হিরু ও কাকের গল্প

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৩৪

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

(গত সংখ্যার পর থেকে)

 

হিরু ফের বলল, ‘তোরা যদি কাকদের সম্পর্কে জানতিস, তাহলে এই কথা ভুলেও তোমাদের মাথায় আসত না। তাহলে শোন...’ হিরু তোতা চাকলাদারকে আরেক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বলা শুরু করল, ‘গণিতবিদ পিথাগোরাসের নাম শুনেছিস নিশ্চয়ই?’

‘হ্যাঁ। হাইস্কুলে পড়েছিলাম। ত্রিভুজের সূত্র। লম্ব স্কয়ার প্লাস ভূমি স্কয়ার সমান অতিভুজ স্কয়ার, আজও ভুলিনি।’

‘কাকেরা কিন্তু জ্ঞান-গরিমায় বিজ্ঞানী-গণিতবিদদের থেকেও কম যায় না। পিথাগোরাসের সূত্র একেবারে ঠোঁটস্থ তাদের।’

কেউ কোনো প্রত্যুত্তর না করে হিরুর কথা শুনতে লাগল।

‘কাকেরা এই পিথাগোরাসের সূত্র মেনেই গাছের ডালে বসে মানুষের উপরে ইয়ে ছাড়ে!’

উপস্থিত সকলের মুখ হা হয়ে গেল। ভাগ্যিস কেউ উপরে তাকিয়ে নেই। তাহলে হয়তো এই ‘হা’ হওয়া মুখে ততক্ষণে কোনো না কোনো কাক হাগু করে দিত!

‘তোদেরকে তাহলে গোড়া থেকেই খুলে বলছি। রম্য লেখকরা যতই বলুক, এই দেশে কবি আর পাগলের সংখ্যা কাকের চেয়ে বেশি! কাকশুমারি হলে তখন তারা তাদের কথা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। কয়েক বছর আগেও হয়তো তারা ঠিক ছিল, কিন্তু এখন আর নয়। কাকদের মধ্যে তো আর ‘দুটির বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ এমন কোনো ব্যাপার-স্যাপার নেই। তাই তারা ব্যাপকমাত্রায় উত্পাদনে নজর দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—যে করেই হোক কবি আর পাগলের চেয়ে নিজেদের সংখ্যালঘু রাখা চলবে না। এখন তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়েছে।’ একটু থেমে আবার বলতে লাগল, ‘যদিও অনেকে বলছে, আমাদের দেশে যেকোনো নির্বাচন এলে কিছু ‘বসন্তের কোকিল’ প্রার্থীর দেখা মেলে। তারা ব্যাপক শো-অফ করে মনোনয়নপত্র কেনে। পোস্টার দিয়ে গাছ-গাছালি, আনাচে-কানাচে, ডাস্টবিন ভরিয়ে ফেলে, তাদের সংখ্যা নাকি কাকদের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে! এটা কাকদের ভীষণ ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।’

‘হিরু ভাই, এসব কথা তুমি জানলে কী করে? নাকি গুল মারছ?’

হিরু পাত্তা না দিয়ে বলতে লাগল, ‘কয়েকদিন আগে আমার সাথে কয়েকটি কাকের বেশ খাতির জমে। তারাই এসব কথা বলেছে আমাকে।’

অন্যরা এবার ধরেই নিলো হিরু নিশ্চিত চাপা পেটাচ্ছে!

‘আসল ঘটনা শোন তাহলে...’, হিরু কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে বলতে লাগল, ‘একদিন তোদের ওই ক্রো-রোড দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। প্রতিদিনই তো যাই। সে যাকগে, ওইদিন আমার সামনে-পেছনে ধুপধাপ কয়েকটি কাকের ইয়ে পড়ল। মনে হলো কাকের ইয়ে বৃষ্টি হচ্ছে! ‘কোনো লাভ নাই!’ কথাটা হয়তো একটু উচ্চৈঃস্বরে বলে ফেলেছিলাম আমি।

তখন উপর থেকে আওয়াজ এলো, আপনি কীভাবে পারেন ম্যান?’

‘উপরে তাকিয়ে দেখি—বিশ্বাস করবি না—এক কুড়ি কাক। ওরা সম্মিলিতভাবে টার্গেট করেছিল আমাকে। কিন্তু ব্যর্থ। বিষয়টা ভেবে মনে দারুণ পুলক অনুভব করছিলাম। কাক যে আমাদের ভাষায় কথা বলছে—তাতে আর মোটেও আশ্চর্যান্বিত হলাম না তখন।

জবাব দিলাম, ‘তোমারা যেভাবে পার, সেভাবেই।’

ওরা অবাক। বলল, ‘মানে সেই পিথাগোরাস?’

