আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আলোচনা

ওরা স্বজনদের ফিরে পেতে চায়

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৯, ২১:৪৮

বাবার জন্য কাঁদছে সন্তান, সন্তানের জন্য কাঁদছেন মা। স্বামীর জন্য স্ত্রী কাঁদছেন, ভাইয়ের জন্য ভাই। কারো আপনজন কয়েক বছর আগে, কারো-বা হারিয়েছে কয়েক মাস হলো। নিখোঁজ মানুষগুলোর জন্য পরিবারের সদস্যদের শুধু কান্না আর কান্না। এছাড়া আর যেন কোনো উপায় নেই তাদের। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো মানবতার মা। আপনি কি আমাদের কান্না শুনতে পান না? কারো প্রতি আমাদের কোনো অনুযোগ, অভিযোগ নেই। শুধু পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে দিন।’ গুম হওয়া স্বজনদের ফিরে পেতে সরকারের কাছে এভাবেই গতকাল শুক্রবার আকুতি জানান তাদের পরিবারের সদস্যরা। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবে গুম হওয়া পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজিত ‘মায়ের ডাক’ প্রতিবাদী সমাবেশে স্বজনেরা এ ধরনের আকুতি জানান। এতে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল ‘মায়ের ডাক’-এর সভানেত্রী এবং ২০১৩ সালে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা বেগমের। কিন্তু তিনি অসুস্থ থাকায় সুমনের বড়ো বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে প্রত্যেক মা ও তাদের স্বজনেরা গুম হওয়া সদস্যদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মঞ্চের  সামনে  আগত ছোটো ছোটো শিশুরা তাদের বাবার ছবি তুলে ধরে। এতে লেখা ছিল, ‘শুধু বাবাকে ফিরে পেতে চাই’। অনুষ্ঠানে মায়েদের বুক ফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে যায় প্রেসক্লাবের হলরুম। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতির পরিবর্তে কান্নার রোল পড়ে যায় হলরুমে। অনুষ্ঠানে দেশে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান করতে একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের উদ্যোগের দাবি জানায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

২০১৩ সালে ঢাকার নাখালপড়া এলাকা থেকে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বিষয়ে তার বড়ো বোন মারুফা ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এমনই দুর্ভাগ্য যে, প্রায় পাঁচ বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও আমার ভাইকে ফিরে পেলাম না। ওর সন্তানের মুখের দিকে আমরা তাকাতে পারি না। নিষ্পাপ মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, র্যাব, সিআইডি, মানবাধিকার কমিশনে ঘরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কিন্তু কেউ আমাদের সুমনের সন্ধান দিতে পারেনি। সুমন যখন গুম হয়, তখন তার মেয়ে আরওয়ার বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। এখন আরওয়ার বয়স আট বছর। এখন প্রতিমুহূর্তে বাবাকে খোঁজে এই শিশু।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ২০১৩ সালের ২৬ এপ্রিল গুম হওয়া রনি হোসেনের মা আঞ্জুমান আরা বেগম, ২০১৫ সালের ২১ আগস্ট গুম হওয়া সাজ্জাদ হোসেনের মা সাজেদা বেগম, ২০১৯ সালের ১৯ জুন গুম হওয়া ইসমাঈল হোসেনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার এবং সাতক্ষীরা এলাকার গুম হওয়া মোখলেসুরের পিতা আব্দুর রশিদ ও বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর ছেলে আবরার ইলিয়াস, সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আঁখি, নিখোঁজ তপুর মা সালেহা বেগম, পিন্টুর বোন মুন্নী, পারভেজ হোসেনের শিশুকন্যা হূদী, নিখোঁজ গাড়িচালক কাওসারের মেয়ে লামিয়া, যশোরের মোহন মিয়ার বাবা জামশেদ, সুজনের ভাই শাকিলসহ অন্যরা।

রাজধানীর রামপুরা থেকে নিখোঁজ ছাত্রলীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন তপুর মা সালেহা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে তিন বছর সাত মাস ধরে নিখোঁজ। যুবলীগের স্থানীয় নেতারা প্রশাসনকে দিয়ে আমার ছেলেকে গুম করে। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে হাজারো মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গেছি। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু আজো আমি আমার ছেলেকে ফিরে পাইনি। আর কত দিন আমি ছেলের অপেক্ষায় থাকব?’

অনুষ্ঠানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিটি গুমের বিষয়ে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী জানেন। তার অজানা কোনো গুম নেই। একটা গুমও আল্লাহ করেননি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, দেশের প্রতিটি গুমের সঙ্গে সরকার জড়িত। পরিবারগুলোর বর্ণনা দেওয়ামতে, প্রতিটি গুমের সময়ে সরকারি গাড়ি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাকে বা তাদের গাড়ি ব্যবহার হলো কীভাবে?

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কান্নায় এই সরকারের হূদয় নড়েও না, গলেও না।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড সাইফুল হক বলেন, এখানে মায়েদের, স্ত্রীদের, শিশুদের যে আর্তনাদ, তাতে কারো সুস্থ থাকা সত্যিই কঠিন। এখানে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা যদি আজকের এই কর্মসূচি রেকর্ড করে থাকেন, ভিডিও করে থাকেন, তাহলে দয়া করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন। কারণ তিনি প্রায়শই বলে থাকেন, স্বজন হারানোর  বেদনা তিনি বোঝেন।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, পাহাড়ে-সমতলে আজ স্বজন হারানোদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তাদের গুম করার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া, যাতে কেউ ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারে।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক আকমল হোসেন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, মানবাধিকারকর্মী ফরিদা আক্তার, মানবাধিকারকর্মী নাসির উদ্দিন প্রমুখ।