আজ আন্তর্জাতিক
দুর্নীতিবিরোধী দিবস
g সাইফুল ইসলাম জুয়েল
দুর্নীতি কী? দূরের যে নীতি, তাকেই দুর্নীতি বলা হয়।
নাকি, যে কাজে বা কর্মে নীতিকে বহু দূরে সরিয়ে রাখতে হয়, তাকেই দুর্নীতি বলা হয়?
দুর্নীতির সংজ্ঞা প্রদান আমার এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য নয়। তবে, দুর্নীতি প্রসঙ্গে দু-চার লাইন লেখাই আমার জন্য দুঃসাহস বটে।
অনেকক্ষণ ধরে আমরা পাঁচজন চুপচাপ বসে আছি। আমি, রবার্ট, বল্টু, হিটলু আর গুপ্তদা। গুপ্তদা ভীষণ চিন্তিত। ভীষণ।
এক পর্যায়ে বল্টু তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘মন খারাপ কেন গুপ্তদা?’
গুপ্তদা আফসোসের সুরে একটা জোকস বললেন, ‘ছেলে অঙ্ক পরীক্ষার রেজাল্ট জেনে বাড়ি এসেছে স্কুল থেকে। মা জিজ্ঞেস করলেন, কত পেয়েছিস?’
—মাত্র একের জন্য এক শ পাইনি।
—তাই নাকি, নিরানব্বই পেয়েছিস?
—না, দুটো শূন্য পেয়েছি!’
জোকসটা বলার পরে গুপ্তদা বললেন, ‘এবার এটাকে রিভার্স কর। মানে উল্টো করে বোঝার চেষ্টা কর।’
বল্টু এত ভাবাভাবির মধ্যে গেল না। বলল, ‘তুমিই বল?’
‘বেশ তো বলছি। তার আগে বল, আমাদের দেশে কি দুর্নীতি হয়?’
‘হরহামেশাই হয়। কয়েক বছর আগেও তো আমরা হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন ছিলাম।’
‘এখন আমাদের দুর্নীতি কি শূন্যে নেমে এসেছে?’
‘না।’
‘দুর্নীতি কি একে নেমে এসেছে?’
‘না।’
‘তাহলে?’
‘আগে যেসব জায়গায় দুর্নীতি হতো, সেখানে এখনো হচ্ছে। এক শ ভাগ।’
‘বিষয়টা কিন্তু এখানেই। এক শ ভাগ দুর্নীতি হলেও, আমরা ‘১০০’ দেখতে পাচ্ছি না। দেখতে পাচ্ছি ‘১’ কিংবা জোড়া শূন্য (০০)।’
এবার রবার্ট মুখ খুলল, ‘সমস্যা হলো—আমরা এখন দুর্নীতির সাথে এমনভাবে মিশে গেছি যে, কোনটা নীতি আর কোনটা দুর্নীতি, তার প্রভেদ করতে পারছি না।’
গুপ্তদা বললেন, ‘তাহলে তোদের আরেকটা জোকস শোনাই।
মা :খোকা জানো না সিগারেট তোমার শত্রু।
খোকা :তাই তো ওটাকে পুড়িয়ে ফেলছি মা। জানো তো শত্রুর শেষ রাখতে নেই।’
হিটলু বলল, ‘ওর এই কথার সাথে তোমার জোকসের কানেকশনটা কই গুপ্তদা?’
গুপ্তদা হেসে বললেন, ‘আছে রে। জোকসটাকে মোডিফাই কর। ধর, এক যুবক সদ্য চাকরিতে ঢুকেই ঘুষ খাওয়া শুরু করে দিয়েছে।’
‘তারপর?’
‘যুবকটির মা বললেন, খোকা, ঘুষ খেতে নেই। জানো তো ‘ঘুষ’ মানুষের শত্রু।
তা শুনে যুবকটি হেসে বলল, সে জন্যই তো মা ওটাকে খেয়ে ফেলছি! বনে কিন্তু একটাই নীতি—শত্রুর শেষ রাখতে নেই। তাকে খেয়ে ফেলো। সেটাই আমি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছি।’
বল্টু বলল, ‘তাহলে কি সবাই শুধু দুর্নীতিই করে যাবে? এর থেকে উত্তোরণ সম্ভব নয়?’
‘আরেকটা জোকস শোন তাহলে...’ গুপ্তদাকে আজ বোধহয় জোকসে পেয়েছে। তিনি বলতে লাগলেন, ‘গ্রামের এক স্কুল পরিদর্শন করতে গেলেন এক পরিদর্শক। ক্লাসে ঢুকে এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো তো সোমনাথ মন্দির কে ভেঙেছে?
ছাত্র বলল, আমি ভাঙিনি স্যার।
পরিদর্শক রেগে শ্রেণি শিক্ষককে বললেন, আপনার ছাত্র এসব কী বলছে!
শিক্ষক নরম গলায় বললেন, স্যার, আমি জানি ও মন্দির ভাঙার মতো ছেলে না।
পরিদর্শক ক্লাস ছেড়ে প্রধান শিক্ষকের রুমে গেলেন।
—আপনার ছাত্র-শিক্ষক এসব কী বলছে? সোমনাথ মন্দির নাকি তারা ভাঙেনি!
প্রধান শিক্ষক বললেন, জি স্যার, আমি জানি, আমার ছাত্র-শিক্ষক এমন কোনো কাজ করেনি!