আমি মুচকি হেসে মাথা উপর-নিচ করলাম শুধু।

ওরা এবার মাথার উপরে না থেকে আমার চোখ বরাবর কয়েকটা ডালে নেমে এলো। ‘বস, জানেন—সেই কবে থেকে আপনি আমাদের টার্গেটে আছেন? এই এলাকার সমস্ত লোকজন কাবু হয়েছে। কেবল আপনি ছাড়া।’

আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ, জানি।’

‘আপনি জানেন! কীভাবে বস?’

‘তোমরা যে প্রত্যেককেই তোমাদের লক্ষ্যবস্তু বানাবে এতে আর ভিন্ন কী! বিশেষ করে—যখন মানুষজন ভালো পোশাক-আশাক পরে ইন্টারভিউ বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিবর্গের সাথে দেখা করতে যায়, তখনই যেন চোখ বড় হয়ে যায় তোমাদের। তারপর যখন টার্গেট পূরণ হয়, উত্সবের আনন্দ করো তোমরা। কী, ঠিক বলেছি তো?’

কাকগুলো সব নির্বাক। অনেকক্ষণ পরে বলল, ‘আপনি আসলেই বস, বস।’

‘বাদ দাও তো। এখন তোমাদের কথা বলো। কেমন আছ সবাই। কেমন চলছে দিনকাল?’

কালগুলো তখন আমাকে তাদের মনের সমস্ত কথা খুলে বলল। ওরা বলল, ‘মানুষজনের ওপর আমরা বিনা কারণে ক্ষেপে নেই, বস। ওদের কারণে পৃথিবী বিরূপ আচরণ করছে। ওরা ভাবছে, দেশের সমস্ত ডাস্টবিন বাসি-পচা খাবার, মনুষ্য ভ্রূণ ইত্যাদি দিয়ে ভরিয়ে রাখলেই বুঝি হলো। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আমাদের খাবারের অভাব থাকবে না। কিন্তু ওদের ধারণা ভুল। পৃথিবীর এই বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাব থেকে কি আমরা মুক্ত? আমাদের অস্তিত্বও যে হুমকির মুখে। দেখো না—দেশে-দেশে যুদ্ধ-বিগ্রহে লাশের সংখ্যা বাড়লেও আমাদের জ্ঞাতি ভাই শকুনেরা পর্যন্ত আজ বিলুপ্তির পথে। সব তো মানুষের কারণেই হচ্ছে, নাকি? তাই মানুষের ওপরে প্রতিশোধ নিতেই আমরা এই আকামটা করি।’’

‘আকাম! ওরা স্বীকার করেছে কথাটা?’ হিরুর সারগেদরা ফুর্তিতে প্রায় চিত্কার করে উঠল।

‘হ্যাঁ। ওরা তো আর মানুষ না। তাই ভালো-মন্দ সহজেই স্বীকার করে। এখন চলিরে।’

‘চলি মানে?’ অন্যরা চেঁচিয়ে উঠল। ‘তোমার গল্প এখনো শেষ হয়নি। পুরোটা বলে যাও।’

‘শেষেরটা অবশ্য নিতে পারবি না তোরা।’

‘কেন?’

‘কাকেরা বলেছিল—এখন থেকে ওরা কেবল এদেশের সকল খারাপ রাজনীতিবিদদের টার্গেট করবে। অন্যদেরকে ছাড় দেবে।’

‘সে তো ভালো কথা।’

‘উহু। মোটেও ভালো কথা নয়।’

‘কেন?’

‘আমি ওদের যে কথাটা বলেছিলাম, তোদেরকেও সেটাই বলছি—কাকেরা যদি কেবল খারাপ রাজনীতিবিদদেরই টার্গেট করে, তাহলে তারাও কাকদেরকে টার্গেট করতে বেশি দেরি করবে না। কাকদেরকে নির্বংশ করে তবেই ক্ষান্ত দেবে। তারচেয়ে বরং সবকিছু যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলুক না।’

‘যেভাবে চলছে মানে! এই যে আমরা আপনাকেও টার্গেট করছি, যদিও ব্যর্থ হচ্ছি, এই টার্গেট রেখে চলাটাও অব্যাহত থাকবে?’ কাকেরা জিজ্ঞেস করেছিল আমায়।’

‘তুমি কী বলেছিলে হিরু ভাই?’ চাকলাদার জানতে চাইল। তার টাক মাথায় কাক একবার ইয়ে করেছিল। তারপর থেকে সে আর দোকানের বাইরে বেরোতে চায় না। প্রয়োজন হলে ছাতা ব্যবহার করে।

হিরু বলল, ‘ওদেরকে আবারও আগের কথাটাই বললাম। মানে—যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলুক। তাতে আমি কি আমার (হবু) বউ! তবে, আসল কথাটা ওদেরকে বলিনি সেদিন। তাহলে যে ওরা ভীষণ মন খারাপ করত!’

