বিশ্বজয়ী ‘উভচর’ স্কুল

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:১৪

স্থাপত্যের সবচেয়ে প্রাচীন সম্মানজনক পুরস্কার ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্টিটেকচার ২০১৯’ পেয়েছে বাংলাদেশের একটি স্কুল। কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরে অবস্থিত খুবই সাধারণ কাঁচামাল দিয়ে নিপুণভাবে গড়া এই স্কুল। বাঁশ, দড়ি আর ড্রাম ছাড়া অন্যকিছু ব্যবহার করা হয়নি স্থাপনাটিতে। মজার বিষয় হলো স্কুলটি যেকোনো সময় জল বা স্থলে ইচ্ছেমতো স্থানান্তর করা যায়।

 স্কুলটি নিয়েই ভিন্নচোখে’র আজকের আয়োজন—

 

নুরুল করিম

 

বছরের ৫ মাস পানিতে ভাসে, বাকি সময় স্থলে। বাঁশ, দড়ি আর ড্রাম দিয়ে তৈরি পুরো স্কুল। খুবই সাধারণ কাঁচামাল দিয়ে নিপুণভাবে গড়া এই স্কুলটি পেয়েছে স্থাপত্যের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্টিটেকচার ২০১৯’। এরপর শুধুমাত্র দেখার জন্যই অনেকে ভিড় করছেন ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে। কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরে পড়েছে স্কুলটি। ধলেশ্বরী নদীর তীরের বাসিন্দারা ‘বাঁশের স্কুল’ নামেই চেনেন।

ইটের ভাটা পেরিয়ে একটু এগুলেই চোখে পড়ে ‘আর্কেডিয়া অ্যাডুকেশন প্রজেক্ট’ নামের স্কুলটি। দূর থেকে মনে হলো বাঁশের স্কুলটির চারপাশে সমতল সবুজ মাঠ। কিন্তু স্কুলের একেবারে কাছে যেতেই সেই ভুলটি ভাঙলো! এখনো স্কুলটি ভাসছে, পানিতে কচুরিপানা হওয়ায় এমনটা মনে হয়। বিশ্বজয়ী এই স্থাপনায় প্রবেশ করতেই স্বাগতম জানালেন প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন বিভাগের মো. আব্দুস সালাম। একে একে দেখাতে লাগলেন স্কুলটির অংশগুলো। ততক্ষণে বেঁধে ফেললাম গল্পের ঝুলি।

 

উভচর স্কুলটির নির্মাণের গল্প

উভচর স্কুলের স্থপতি সাইফ উল হক। তিনি সমাজকর্মী রাজিয়া আলমের স্বপ্ন বুনন করেছেন বাঁশ ও দড়ির মাধ্যমে। স্কুলটির এই প্রতিষ্ঠাতা চেয়েছিলেন এলাকার হতদরিদ্র ও যারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত তাদের পাশে দাঁড়াতে। রাজিয়া আলম বলেন, ‘আমি চেয়েছি সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কিছু করতে। এজন্য তাদের আকৃষ্ট করারও একটি বিষয় ছিল। সে কারণে ২০১২ সালে  স্থপতি সাইফ উল হকের সঙ্গে আমি বসি, কীভাবে অন্যান্য স্কুলের চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু করা যায় সেটা নিয়ে ভাবি। এরপর মাথায় এলো দেশীয় বা গ্রাম বাংলার কাঁচামাল দিয়েই তো একটা চমত্কার স্কুল করা যায়।’

রাজিয়া আলম ও সাইফ উল হক, দু’জনে মিলে ঠিক করেন শুধুই বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করবেন এই স্কুল। বেশ কয়েকমাস ধরে প্রণয়ন করা হলো নকশা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু হলো কাজ। প্রায় ২০ জন কাঠমিস্ত্রি নিয়োগ করা হলো। তাদের জন্য ‘কর্মশালার’ আয়োজন করা হয়েছিল! এক মাস, দু-মাস নয়, পুরো দু-বছর লেগেছিল স্কুলটির পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ করতে।

স্কুলটির প্রধান কাঠমিস্ত্রি ছিলেন প্রাণ বল্লভ। তার তত্ত্বাবধানেই স্কুলটি নির্মাণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘স্কুলটির কাজ যখন শুরু করি আমরা তখন খুব যত্নসহকারে কাজ করতে হয়। কারণ ক্ষুদ্র কোনো ভুল হলেই বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে যেকোনো সময়।’ প্রাণ বল্লভ এখনো এই স্কুলটি রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তার কাছ থেকে জানা যায়, নির্মাণের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বাঁশ নষ্ট হয়নি। তবে মাঝেমধ্যে পাটাতন বা বাঁশের মেঝে পরিবর্তন করা হয় নিরাপত্তার স্বার্থে।

