তাহমিদ আহমেদ শুভ্র
মোনাকোয় ভার্জিল ভ্যান ডাইকের পাশেই সংরক্ষিত ছিল লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আসন। তাদের পাশেই বসা এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত সাংবাদিক। চ্যাম্পিয়নস লিগ ড্র অনুষ্ঠানের একটি পর্বে দুই ফুটবল তারকাকে একের এক প্রশ্ন করছেন তিনি। তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন দু’জনই, কখনো বা পেছনের সারিতে বসে থাকা সবাই হেসে উঠছেন ‘হো হো’ করে। উপস্থাপিকার প্রাণবন্ত উপস্থাপনাও নজর কেড়েছে সবার, মুগ্ধ মেসি-রোনালদোরাও। বলা হচ্ছে, ক্রীড়া সাংবাদিক ও উপস্থাপিকা রেশমিন চৌধুরীর কথা।
মোনাকোয় গ্রিমালদি ফোরামে চ্যাম্পিয়নস লিগ ড্র অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ ক্রীড়া সাংবাদিক রেশমিন চৌধুরী। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়নস লিগ ড্রয়ের উপস্থাপনা করলেন তিনি। গতবারের মতো এবারো তার উপস্থাপনার মাঝে চমক ছিল মেসি-রোনালদোকে একই মাইক্রোফেন হাতে ধরিয়ে দেওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও দুই তারকার সেই সাক্ষাত্কার ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। মেসি-রোনালদোর পাশাপাশি উপস্থাপিকাও প্রশংসিত হন বিশ্বব্যাপী।
টানা তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন লীগের উপস্থাপনা করা মোটেও যে চাট্টিখানি কথা নয় সেটা সবারই জানা। রেশমিনের কাছেও এটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি। অবশ্য সেটা তিনি মঞ্চে ওঠার আগেই টুইটারের জানিয়েছিলেন। তিনি লেখেন, ‘আজ চ্যাম্পিয়নস লিগ ড্র। আমি হ্যাটট্রিকের দোরগোড়ায়।’ উপস্থাপনা শেষেও ধন্যবাদ জানিয়েছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফাকে। রেশমিন টুইট করেন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমাকে ফিরিয়ে আনা এবং উপস্থাপনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য উয়েফাকে ধন্যবাদ।’
রেশমিন চৌধুরীর কথা
১৯৭৭ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন রেশমিন। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ হলেও মা-বাবার সুবাদে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এই নারী সাংবাদিক। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে স্নাতক করেন তিনি। এরপর হার্লো কলেজে সাংবাদিকতার ওপর স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। শিক্ষার্থী থাকার সময়েই ২০০৩ সালে রয়টার্স টিভির নিউজ হেল্প ডেস্ক অপারেটর হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়।
ইংল্যান্ডের বিটি স্পোর্টসে কর্মরত আছেন ২০১৪ সাল থেকে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও উয়েফা ইউরোপা লিগের মতো ফুটবলের বড় টুর্নামেন্টগুলোতে তিনি নিয়মিত হাজির হন হাতে বিটি স্পোর্টসের বুম নিয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার রেশমিনকে দেখা গেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ড্রয়ের মূলমঞ্চে সঞ্চালকের ভূমিকায়। বিবিসি স্পোর্টসেও সংবাদ উপস্থাপনার কাজ করেছেন ৪১ বছর বয়সী রেশমিন। ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর রোনালদোর প্রথম সাক্ষাত্কারটি নেন তিনি। সেসময় অবশ্য তিনি রিপোর্টার ও প্রেজেন্টার হিসেবে কাজ করতেন রিয়াল মাদ্রিদ টিভিতে।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষাতেও তিনি সমান দক্ষ।
বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া রেশমিনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনেই। কাজ করেছেন খ্যাতনামা গণমাধ্যম বিবিসিতেও। ফুটবলের ভক্ত রেশমিনের পছন্দের দল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পার। সাংবাদিকতা ছাড়াও তিনি একজন গায়িকা। কাজ করেছেন বিখ্যাত মিউজিশিয়ান নিতিন শয়েনির সঙ্গে। ২০০৬ সালে ‘দ্য নেমসেক’ নামের এক ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে ঠাঁই পেয়েছে তার গাওয়া একটি গানও।
মেসি-রোনালদোর মুখোমুখি
অনুষ্ঠানে বর্ষসেরা ফুটবলারের ঘোষণার আগে রেশমিনের নেওয়া সাক্ষাত্কারে রোনালদোর কণ্ঠে ঝরলো মেসির প্রতি শ্রদ্ধা।—‘প্রায় ১৫ বছর ধরে আমি আর লিও ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের ধরে রেখেছি। আমি জানি না আগে কখনো এমনটা এত ধারাবাহিকভাবে হয়েছে কি-না, কারণ এভাবে ফর্ম ধরে রাখাটা মোটেও সহজ নয়।’
নিজেদের শ্রদ্ধাশীল পেশাদারি সম্পর্কের কথা শুনতে চাইলেন রেশমিন। সি আর সেভেন তার প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের দিক দিয়ে সম্পর্কটা ভালো। কখনো একসঙ্গে ডিনার করা হয়ে ওঠেনি, আশা করি ভবিষ্যতে সে সুযোগ হবে।’ পরের প্রশ্নে রোনালদোকে লা লিগায় খেলার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন রেশমিন। এবার কিছুটা স্মৃতিকাতরই মনে হলো রোনালদোকে।—‘অবশ্যই (লা লিগায় খেলা মিস করি)। আমি রিয়ালের হয়ে ৯ বছর খেলেছিলাম। অনেক শিরোপা জিতেছি, অনেক চমত্কার মুহূর্ত আছে স্মৃতিতে। লা লিগা ছাড়াও গত ১৫ বছর আমরা একে অন্যকে ভালো খেলতে বাধ্যই করেছি বলে মনে হয় আমার, যেটা আমাদের দু’জনের ক্যারিয়ারের জন্যই ভালো হয়েছে। ফুটবল ইতিহাসের অংশ আমরা দু’জনই। এটা চিন্তা করতেই ভালো লাগে।’
এতক্ষণ শ্রোতার ভূমিকায় থাকা মেসি জানালেন লা লিগায় ঠিকই রোনালদোকে মিস করেন তিনিও।—‘লা লিগায় আমার আর ক্রিসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুর্দান্ত ছিল। লক্ষ্য সবসময় ছিল গোল করে দলকে জেতানো। অবশ্যই লা লিগায় আমি তাকে মিস করি।’