‘কী সেটা?’ অন্যরা জানতে চাইলো।

‘আমরা আমজনতা বলেই কাকেরা আমাদেরকে সহজ টার্গেট বানায়। রাজনীতিবিদরা তো আর আমাদের মতো হেঁটে বেড়ায় না। তারা সর্বদা এয়ার-কন্ডিশনড গাড়িতেই চলে।’

‘তা বটে।’

‘তবে ওদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ এসেছিল।’

‘কী সেটা?’

‘এখন নির্বাচনের মৌসুম না? এখন তো নেতারা হেঁটে হেঁটেই জনগণের দ্বারে দ্বারে যাবে!’

‘আসলেই তো। এখনই কাকদের বড় সুযোগ।’ অন্যরা উচ্ছ্বাসিত হলো। ‘ওরা কী বলল?’

‘তা আমি কি জানি! আমি কেবল ওদের বলেছি—যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলুক! এই চলার ভেতর-বাইরটা কিরূপ, তা কি আমার জানা নাকি?’

‘আচ্ছা, হিরু ভাই—তুমি কীভাবে ওদের ইয়ের হাত থেকে রক্ষ পাও, বলো তো? তুমিও পিথাগোরাস মানো, ওরাও মানে। তাহলে?’

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘ভাবছিলাম—এই প্রশ্নটা তোরা এখনো কেন করছিস না। একটা কথা বল তো—কাকদের ইয়ে কি সবসময় টার্গেটে পড়ে?’

‘না।’

‘কেন পড়ে না?’

‘ওভাবে তো ভেবে দেখিনি কখনো।’

‘আমি ভেবেছি। বলছি শোন—ওরা প্রথমে একটা পয়েন্ট ঠিক করে। আমরা সেই পয়েন্ট থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকতে কাকেরা ইয়ে ছাড়ে। আমাদের ওই পয়েন্ট পর্যন্ত আসা আর ওদের ইয়ে নিচে পড়ার সময় যদি মিলে যায়...’

‘তাহলেই ক্ল্যাশ অব ক্লান্স!’

‘আর যদি না মিলে?’

‘তাহলে টার্গেট মিস হবে।’

‘ঠিক তাই। আমি ওই সময়টাতে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিই বা কমিয়ে দিই।’

‘বাহ।’

‘আরও গোটা দুয়েক ব্যাপার আছে। এরমধ্যে একটা হলো—বাতাস। কোনো পদার্থ উপর থেকে নিচে পড়ে, তখন বাতাস যেদিকে প্রবাহিত হয়, পদার্থটাও সেদিকে সরে যায়। চলার সময় আমি এই বাতাসের বিষয়টাও মাথায় রাখি।’

‘আর দ্বিতীয়টা?’

‘কোষ্ঠ্যকাঠিন্য! আচ্ছা, এখন চলি রে।’ হিরু উঠে চলে গেল।

কাকেরাও কোষ্ঠ্যকাঠিন্যে ভোগে! অন্যসময় হলে সবাই হাসতে হাসতেই খিদে লাগিয়ে ফেলত। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা নিবিড় ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে! আসলে, তারা সকলেই দ্বিধায় ভুগছে—কাকদের এই হাগু করার ব্যাপারটিকে তারা মেনে নিবে, নাকি নেবে না!

ঠিক তখন অদূরে কয়েকটা কাক ‘কা-কা’ রব তুলল। যেন তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে!

‘কাকগুলো যে সারাদিন এত ডাকাডাকি করে, এর পিছনে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য ব্যাপারটা জড়িয়ে নেই তো?’ প্রশ্নটা অনেকের মাথায়ই এলো।

‘হিরুকে জিজ্ঞেস করতে হবে।’ এই ভেবে তারা চাকলাদারকে হাঁক ছেড়ে চা চাইল। সামনে নির্বাচন। এখন গরমাগরম চা না হলে কি জমে! তাদের আফসোস একটাই—আজকের চায়ের বিলটা হিরুর ঘাড়ে চাপানো গেল না!    g