আর্কেডিয়া অ্যাডুকেশন প্রজেক্টের স্কুলটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। এই টাকার পুরোটাই দিয়েছেন রাজিয়া আলম। যুক্তরাজ্য থেকে তিনি বলেন, ‘সমাজের কল্যাণে ভিন্ন কিছু করার প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু এটি আন্তর্জাতিকভাবে এত বড় স্বীকৃতি পাবো তা ভাবিনি। এটা এখন শুধু আমাদের স্কুলটিকেই প্রতিনিধিত্ব করছে না, পুরো দেশের জন্যই সম্মান বয়ে এনেছে।’

স্থপতির কথা

আগা খান পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ার পর সম্ভবত সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন স্থপতি সাইফ উল হক। কারণ প্রত্যেক স্থপতিরই স্বপ্ন থাকে এই পুরস্কার জেতার। সাইফ বলেন, ‘এই কাজটি করতে গিয়ে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। আমার পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে এটিও একটি। এটির জন্য সম্মাননা পেয়েছি, আমি স্বাভাবিকভাবেই খুবই উচ্ছ্বসিত। যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সবার প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।’

স্থপতি সাইফের মতে, স্থাপত্য হলো সেই শিল্প, প্রতি মুহূর্তের অভিজ্ঞতায় যা আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। এই শিল্প কেবল চোখের দেখার নয়, আমাদের ৫টি ইন্দ্রিয়ের সকল গ্রাহ্যতাই তাকে অনুভব করে। যেকোনো নির্মাণই স্থাপত্য নয়, যদি না প্রকাশ হয় তার অভিবাস থেকে, তার সংস্কৃতি, জলবায়ু আর ভূমিরূপ থেকে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রকৃতিকে ঠিক রেখে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনের দিকে নজর দেন স্থপতি সাইফ উল হক। এই স্থপতি তার নিজের কাজ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে ভালোবাসেন। স্থাপত্য নিয়ে ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্থপতি সাইফ উল হক বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঔপনিবেশিক উত্তর পরিচয় বিতর্ক থেকে টেকসই বৈশ্বিক ভবিষ্যতের কথা নিয়ে এখন বেশি চিন্তিত। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কীভাবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রেখে ও সম্পদের সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ রচনা করবে সেটাই এখন প্রধান বিষয়। পরিবর্তন ও অবস্থিতির সঠিক অনুধাবন এই ভবিষ্যতের জন্য একটি লাগসই স্থাপত্য রচনার সহায়ক বলে আমি মনে করি।’

 

বিচারকরা যা বললেন

আর্কেডিয়া অ্যাডুকেশন প্রজেক্টটি সম্পর্কে প্রতিযোগিতার বিচারকরা বলেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সময় স্থানীয় সামগ্রী ব্যবহার করে কীভাবে সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান সম্ভব, তা বাঁশের তৈরি স্কুলটি দেখিয়েছে। প্রজেক্টটি স্থপতি, নির্মাতা ও গ্রাহকের দলীয় প্রচেষ্টার ফল। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তারা স্কুলটি নির্মাণে উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখিয়েছেন।

প্রজেক্টটি সাধারণ হলেও এটি নদীর স্রোতে বাঁধা দেওয়া এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান করেছে বলে পুরস্কারের বিচারকরা মনে করছেন। তারা বলেন, ‘জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার মতো বৈশ্বিক সমস্যা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে প্রজেক্টটি সমাধানের পথ দেখিয়েছে।’

 

স্কুলটির শুরুর গল্প

আর্কেডিয়া অ্যাডুকেশন প্রজেক্টের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালাম জানান, এই স্কুলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালের আগস্টে বলিয়াপুরের নগরকুন্ডায়। এটা ছিল প্রি-প্রাইমারি স্কুল। এই স্কুলে কনা, বিন্দু ও সিন্ধু নামের ৩টি ক্লাস চালু ছিল। এই ক্লাসগুলো পাশ করে যেতে পারলেই এরপর নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হতো শিক্ষার্থীদের। সেইসঙ্গে মায়েদের ৩ মাসব্যাপী একটি সেলাই প্রশিক্ষণও দেওয়া হতো, যাতে বাচ্চার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারেন। ৩ বছর পর স্কুলটি স্থানান্তর করা হয় কেরানীগঞ্জের আলীপুরে। সেখানকার ক্যাম্পাসটিও ছিল প্রকৃতির কোলে। এরপর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে স্থানান্তর করা হয় কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ কানারচরে।

বিশ্বজয়ী এই বাঁশের স্কুলটিতে বর্তমানে ২১ জন ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। এদের প্রত্যেকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের জন্য স্কুলে রয়েছেন দু’জন শিক্ষক। আর তাদের নিয়মিত দেখাশোনা করেন মো. আব্দুস সালাম। জানা যায়, বছরে ৯ মাস চালু থাকে এই স্কুল। বর্ষাকালে পানি ওঠার কারণে ৩ মাস স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। আগামীবছর থেকে আরো বড় পরিকল্পনা আছে তাদের। সকালে এটি হবে শিশুদের স্কুল, অপরাহ্নে মহিলাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সাপ্তাহিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হবে। তাদের বিশ্বাস, তাদের এমন প্রচেষ্টা ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রতিটি সমাজে, আলোকিত হবে পুরো বাংলাদেশ।