পুকুর খনন ও প্রশিক্ষণে বিদেশ গমন

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৭

আমাদের দেশে প্রায় সব প্রকল্পে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রবণতা লক্ষণীয়। বিদেশি অনুদানে তো বটেই, এমনকি সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পও ইহার ব্যতিক্রম নহে। সার্বিক বিচারে এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিবার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। তবে ইহার মাত্রা নিয়া প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নহে। বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণে কাহারও উদ্দেশ্য যদি হয় একপ্রকার রিক্রিয়েশন বা বিনোদন, তবে ইহা লইয়া কথা উঠিবেই। প্রশ্ন উঠিয়াছে, পুকুর খনন প্রকল্পের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনেও কি বিদেশে গিয়া প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে? যে ১৬ জন কর্মকর্তা এইরূপ প্রশিক্ষণে বিদেশ যাইবেন, তাহারা ‘পুকুর পুনঃখনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচে ব্যবহার’ শীর্ষক প্রকল্পের কর্মকর্তা। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করিতেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। ৪২ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পে খরচ হইবে ১২৮ কোটি ১৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। তন্মধ্যে প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় হইবে ১ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা। প্রশিক্ষণের জন্য যে ব্যয় ধরা হইয়াছে তাহা খুব বেশি নহে। তাহার পরও ইহা লইয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঠিকই ঝড় উঠিয়াছে।

আমরা জানি, সেচযন্ত্রের কারণে আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নামিয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া উত্তরাঞ্চলে এই ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়িতেছে। সেইখানে সারফেস ওয়াটার বা ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার কথা আমরা একাধিকবার বলিয়াছি। সেই দিক হইতে এই প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা নিয়া কাহারো কোনো দ্বিমত থাকিবার কথা নহে। কেননা ইহার লক্ষ্যই হইতেছে—এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুকুর ও দিঘি পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ও ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ করা, যাহাতে ৩ হাজার ৫৮ হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ করা যায়। ইহার মাধ্যমে ৭১৫টি পুকুর পুনঃখনন, ১০টি দিঘি পুনঃখনন, ৮৫টি সৌরশক্তিচালিত লো-লিফট পাম্প (এলএলপি) স্থাপন, ৮০টি ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ৮৫টি প্রিপেইড মিটার ক্রয়, ৯ হাজার মিটার ফিতা পাইপ ক্রয় ছাড়াও ১ লক্ষ ৫০ হাজারটি বৃক্ষ রোপণ করা হইবে। আর এইসব কার্যক্রমের দক্ষতা অর্জন করিতেই দুই ধাপে মোট ১৬ জনকে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তাব রাখা হইয়াছে প্রকল্পের ডিপিপিতে। এখানেই দেখা দিয়াছে প্রশ্ন।

উপর্যুক্ত ব্যাপারে খোদ পরিকল্পনামন্ত্রীই বলিয়াছেন যে, অনেক সময় পানি, মাটি ও সেচের বিষয়ে পরিবেশগত বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের জন্য বাহিরের দেশের অভিজ্ঞতা নেওয়ার প্রয়োজন রহিয়াছে। সাধারণত বিদেশে প্রশিক্ষণের বড়ো একটা উদ্দেশ্য থাকে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়। আর অনেক সময় দেখা যায়, নদীভাঙনের মতো পুকুরভাঙনও আমাদের সর্বনাশ ডাকিয়া আনে। সুতরাং এইক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা যে একেবারে নাই, তাহা বলা যায় না। তবে ইহারও একটি সীমারেখা থাকা উচিত। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থের যাহাতে কোনো প্রকার অপচয়-অপব্যয় না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন একনেক সভায় এই ব্যাপারে একাধিকবার নির্দেশনা দিয়াছেন। এইক্ষেত্রে একটি কথা বলা আবশ্যক—যাহারা প্রশিক্ষণ লাভ করেন, বা করিবেন তাহারা যেন সংশ্লিষ্ট অফিসে কয়েক বত্সর কাজ করিতে পারেন। তাহাদের হুট করিয়া অন্যত্র বদলি করা হইলে বিদেশে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতাই বৃথা যাইবে।