ইবাদতে আত্মনিবেদনের মহিমায় সমুজ্জ্বল হজ-কোরবানি এবং এগুলোর শিক্ষা শাশ্বত ও চিরজাগ্রত। কেননা, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো’ (বাকারা:১৯৬)। তাই হাজি সাহেবানকে মনে রাখতে হবে, তারা আল্লাহর ঘরের মেহমান। তাদের লাখো কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ধ্বনিত হয়েছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক... প্রভু হে আমি উপস্থিত, উপস্থিত!’ তারা আল্লাহর ঘর সামনে রেখে ভবিষ্যতে অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্পে ‘তওবা’ করেছেন। তাই তো হাদিসে আছে, ‘পানি যেমন ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়, হজও তেমন পাপহীন ও পবিত্র করে দেয়’ (বুখারি)। প্রিয়নবী (স) আরো বলেন, ‘... সে নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে’ (বুখারি-মুসলিম)।
যিনি মহান আল্লাহর ঘরের মেহমান, তার ‘হূদ-কাবা’য় বিশ্বপ্রভুর উপস্থিতি চিরজাগ্রত থাকা স্বাভাবিক। হাজি সাহেবান তাদের আচরণ, ইবাদত, লেনদেন— সব ক্ষেত্রে একজন ‘স্বেতশুদ্ধ মনের মানুষ’ হিসেবে সমাজে অভিভাবক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করবেন। হজ একটি মৌলিক ইবাদত, গর্ব করার বিষয় বা পদবি-উপাধি নয়। কেবল নামের আগে ‘আলহাজ’ লেখা হজের উদ্দেশ্য হতে পারে না। অথবা নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়া হজের লক্ষ্য নয়। একজন নামাজি বা রোজাদার যেমন নিজেকে ‘মুসল্লি’ বা ‘সায়িম’ নামে আত্মপ্রচার করেন না, তেমনি ‘হাজি’ নাম ধারণ করা উদ্দেশ্য হলে তা হবে ‘রিয়া’ তথা লোকদেখানোর বিষয়। বরং হাজি সাহেবান সমাজ সংস্কার, জাতি গঠন ও কর্তব্যনিষ্ঠায় নিবেদিতপ্রাণ। যেমন হাজি শরীয়তুল্লাহ, হাজি মোহাম্মদ মুহসীন, হাজি দানেশ প্রমুখ।
প্রিয়-প্রয়োজনীয় ধন-প্রাণ উত্সর্গের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়ার উপায় হিসেবে কোরবানি একটি উচ্চমর্যাদার ইবাদত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি দাও’ (কাওসার :০২)। ভোগবাদিতা, লোকদেখানো, ফ্রিজে সংরক্ষণ করে সারাবছর মেহমানদারি করা কোরবানির শিক্ষাকে ম্লান করে দেয়। বরং ত্যাগ-তাকওয়া (ধর্মভীরুতা) হলো কোরবানির লক্ষ্য। দয়াময় আল্লাহর কতই না অনুগ্রহ, পশুটি উত্সর্গ করা হয় মহান আল্লাহর জন্য, কিন্তু তার স্বাদ ভোগ করে মানুষ এবং তা হয়ে যায় সামাজিক সম্পদ ও সম্প্রীতির বাহন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তা হতে তোমরা নিজেরা খাও এবং ধৈর্যশীল, অভাবী ও মুখাপেক্ষীদের খেতে দাও... আল্লাহর কাছে না তাদের গোশত পৌঁছায়, না তাদের রক্ত; বরং পৌঁছে যায় তোমাদের ধার্মিকতা’ (হজ :৩৬, ৩৭)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘(বল) আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার বেঁচে থাকা, আমার মরে যাওয়া (সবকিছু) আল্লাহর জন্য’ (আন-আম :১৬৩)।
‘ঈদুল আজহা’ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (স) বলেন, ‘উমিরতু বি-ইওয়ামিল আজহা জা’লাল্লাহু ঈদান লি-হাজিহিল উম্মাহ’, অর্থাত্ ‘আমি কোরবানির দিন সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন’ (আবুদাউদ)। এ জন্যই প্রিয় নবীর (স) মোনাজাত ছিল এরকম—‘তাকাব্বালহু মিন্না ওয়া মিন্কা’, অর্থাত্ ‘আল্লাহ যেন তা আপনার ও আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করেন’।
ইসলামের উত্সবগুলোর উদ্দেশ্য ইবাদত ও আত্মনিবেদন। ইসলামের উত্সব হলো ধৈর্য, সংযম ও ত্যাগের পরীক্ষায় সমুজ্জ্বল। শুধু পশু জবাই নয়; বরং পাষবিকতা দমন ও প্রিয় বস্তু প্রিয় প্রাণ উত্সর্গের চেতনা শিক্ষা দেয় কোরবানি। ব্যক্তি-সমাজ তথা জীবনের সব ক্ষেত্রে এ চেতনা জাগিয়ে রাখা একটি সার্বক্ষণিক ইবাদত। নিষ্প্রাণ ও বিবেকের জাগ্রত উপস্থিতিহীন ইবাদত মূল্যহীন।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