পরিদর্শক ফিরে গিয়ে ওই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীকে বিস্তারিত জানিয়ে ওই স্কুল বাতিল করার জন্য সুপারিশ করলেন। মন্ত্রী সব শুনে বললেন, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। টাকা নিয়ে যান। নতুন করে একটা বানিয়ে দিন।’
‘এবার এটা ব্যাখ্যা করো।’ হিটলু বলল।
‘সবাই-ই যে দুর্নীতি করে তা কিন্তু নয়। কিন্তু যখন দুর্নীতির প্রশ্ন ওঠে, সকলেই বলে যে সে দুর্নীতি করে না। দুর্নীতি করলেও না, আর না করলে তো নাই। যারা দুর্নীতি করে, তারা এই ব্যাপারটাতে চুপ করে থাকে। যারা করে না তারাও। আরে ভাই, আপনি দুর্নীতি করেন না ভালো কথা, তাই বলে কি আপনি চুপ করে থাকবেন? অপরের দুর্নীতির খবর রাখবেন না? আপনার উচিত তাকে সেখানেই খামিয়ে দেওয়া, নিরুত্সাহিত করে কিংবা আইনের আশ্রয় নিয়ে। কিন্তু আমাদের দেশে সকলেই ওই ‘আমি করিনি’-তেই শেষ। আর এগোয় না।’
‘ভালো বলেছ গুপ্তদা।’ রবার্ট বলল। ‘তাহলে কি দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব নয়?
‘সম্ভব, কিন্তু...’
‘আবার কিন্তু কী?’
‘বলছি। তাহলে আরেকটা জোকস শোন।
গ্রামে বেড়াতে গিয়ে এক টুরিস্টের সুন্দর একটা নদী দেখে গোছল করার ইচ্ছা হলো। কাছে-পিঠে এক স্থানীয় লোককে বসে থাকতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা ভাই, এই নদীতে নামতে পারি? কুমিরের ভয় নেই তো?
স্থানীয় লোকটা বলল, নিশ্চিন্তে নামুন। এখন আর কুমিরের ভয় নেই।
টুরিস্ট গলা পানিতে নামার পর সেই স্থানীয় লোকটা বিড়বিড় করে বলল, গত দু বছরে সবগুলো এই নদীর সবগুলা কুমির হাঙরে খেয়ে ফেলেছে!
টুরিস্টের তখন কী দশা হয়েছিল একবার চিন্তা করে দেখ।’
বল্টু বলল, ‘কী আর দশা হবে। তাকে কুমিরের বদলে হাঙরের পেটে যেতে হয়েছে!’
‘নারে। কারোর পেটেই যেতে হয়নি। কুমিরগুলোকে তো হাঙরে খেয়ে ফেলেছে। আর হাঙরগুলোর ছিল ‘মানুষ’ খাওয়াতে অরুচি। সে তখন ধরে ধরে কুমিরই খেতো, মানুষ না।’
‘ধুরো! কী যে বলো না!’ রবার্ট ব্যাপারটা মেনে নিতে পারল না। ‘হাঙরের আবার রুচি-অরুচি!’
গুপ্তদা মুচকি হেসে বললেন, ‘আমরা ওই কুমির আর হাঙর, আর টুরিস্ট—এদের তিন জনের মতোই। প্রথমে ছোট ছোট দুর্নীতি করি। তারপরে ধরি বড়টা। যখন ওর মাঝে নিমজ্জিত হয়ে যাই, তখন আর ওঠার সুযোগ থাকে না। একমাত্র যদি কখনো আমাদের দুর্নীতিতে অরুচি ধরে, তখন আমরা দুর্নীতি ছেড়ে নীতির পথে আসব।’
এতক্ষণ ধরে ওদের কথা শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। ভাবলাম, দুর্নীতি প্রসঙ্গ থেকে বের হতে পারলে বাঁচি। এখন নির্বাচনের মৌসুম। এ নিয়ে গুপ্তদা’র ভাবনা জানা দরকার। তাই প্রসঙ্গ ঘোরাতে বললাম, ‘গুপ্তদা, তোমার নির্বাচন ভাবনা বলো।’
গুপ্তদা বললেন, ‘নির্বাচনের সময় এলে কিছু কিছু খবরে হাসি চেপে রাখতে পারি না।’
‘যেমন?’
‘একজন প্রার্থী নাকি প্রথমে দলীয় মনোনয়ন পাননি। পরে কলাগাছ কেটে রাস্তার পুতে রেখে পেয়ে যান। আরেকজন প্রতীক বরাদ্দের আগেই পোস্টার ছাপতে শুরু করেছেন।’
আমি বললাম, ‘তবে যাই বলো না কেন, একদিক থেকে আমাদের নেতারা কিন্তু খুব ভালো আছেন। তারা কেউ দুর্নীতি করছেন না। এখনো স্ত্রীর দেওয়া গাড়িতে, কিংবা স্ত্রীর কেনা বাড়িতে, শ্যালক-শ্যালিকার দেওয়া উপহারের টাকায় চলছেন!’
গুপ্তদা বললেন, ‘মিথ্যা বলতেও হিম্মত লাগে। আমাদের নেতারা বোধহয় সত্যিকার অর্থেই কোনো দুর্নীতি করেন না। করলে নির্বাচন এলে তাদের হলফনামায় তারা হলফ করে এত এত মিথ্যা লিখতে পারতেন না।’
আবারও দুর্নীতি! একটু বেশিই বিরক্ত হলাম। রেগে গিয়ে বললাম, ‘পজিটিভ কিছু বলো গুপ্তদা। খারাপ শুনতে শুনতে কান পচে যাবার দশা!’
গুপ্তদা মুচকি হেসে বললেন, ‘দেশে এখন পর্যন্ত দুর্নীতির দায়ে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পদত্যাগ করেছেন—আমার জানামতে এমন নজির নাই। অথচ, উন্নত দেশে এমনটা আকছারই ঘটে থাকে। এতে প্রমাণিত হয়—আমাদের রাজনীতিবিদরা কোনো দুর্নীতিই করেন না!’
আমরা থ! g
