ত্যাগ করা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করা। ইসলামের ইতিহাসে মক্কায় রাসুল (স) ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের প্রেক্ষিতে ইসলামের প্রচার ও প্রসার করে নতুন জাতি গঠনের জন্য আল্লাহর নির্দেশে রাসুল (স) ও সাহাবাগণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান মক্কা নগরী ত্যাগ করে মদিনায় গমন করেছিলেন, তাই হিজরত। ‘হিজরি সন’ চন্দ্র গণনার ওপর নির্ভরশীল, এর মাসগুলো ২৯ বা ৩০ দিনে পূর্ণ হয়। এ কারণে খ্রিষ্টীয় বর্ষ থেকে হিজরি বর্ষ ১০ বা ১১ দিন কম হয়ে ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে প্রতি বছরের সমাপ্তি ঘটে। হিজরি বর্ষের মাসগুলো খ্রিষ্টীয় বর্ষের বিভিন্ন মাসে পরিভ্রমণ করে এবং এ চক্রটি প্রতি ৩৩ বছরে পুনরাবৃত্তি করে।

আরব জাতি বহু পূর্ব থেকেইে যুদ্ধ-বিগ্রহ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কাবা ঘর নির্মাণ, হজ ও কোরবানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নামে এ মাসগুলোর গণনা করে আসছিল। রাসুল (স) এর জন্মের ১৫০ বছর পূর্বে তার ৫ম পূর্ব পুরুষ ‘ক্বিলাব’ বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ করে এ বারো মাসের নামকরণ করেন। আর তা হলো—

মহররম :হিজরি বছরের ১ম মাস। মহররম অর্থ ‘নিষেধাজ্ঞা’। আরবরা যে কয়েকটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে বিরত থাকত তার মধ্যে মহররম অন্যতম। উক্ত মাস যেহেতু নিষিদ্ধ ও সম্মানিত, তাই উক্ত নামে অভিহিত করা হয়েছে। এ মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা (আ) ও তার অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেন এবং ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে মারেন। ১০ মহররমকে কেন্দ্র মুসলমানগণ রোজাব্রত পালন করে থাকেন। রাসুলুল্লাহ সা. এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা) কারবালা প্রান্তরে এজিদের সৈন্য দ্বারা শহিদ হন এ মাসেরই ১০ তারিখে।

সফর :হিজরি বছরের ২য় মাস। সফর অর্থ খালি বা শূন্য। এ সময়ে আরবরা যুদ্ধ ও সফরের উদ্দেশ্যে নানা স্থানে যেত, তাই এ সময় তাদের ঘরবাড়ি খালি বা শূন্য হয়ে যেত। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এ সময়ে যুদ্ধে পরাজিতদের বাড়িঘরে লুটতরাজ চালানো হতো, ফলে তাদের বাড়িঘর খালি হয়ে যেত এবং আরবরা তাদের বাড়িঘর শূন্য রেখে পালিয়ে যেত।

রবিউল আওয়াল ও রবিউস সানি :হিজরি বছরের ৩য় ও ৪র্থ মাস। ‘রাবীউন’ অর্থ বসন্ত। এ সময় তাদের গবাদি পশুদের চারণভূমিতে স্বাচ্ছন্দ্যে নিয়ে যেত। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, মানবতার মুক্তির দূত শেষ নবি ও রাসুল মুহাম্মদ (স) রবিউল আওয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন।

জামাদিউল আওয়াল ও জামাদিউল আখির বা জামাদিউস সানি: হিজরি বর্ষের ৫ম ও ৬ষ্ঠ মাস। এ সময়টায় মরু আরবের পানি জমে বরফ হয়ে যেত। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এ সময়টা গ্রীষ্মকালীন খরতাপে সব শুষ্ক হয়ে যেত। এ মতপার্থক্যের কারণ হচ্ছে, হিজরি বছর খ্রিষ্টীয় বছরে থেকে কম হওয়া তার মাসগুলো বিভিন্ন ঋতুতে পরিভ্রমণ করে থাকে। 

রজব : হিজরি বর্ষের ৭ম মাস। রজব শব্দটি আরবি ‘তারজীব’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘সম্মান করা’। কারণ এটি সর্বদা একটি পবিত্র সময় হিসেবে বিবেচিত হতো। যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধের চার মাসের মধ্যে  রজব অন্যতম। এ মাসেই মুহাম্মদ (স) মেরাজের  মাধ্যমে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করেন।

শাবান : হিজরি বর্ষের ৮ম মাস। শাবান অর্থ ‘ছড়িয়ে পড়া’। পবিত্র রজব মাসের পর আরবরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত। এ সময় তারা পানির সন্ধানেও বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ত।

রামাদান : এ মহিমান্বিত মাসটি হিজরি বর্ষের ৯ম মাস। রামাদন শব্দটি ‘রামাদা’ শব্দ থেকে উত্পত্তি, এর অর্থ ‘তীব্র গরম’। এ সময় আরব উপদ্বীপে প্রচণ্ড উত্তপ্ত আবহাওয়া আসত। আল কুরআন ও হাদিসে গুরুত্বের সাথে এ মাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এ মাসেই আল-কুরআন নাজিল করেছেন ও মুহাম্মদ (স) নবুওয়্যাত লাভ করেন এবং মুসলমানরা এ মাসে ইসলামের ফরজ বিধান রোজাব্রত পালন করে থাকেন।

শাওয়াল : হিজরি বর্ষের ১০ম মাস। শাওয়াল শব্দটি ‘তাশাওয়াল’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘উঠিয়ে রাখা’। এ সময় আরবের উটনিগুলো গর্ভধারণের ফলে দুর্বল হয়ে যেত এবং তাদের দুধ কমে আসত। আরবদের অন্যতম খাদ্য দুধ-এর দুষ্প্রাপ্যতার কারণে তাদের মন্দ সময় কাটত। একমাস রোজাব্রত পালনের পর আল্লাহ তাআলা এ মাসের প্রথম দিবসকেই মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন নির্ধারণ করেছেন এবং এ মাসে ৬টি রোজা পালনের মাধ্যমে মুসলমানগণ সারাবছর রোজা রাখার সাওয়াব পেয়ে থাকেন।      

জিলক্বাদ:হিজরি বর্ষের ১১তম মাস। জিলক্বাদ শব্দটি ‘ক্বউদ’ শব্দ থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ ‘বিশ্রাম’। আরবদের প্রথা অনুয়ায়ী ‘সম্মানিত ও যুদ্ধ নিষিদ্ধ’ ৪টি মাসের প্রথম মাস এটি। এ সময় তারা যুদ্ধ ও সফর পরিহার করে বাড়িতে বিশ্রাম নিত এবং হজের প্রস্তুতি নিত।

জিলহজ :হিজরি বর্ষের সর্বশেষ ১২তম মাস এটি। আরবরা প্রাচীনকাল থেকেই এ মাসে হজ পালন করত, তাই এ মাসের নাম জিলহজ নির্ধারণ করেছে। এ সময় তারা হজ যাত্রীদের সাহায্য-সহযোগিতা এবং তাদের সাথে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করত। 

লেখক: সিনিয়র লেকচারার, উত্তরা ইউনিভার্সিটি,

পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়