ইসমাইল মাহমুদ
সিলেটের শষ্যভান্ডার বলে খ্যাত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা এবং হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার কিয়দিংশের পাঁচটি ইউনিয়নের ২৯টি গ্রাম নিয়ে গঠিত হাইল হাওর। ঐতিহ্যবাহী হাইল হাওর প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র ও জীবন জীবিকার বিবেচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি।
প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার অতি দরিদ্র মত্স্যজীবী পরিবার হাওরে মাছ ধরে নির্বাহ করে থাকেন তাদের জীবিকা। তাছাড়াও হাইল হাওর দেশী বিদেশী নানা প্রজাতির পাখি, শামুক, ঝিনুক, ফোকল, ঘাস, শাপলা, শালুক, উকল, হিজল-করচ গাছ ইত্যাদি এবং অন্যান্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল।
হাইল হাওরের এ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ তথা এই জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে মাচ্ প্রকল্পের সহায়তায় গঠিত হয়েছে জলাভূমি সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (আরএমও)। এই সংগঠন হাইল হাওরের মত্স্য সম্পদের উত্পাদন ও বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র রক্ষা করাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে আসছে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে হাওরে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ গইন্না, কালিবাউস, চিতল, গুলশা, আইর, দেশীয় স্বরপুটি, পাবদা, রুই ইত্যাদি অবমুক্তকরণ। এছাড়া হাওরে বিপুল পরিমাণ জলজ গাছ রোপন করা হয়েছে। সেখানে তৈরী হয়েছে বন্যপ্রাণী ও পাখির আবাসস্থল।
বর্ষা মৌসুমে হাইল হাওরের সুনীল জলরাশি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। শুধু পানি আর পানি। হাইল হাওরের পানির প্রধান উত্স গোপলা নদী (উজানে বিলাসছড়া থেকে উত্পত্তি লাভ করে হাইল হাওরকে দ্বিখন্ডিত করে গোপলা নদী ভাটিতে বিজনা নদীর মাধ্যমে মেঘনার উর্ধাংশের সাথে মিলিত হয়েছে)। হাইল হাওরে গেলে আপনি এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। নৌকা ভ্রমণের উত্কৃষ্ট স্থান হাইল হাওর। ভোরে ঘুমন্ত হাইল হাওর যেন জেগে উঠে। হাওরের চারপাশে হাজার হাজার মত্স্যজীবির মাছ আহরণের দৃশ্য অত্যন্ত মোহনীয়। বিকেলের হাইল হাওর থাকে যেন পাখিদের দখলে। সন্ধ্যায় হাইল হাওরে ভ্রমণ করলে মনে হবে সারা রাত কাটিয়ে দেই প্রকৃতির এ রাজ্যে।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার তিন উপজেলা শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার সদর ও নবীগঞ্জ উপজেলার কিয়দংশ নিয়ে অবস্থিত সুবিশাল হাইল হাওর। সরকারি খাস ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি মিলিয়ে বর্ষা মৌসুমে মৌলভীবাজারের কালিয়ারগাঁও থেকে শ্রীমঙ্গলের মতিগঞ্জ পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১১ কিলোমিটার প্রস্থের হাইল হাওরের শুষ্ক মৌসুমে দৈর্ঘ্য থাকে ১০ কিলোমিটার ও পস্থ থাকে ৫ কিলোমিটার। বর্ষা মৌসুমে সুবিশাল জলরাশির হাইল হাওরে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে তিন শতাধিক বিল। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সামান্য অংশ হাইল হাওরে থাকলেও মূলত হাওরটি শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর নামেই পরিচিত। এ হাইল হাওরে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৮ শত টন মাছ উত্পন্ন হয়। এ হাওরের উত্পাদিত মাছ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে প্রেরণ করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এছাড়া এ হাওরের মাখনা, ভেট ইত্যাদি ফল বিক্রি হয় বাজারে। হাওরে রয়েছে ২ শতাধিক মত্স্য ফিসারী, প্রায় ৫০টি হাঁসের খামার ও প্রায় ২০টি গরু-মহিষের বাথান।
হাইল হাওরের চর্তুপাশে রয়েছে প্রায় ২০টি গরু-মহিষের বাথান। এছাড়া এলাকার সহস্রাধিক রাখাল হাওর পাড়ে গরু-মহিষ চড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। হাইল হাওরের ঘাস এ অঞ্চলের উত্কৃষ্ট গোখাদ্য। এলাকায় জনস্রোতি রয়েছে হাইল হাওরের ঘাস খাওয়ালে গরু-মহিষের স্বাভাবিকের তুলনায় দেড়গুন বেশি দুধ পাওয়া যায়। এলাকার শতাধিক মানুষ প্রতিদিন হাইল হাওরের ঘাস কেটে এনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতে দেখা যায়। বারো মাসই হাইল হাওরে ঘাস পাওয়া যায়। ফলে এলাকার গরু-মহিষ বাথানের মালিক, রাখাল ও ঘাস বিক্রেতারা মনে করেন ‘হাইল হাওরের ঘাস, সমৃদ্ধি বারো মাস’।
হাইল হাওর পাড়ের মানুষ ঋতু বদলের সাথে সাথে নানা পেশায় জড়িয়ে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে যারা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষ, হাঁস-মোরগের খামার করেন। বিকল্প পেশার ব্যবস্থা না থাকলে বছরের ৬ মাস না খেয়ে থাকতে হবে। হাইল হাওরে সারা বছরই মাছ পাওয়া যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে মাছের প্রজনন না হবার কারনে মাছের চেয়ে মত্স্যজীবির সংখ্যা বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ কারনে অনেকেই হাওর কেন্দ্রিক অন্য পেশায় ঝুকে পড়েন। কেউ ধান রোপন করেন, কেউ হাইল হাওরে আসা পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন, কেউ হাওরে নৌকা চালান, কেউবা পদ্মটোনা, ভেট, মাখনা তুলেন, কেউবা গরু পালন করেন।
