শিফারুল শেখ
গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ব্রিটেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ব্রিটেনের সমর্থন দেওয়ার কথা শোনা যায়। কিন্তু সেই দেশেই গণতন্ত্র নিয়ে হইচই! পার্লামেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইই) ছাড়তে চুক্তিহীন ব্রেক্সিট করতেই পার্লামেন্ট স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তার অনুরোধে সাড়া দিয়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। কিন্তু বিরোধীরা পার্লামেন্ট স্থগিত করাকে ‘গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অনেক পর্যবেক্ষক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইউরোপে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি’তে ব্যর্থ হয়েই এই কাজ করছেন।
‘গণতন্ত্রবিরোধী অভ্যুত্থান’: বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে ‘গণতন্ত্রবিরোধী’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ও উদারপন্থি দলের নেতা জো সুইনসন রানির কাছে চিঠি লিখে সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। লেবার পার্টির ছায়া চ্যান্সেলর জন ম্যাকডোনেল ‘ব্রিটিশ অভ্যুত্থান’ বলেছেন। হাউস অব কমন্সের স্পিকার জন বারকোর মতে, সংবিধানের অবমাননা। ৭০ জনেরও বেশি এমপি প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণার আবেদন নিয়ে স্কটল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ইংল্যান্ডের আদালতেও একাধিক আবেদন জমা পড়েছে। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জন জনসনের স্বৈরাচারী আচরণের কড়া নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত মৌলিক গণতান্ত্রিক নীতির অবমানন। কিন্তু এটা গণতন্ত্রের প্রতি অপমান কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জনসন জানিয়েছেন, না। একেবারেই সত্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য সরকারের নতুন এজেন্ডা তুলে ধরা ও নতুন আইন প্রণয়ন।
কঠিন পরীক্ষায় বরিস জনসন: হাউজ অব কমন্সের সর্বদলীয় ৫০ এমপি একজোট হয়েছেন। তারা বিকল্প হাউজ অব কমন্স গড়ে ব্রেক্সিট ইস্যুতে আগামী পাঁচ সপ্তাহ ধরে বিতর্ক করতে চান। এদের মধ্যে শাসকদল কনজারভেটিভ পার্টির দুই জন সদস্য আছেন। তাদের মতে এটা এক অসাংবিধানিক অভ্যুত্থান। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মার্কেল ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ সম্প্রতি বরিস জনসনকে এক মাসের মধ্যে ‘ব্যাকস্টপ’ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্য বিকল্প পেশ করতে বলেছিলেন। জনসন চুক্তি থেকে ব্যাকস্টপ দূর করার আহবান জানিয়ে আসছেন। এছাড়া শুল্ক, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, বাণিজ্যনীতি বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্ট মুলতুবির সিদ্ধান্তে ইইউতেও তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। জার্মান পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান নর্বার্ট বন্যোটগেন বলেছেন, চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের পথে পার্লামেন্টকে পথের কাঁটা হিসেবে দূর করে ইইউকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে থাকলে সেই চাপের মুখে নতি স্বীকার করা হবে না। তার মতে, কোনো সরকার প্রধান পার্লামেন্টের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করলে ইইউ সেই আচরণকে পুরস্কৃত করতে পারে না। দলের মধ্যে কট্টর ব্রেক্সিটপন্থিদের সহায়তায় নিজের লক্ষ্য পূরণে অবিচল থাকলেও পার্লামেন্টে বরিস জনসন কতটা সমর্থন পাবেন তা নিয়ে সংশয় আছে। চলতি সপ্তাহ থেকে বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটসহ অন্যান্য উদ্যোগ শুরু করলে টোরি দলে ঐক্যের পরীক্ষা হবে। রাস্তায়ও বরিস জনসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
সরকার পার্লামেন্ট স্থগিত করতে পারে?: ব্রিটেনের রাজনীতির নিয়ম অনুযায়ী, রানির ভাষণ অনুষ্ঠানের জন্য পার্লামেন্ট ভেঙে না দিয়ে অধিবেশন স্থগিত করা যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘প্রোরোগেশন’। এর অর্থ সরকার চাইলে পার্লামেন্টের কার্যক্রম স্থগিত করতে পারে। হাউস অব কমন্সের এমপি কিংবা হাউস অব লর্ডসের কেউ এতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না। ব্রিটিশ ঐতিহ্য অনুযায়ী, রানির ভাষণের আগে পার্লামেন্ট স্থগিত করা হয়। সাধারণত এর মধ্য দিয়ে পার্লামেন্টারি বর্ষ শুরু হয় এবং ঐদিন ব্রিটিশ রানি ঘোড়ার গাড়িতে করে বাকিংহাম প্যালেসে থেকে পার্লামেন্টে যান। রাজকীয় মুকুট পরে হাউস অব লর্ডসে প্রবেশ করে স্বর্ণ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তলব করেন হাউস অব কমন্সের এমপিদের। তবে এর আগে সরকার যেসব নতুন আইন পাস করতে চান সেগুলো নিয়ে একটি ভাষণ পড়ে শোনান রানি। এই ভাষণ সাধারণত সরকারই লিখে দেয়। ১৬ শতক থেকে এই ঐতিহ্য চলে আসছে। এখন বছরে একবার করে এটি পালিত হয়। শুরু থেকেই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হচ্ছে। এটি অনুষ্ঠানের লিখিত নিয়ম-কানুন বা দিনক্ষণ ঠিক করা নেই। তবে ২০১৭ সাল থেকে রানির ভাষণের এই অনুষ্ঠানটি বন্ধ আছে।
পার্লামেন্ট স্থগিত নিয়ে বিতর্ক কেন?: ধারণা, পার্লামেন্ট ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। তখন ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হওয়ার বাকি থাকবে মাত্র ১৭ দিন। ৩১ অক্টোবর ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা আছে ব্রিটেনের। তবে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য এবং সীমান্ত নিয়ে চুক্তি চূড়ান্তের পূর্ব পর্যন্ত এই তারিখ পেছাতে আগ্রহী অনেক এমপি। পার্লামেন্ট যদি আগামী ৫ সপ্তাহ বন্ধ থাকে তাহলে এটি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাবে। আর এই বিতর্কের মূলে ব্রিটিশ সংবিধান। অন্য দেশগুলোর মতো এর লিখিত রূপ নেই। এর পরিবর্তে এটি আবর্তিত হয়েছে বহু বছরের প্রথা, পার্লামেন্টের নিয়ম-নীতি, আদালতের রায় এবং ঐতিহাসিক রীতি-নীতিকে ঘিরে। রাজনীতিকরা সত্ উদ্দেশে দেশ পরিচালনা করলে তেমন অসুবিধা হয় না। কিন্তু ক্রমবিভক্ত ব্রিটেন যেখানে ইইউ ত্যাগ করা না করা নিয়ে বিতর্ক চরমে, যেখানে দুই পক্ষই জয়ের জন্য যে কোনো কিছু করতে রাজি, সেখানে এই পুরোনো নিয়ম-কানুন মুখথুবড়ে পড়তে পারে।
